আমার আব্বু নেই গত ৮ বছর কিন্তু আব্বুর রুমে এখনো আব্বুর পড়ার টেবিলটা সযতনে রাখা আছে। বাসায় গেলে রুমে প্রবেশ করতেই ওই টেবিলটায় চোখ আটকে যায় আমার। এই পড়ার টেবিলে জমা আছে আমাদের অজস্র স্মৃতি। এই টেবিলেই আব্বু কোরআন তেলাওয়াত করতেন, ফাইল রাখতেন, পেপার ওয়ার্ক করতেন, পেপার পড়তেন। আমাদের লাবীবার হাতেখড়ি হয় আমার আব্বুর পাশে বসে এই টেবিলেই। লাবীবা এবার এসএসসি পাস করেছে। ১০ আগস্ট যখন এসএসসির রেজাল্ট হলো সবার আগে আমার মনে পড়লো আব্বুর কথা। আব্বু আম্মুর প্রথম নাতনি লাবীবা। এতো আদর যত্নে সে বড় হয়েছে যা আসলেই কল্পনাতীত। লাবীবার স্কুলে ভর্তি, পড়াশুনা, বই খাতা কেনা সবকিছুর দায়িত্ব শতভাগ আনন্দের সাথে পালন করেছেন আমার আব্বু। প্লে গ্রুপ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটা ক্লাসে ওঠার সময় আমার আব্বু লাবীবার জন্যে অনেক ধরনের উপহার সামগ্রী নিয়ে আসতেন। ক্লাস ওয়ানে ওঠার সময় সে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলো। তখন চট্টগ্রামের মেয়রের হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছিলো লাবীবা। সে ছবি সযত্নে রাখা আছে আমাদের কাছে। আব্বু বলেছিলেন ওটা বড় করে বাইন্ডিং করে চেম্বারে নিয়ে টাঙিয়ে রাখবে। লাবীবাকে পড়ানোর পাশাপাশি আব্বু তাকে বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট করে নোটস করে দিতেন। স্কুল ছুটির সময় হলে প্রতিদিন আমার মোবাইলে আব্বু কল করে সময়মতো স্কুল থেকে লাবীবাকে আনার জন্যে তাগাদা দিতেন। আমাদের প্রত্যেকের সন্তানদের ভালো পড়াশোনার জন্য আব্বুর ভালোবাসাময় সহযোগিতা প্রতিদিন আমরা স্মরণ করি। আমার ছোট ভাই বাপ্পু যখন এসএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করলো সেদিন আব্বু মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন।
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে আমার ছোট ভাই উত্তর দিয়েছিলো আব্বু–ই আমার আদর্শ। সেদিন আব্বুর চোখে মুখে আনন্দের যে ছটা পড়েছিলো তা আমরা নিজের চোখে দেখেছি। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারালেও নিজের পড়াশোনা ছাড়েননি আমার আব্বু। আমাদের এলাকার স্কুল দৌলতপুর এবিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থী হিসেবে মেট্রিক পাশ করেছিলেন ১৯৬৫ সালে। আমাদের এলাকার বহু ছাত্র–ছাত্রীকে নিজে হাতে ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে তাদের বই পত্র কিনে দিতেন, একই রকমের কাপড় কিনে ড্রেস সেলাই করিয়ে দিতেন। বহু ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন। সমাজে শিক্ষার আলো বিলিয়েছেন নীরবে নিভৃতে। মোটকথা পড়াশোনার জন্য যাকে যেভাবে সহযোগিতা করা যায় আমার আব্বু সারা জীবন তা করে গেছেন। লাবীবার রেজাল্টের পর ওর জন্যে এইচএসসির বই কিনতে গেলাম। আব্বু সারাজীবন যে দোকানগুলো থেকে বই কিনতেন আমি এখনো ওখান থেকেই বই কিনি। আব্বু বই কিনতেন হিসেববিহীন। লাবীবার জন্যে বই কিনার পর আমি বই আন্দরকিল্লা এভিনিউ ভবনে আব্বুর চেম্বারে গেলাম। আব্বু নেই। চেম্বারের সামনে টাঙিয়ে রাখা আব্বুর নেইম প্লেটের দিকে চোখ পড়তেই আমার চোখ ফেটে বুক ফেটে কান্না আসলো। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আব্বু এই রুমটাতেই চেম্বার করেছেন। কতো শতো বার যে আমরা এখানে এসেছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমার বাচ্চাদেরকে টিকা দিতে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যেতাম। টিকা দেওয়ার পর ওখান থেকে আব্বুর চেম্বারে যেতাম। নাতি নাতনিদের প্রতি আব্বুর ভালোবাসা তুলনাহীন। বই কিনতে এসে আব্বুকে অনেক বেশি মনে পড়লো। আব্বু বেঁচে থাকলে এই বইগুলো আরো কয়েকদিন আগেই হয়তো কিনে নিয়ে আসতেন ওনার প্রিয় লাবীবার জন্যে। আমাদের লাবীবার ভালো রেজাল্টে আমরা যতোটা খুশি হয়েছি ততোটাই স্মৃতিকাতর হয়েছি আমাদের আব্বুর জন্য। একজন শিক্ষানুরাগী মহান মানুষ আমার আব্বু বিশিষ্ট আয়কর আইনজীবী আলহাজ্ব মরহুম মোঃ শফিকুল ইসলাম আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট। মহান আল্লাহ আমার আব্বুর জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়ে তাঁকে বেহেশতের উন্নত স্থানে অধিষ্ঠিত করুন।












