‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বলো, /ঐ পাহাড়টা বোবা বলে কিছুই বোঝে না’। বরেণ্য সংগীতজ্ঞ ও কণ্ঠশিল্পী শ্রদ্ধেয় সুবীর নন্দীর কণ্ঠে গাওয়া এই কালজয়ী গানটি মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিকে নাড়া দেয়। পাহাড়ের বুকে জমাট বাঁধা অদৃশ্য কান্না বোঝার মতো সংবেদনশীলতা কিংবা প্রকৃতিপ্রেম আমাদের সমাজে আজ নেই বললেই চলে। যদি সেই অনুভূতিটুকু বিন্দুমাত্র থাকত, তবে আমরা কখনোই পরম মমতায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের বুকে কুঠারাঘাত করতে পারতাম না। নিজেদের ক্ষণিকের প্রয়োজন মেটাতে তার শরীরকে এমন ক্ষত–বিক্ষত করতে পারতাম না।
আমরা বৈজ্ঞানিকভাবে জানি–পাহাড় ও পর্বতমালা তাদের বিশালতা দিয়ে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ভারসাম্য ধরে রাখতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। অথচ সেই পাহাড়েরই বুক চিরে, তাকে ধ্বংস করে আজ আমরা গড়ে তুলছি আমাদের বসবাস। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই পাহাড় যেন নীরব–নিভৃত একাকীত্বে নিঃসঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এই বিশাল সৃষ্টির বুকে লুকিয়ে থাকা হাজারো রহস্যের সন্ধান আজও উন্মোচিত হয়নি।
পাহাড় তার দৃষ্টিনন্দন সবুজ রূপ দিয়ে একদিকে যেমন পরিবেশকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রাখে, অন্যদিকে পর্যটন ও সম্পদের মাধ্যমে আর্থিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখে। তার গহীন অরণ্য, নদী, জলপ্রপাত ও ঝরনা মিলে গড়ে তোলে এক অনন্য জীবন–বৈচিত্র্য। পৃথিবীর এমন বহু দুর্গম পর্বতমালা রয়েছে, যেখানে আজও কোনো জনমানবের পদধূলি পড়েনি। প্রকৃতি সেখানে নিজের হাতে সাজিয়েছে এক রূপসী বলয়, যা যুগ যুগ ধরে পৃথিবীকে আকর্ষিত করে রেখেছে।
তবে পাহাড়ের সেই একাকীত্বে মাঝেমধ্যে নীরব কান্না নেমে আসে–কখনো তা মুষলধারার বৃষ্টি হয়ে, কখনো ঝরনার রূপ নিয়ে, আবার কখনো অসহায়ত্বের অশ্রুভেজা জলে। আর অবহেলা ও নির্মমতায় মানুষ যখন তার ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে, তখন সে ধরে রাখতে না পেরে ভেঙে পড়ে; ঘটে পাহাড়ের করুণ জীবনাবসান।
আসুন, পাহাড়ের সেই ক্রন্দন ও আর্তনাদ থামাতে আমাদের হৃদয়জুড়ে প্রকৃতিপ্রেম জেগে উঠুক। প্রকৃতির এই নিঃসঙ্গ বন্ধুটির পাশে দাঁড়িয়ে তার সাথে গড়ে তুলি পরম সহমর্মিতার মিতালী।
লেখক : উন্নয়নকর্মী, সমাজব্রতী











