হল্যান্ড থেকে

এসো বই পড়ি, মন গড়ি : এক আশা-জাগানিয়া উদ্যোগ

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ২২ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ

A reader lives a thousand lives before he dies. The man who never reads lives only one’ অর্থাৎ একজন পাঠক তার মৃত্যুর আগে হাজারো জীবন যাপন করে, আর যে ব্যক্তি কখনো পড়েনা সে কেবল একটিই জীবন যাপন করে‘ – মার্কিন লেখক, জর্জ আর আর মার্টিন।

কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি ছোট্ট সংবাদ চোখে পড়লো। এই জাতীয় সংবাদ খুব একটা দেখিনা। প্রতিদিনের সংবাদে যা কিছু দেখি তার বেশির ভাগ নেতিবাচক। দেখে শুনে হতাশ হতে হয়। কিন্তু এই সংবাদটি ছোট হলেও কিছুটা আশাজাগানিয়ার মত। সংবাদটি হলো– ‘বই পড়ি, মন গড়িশ্লোগানে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠ্যাভ্যাসেরছাতার নিচে আনার লক্ষ্যে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। শ্রীমঙ্গল বইপড়া উৎসব ২০২৬উপলক্ষে এই উদ্যোগ। নির্দ্বিধায় এই আয়োজন প্রশংসার দাবি রাখে। কোন কোন পত্রিকা সংবাদটি প্রকাশ করে লিখেছে– ‘শ্রীমঙ্গলে বই পড়ার অভ্যাস ফিরে আসছে। একেবারে সঠিক শিরোনাম। পাঠ্য বইয়ের বাইরে বাইরের বইপড়ার অভ্যেস আমরা যেন দল বেঁধে আন্দামানে পাঠিয়েছি, নির্বাসনে। আর সে কারণে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের এই প্রচেষ্টা বই পড়ার অভ্যেস ফিরিয়ে আনা। জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান ভৈরবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজনগর গাউছিয়া সুন্নীয়া ফাজিল মাদরাসা, শ্রীমঙ্গল আনোয়ারুল উলুম ফাজিল মাদরাসা, সেন্ট মার্থাস হাই স্কুল এবং দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের সাথে এই নিয়ে সরাসরি মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি জানান, পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে পারবে এবং বই পড়াকেএকটি আনন্দময় অভ্যাসে পরিণত করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। সাধুবাদ জানাই এই উদ্যোগকে। এই উদ্যোগ এমন সময় নেয়া হয়েছে যখন ছোট থেকে বুড়ো আমরা সবাই মিলে মোবাইলকে বেছে নিয়েছি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। যেন গোটা জাতি মোবাইলের নেশায় বুঁদ হয়ে আছি, যেমনটি অনেকেই বিশেষ করে মহিলারা ভারতীয় তথাকথিত হিন্দি সিরিয়ালে বুঁদ হয়ে থাকেন।

পত্রিকার এই পাতায় এর আগেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে বাইরের বইপড়া নিয়ে বার কয়েক লিখেছিলাম। তাতে আমাদেরসময় বই পড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ ও উৎসাহের কথা উল্লেখ করেছিলাম। আমাদের স্কুলকলেজ পড়াকালীন সময়ে সত্তর দশকে শহরের অনেক এলাকায়, এমন কী অনেক গ্রামেও ছোটোখাটো লাইব্রেরি দেখা যেত। এরওর কাছ থেকে ধার করে গল্পকবিতার বই পড়া হতো। আমাদের গ্রামে (পটিয়া থানার অন্তর্গত করল) বৌদ্ধমন্দিরকে ঘিরে একটি ছোট লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। তাতে স্কুলগামী শিক্ষার্থী ছাড়াও গ্রামের বয়স্কদের মধ্যেও বেশ আগ্রহ দেখা যেত। গ্রামের তরুণদের মধ্যে একজনের দায়িত্ব ছিল একটি রেজিস্ট্রি খাতায় গ্রহীতার নাম টুকে রাখা এবং নির্দিষ্ট দিনে ফেরত নেয়া। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে বই ফেরত না দিলে সামান্য জরিমানার ব্যবস্থাও ছিল। হাতের লেখায় দেয়ালপত্রিকা বের করা হতো। হাতেলেখা দেয়াল পত্রিকা বের করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে। সেটি ছিল ইংরেজি বিভাগ থেকে প্রথম প্রকাশিত দেয়াল পত্রিকা, নাম দিয়েছিলাম, ‘স্পেকট্রামঅর্থাৎ বর্ণালী। বিভাগের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষকদের মাঝে বেশ উৎসাহ জুগিয়েছিল সেই পত্রিকা। এমনকি ঢাকার পত্রিকায়ও সেটি সংবাদহয়েছিল। সহপাঠী মোমিনের (মোমিনুল হক) হাতের লেখা ছিল মুক্তোরমতো। সেই ছিল লেখার দায়িত্বে। সম্পাদনায় ছিলাম আমরা তিন বন্ধু ও সহপাঠীশিশির, প্রলয় এবং আমি। তিনজনই বর্তমানে দেশের বাইরে। মোমিন সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। মোমিন সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছিল। দুর্ভাগ্য সেই সুসংবাদ মোমিনের জানা হলোনা। সে ততদিনে নাফেরার দেশে।

স্কুলকলেজবিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন বইপড়া ছিল আমার অনেকটা নেশার মতো। বাসা থেকে মাইল দুয়েক দূরত্বে লাইব্রেরি গিয়ে বই পড়তাম, প্রায় প্রতিদিন। স্কুল (কলেজিয়েট স্কুল) থেকে দুপুরে বাসায় ফিরে তড়িঘড়ি করে মুখে কিছু গুঁজে দিয়ে হেঁটে উপস্থিত হতাম মুসলিম হল লাগোয়া পাবলিক লাইব্রেরিতে। সত্তর দশকে মুসলিম ইনস্টিটিউট হলের সামনে ছিল বেশ বড়সর উন্মুক্ত মাঠ। হলের দুপাশে দুটি লাইব্রেরি। ডান দিকে পাবলিক লাইব্রেরি, বাঁদিকে পাকিস্তান কাউন্সিল। পাবলিক লাইব্রেরি তুলনামূলকভাবে বড়, এর বইয়ের সংগ্রহ ছিল ভাল। ভেতরের পরিবেশ ছিল খুব ভালো। মন যে ঢুকেই ইচ্ছে করে বই নিয়ে বসে পড়তে। সেখানে শিক্ষার্থী ছাড়াও ছোটবড় নানা বয়েসী বই প্রেমিকরা নীরবে মাথা নিচু করে পড়ায় মগ্ন থাকতো। কারো মুখে কোন রা নেই। আমাদের সময় বিয়ে ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে বই উপহার দেয়ার প্রচলন ছিল। মনে আছে দাদার বিয়ের পর অনেক উপহার সামগ্রী পাওয়া গেল। সবার দৃষ্টি যখন প্যাকেটে মোড়ানো দামি উপহারের দিকে, তখন আমার দৃষ্টি অপেক্ষাকৃত কম দামের উপহারে, বইয়ের স্তূপে। দাদার বিয়েতে উপহার পাওয়া বইগুলি এলো আমার দখলে। এরপর দিদির বিয়ে। অনেক বই পেলো উপহার হিসাবে। বেড়াতে বা কোন উপলক্ষে তার শ্বশুরবাড়িতে গেলে জানালার ধারে খাটের উপর বসে দিনের প্রায় সময় কেবল বই পড়া ছিল আমার কাজ। দিদি একটু পর পর গরম দুধ, সেদ্ধ ডিম, পিঠা এসে দিয়ে যেত। পড়া এমনই নেশা ছিল যে ওদের পেছনের বাড়ি থেকে একটি তরুণী জানালার কাছে এসে খেঁজুরে আলাপ জুড়াতে চাইতো। কিন্তু তাতে পাঠকের সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলনা। বইয়ের নেশাটা তেমনই ছিল পাঠকের।

বিয়ে কিংবা কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে এখন বই উপহার দেয়া যদ্দুর জানি একেবারে উঠে গেছে। প্রবাসেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। তবে ব্যতিক্রম বলে একটা কথা আছে। অনেকটা অবাক পাশাপাশি অত্যন্ত খুশি হয়েছি যখন উপহার হিসাবে একটি বই পেলাম এক তরুণ দম্পতির কাছ থেকে। অনেক গিফটের মাঝে হাসান (এরশাদ) ও তার স্ত্রী সাবার কাছে কাছ থেকে পাওয়া উপহার ছিল সেরা। সুধীর চক্রবর্তীর লেখা গভীর নির্জন পথেবইটি হাতে দিয়ে হাসান বলেন, ‘আপনি লেখালেখি করেন, ভাবলাম ভালো লাগবে।বইটি পেয়ে ভালো লাগার ওপর যদি আর কোনো শব্দ জানা থাকতো তাই বলতাম। মনে হলো, অনেক বছর পর কেউ আমাকে আমার পছন্দের একটি উপহার দিলেন। প্রথম যেবার হাসানের সাথে পরিচয় হয়, কোন এক পার্টিতে, জানিয়েছিলেন তার বাবা যিনি চট্টগ্রামে থাকেন, দৈনিক আজাদীর আমার সাপ্তাহিক কলামটিপড়েন। শুনে ভালো লেগেছিল। পৃথিবী আসলেই ছোট। বয়সে অনেক ছোট হাসানকে ভালো লাগে। স্মার্ট, মেধাবী, স্বল্পভাষী। তাকে ধন্যবাদ জানালে সে বলে, বইয়ের নেশা আছে সাবার। অবাক হলাম না। কেননা বই নির্বাচন দেখে। সাধারণ পাঠকদের সুধীর চক্রবর্তীকে চেনা বা জানার কথা নয়। সুধীর চক্রবর্তীর কয়েকটি সাক্ষাৎকার দেখেছি টিভি পর্দায়, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ থেকে লালন, বাউল সংস্কৃতি থেকে গ্রাম বাংলার মৃৎশিল্প, চিত্রকলা ইত্যাদি বারংবার হয়ে উঠেছে তার গবেষণার বিষয়। তাই হাসানসাবার কাছ থেকে এমন একটি বই পাবার পর স্বাভাবিকভাবে খুশি হয়েছিলাম। সেদিন রাতে যখন আমন্ত্রিত অতিথিরা বিদায় নিলেন, কিছুটা ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দেই। টেনে নেই সুধীর চক্রবর্তীর বইটি।

ফিরে আসি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে– ‘এসো বই পড়ি, মন গড়ি’। এই প্রসঙ্গে বন্ধুপ্রতিম বিশিষ্ট সাংবাদিক রাশেদ রউফের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত রাশেদ রউফ কেবল কবি এবং লেখক নন, তিনি একজন অত্যন্ত সফল সংগঠকও। চট্টগ্রামে তার সৃষ্টি, চট্টগ্রাম একাডেমির মাধ্যমে তিনি বন্দরনগরীতে পাঠক ও লেখক সৃষ্টিতে নিরলস কাজ করে চলেছেন বলে ধারণা। প্রস্তাব রাখবো তার কাছে তিনি যেন ‘এসো বই পড়ি, মন গড়ি’ জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। আমার চাইতে তাঁর আরো অনেক ভালো জানা যে বইয়ের মত এত আপন আর কিছু হতে পারে না। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া (১৯৫৪) বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছেন, ‘There is no friend as loyal as a book’ অর্থাৎ বইয়ের মতো বিশ্বস্ত বন্ধু আর হয়না।বাস্তবিক তাই। ২০২৬

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকর্মক্ষেত্রে প্রবেশ শুরু জেন-জিদের : প্রস্তুতি কতটুকু
পরবর্তী নিবন্ধঐতিহাসিক তাফসীরুল কোরআন মাহফিল ২১-২৫ ডিসেম্বর