ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এদেশের জনসংখ্যা ২৮৮ মিলিয়ন, এদিক থেকে ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ অর্থাৎ চীন, ভারত এবং আমেরিকার পর। এই জনসংখ্যার ৮৮ শতাংশই মুসলিম। দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট ইন্দোনেশিয়রা তাদের স্বাধীনতার পুরোধা পুরুষ ড. আহম্মদ সুকর্ন’র নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, বাস্তবে ইন্দোনেশিয়া ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৯ ডাচদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।
ড. আহম্মদ সুকর্ন ইন্দোনেশিয় জাতির জনক। ইন্দোনেশিয়দের সুকর্ন’র প্রতি সম্মান জাকার্তা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ মুহূর্তে জেনে যাই, যখন সুললিত কণ্ঠে বিমান অভ্যন্তরে বিমান বালা ঘোষণা করেন “আপনাদের জাকার্তা ‘সুকর্ন হাতা’ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে স্বাগতম”, এ শ্রদ্ধার বিষয়টি আমার আরো বেশি করে অনুভূত হয় যখন সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রবেশমুখে বিশাল সাদা মর্মর পাথরে আঁকা সুকর্ন’র ছবি দৃষ্টি গোচর হয়।
‘সুর্কন হাতা’ সুকর্ন এবং হাতা দুজনই ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের বিখ্যাত চরিত্র। একজন ইন্দোনেশিয় জাতির জনক সুকনর্, অন্যজন ‘হাতা’ সুকর্ন’র সহযোদ্ধা। স্বাধীনতা উত্তর সুকর্ন প্রেসিডেন্ট আর হাতা ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৫৬ সালে দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ দেখা দিলে হাতা ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দেন।
ড. সুকর্ন স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকে অর্থাৎ ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ থেকে ১২ মার্চ ১৯৬৭ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২২ বৎসর ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনা প্রধান জেনারেল সুহার্তো ড. সুকর্ন’কে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন এবং সুকর্নকে গৃহবন্দী করেন। ১৯৭০ সালে গৃহান্তরীণ থাকা অবস্থায় সুকর্ন মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৯৮ জেনারেল সুহার্তো এই দীর্ঘ প্রায় ৩২ বৎসর ইন্দোনেশিয়া শাসন করেন। ১৯৯৭ সালে এশিয় অর্থনৈতিক সংকট ইন্দোনেশিয়াকেও নিদারুনভাবে গ্রাস করে। অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতা আর বেসামাল অবস্থা সাধারণ ইন্দোনেশিয় জনগণকে ক্ষিপ্ত করে তোলে, ব্যাপক ছাত্র জনতার বিক্ষোভের মুখে জেনারেল সুহার্তো ২৭ জানুয়ারী ১৯৯৮ পদত্যাগে বাধ্য হন।
সুহার্তোর ক্ষমতাচ্যুতির পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট বাচারুদ্দিন হাবিবি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সুহার্তোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হওয়াতে শুরুতে সাধারণ মানুষজনের মনে তাকে নিয়ে সন্দেহ থাকলেও দেখা যায় তিনিই ইন্দোনেশিয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কার্যকর এবং ব্যাপক পরিবর্তন নিশ্চিত করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য–
সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা, রাজবন্দীদের মুক্তি, প্রেসিডেন্টের পাঁচ বছর করে দুই মেয়াদের অধিক ক্ষমতায় না থাকার বিধান।
প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন বন্দোবস্ত অনুযায়ী পার্লামেন্ট এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হয়। প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে কেন্দ্রের হাতে থাকে প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র। এর বাইরে প্রেসিডেন্ট বাচারুদ্দিন হাবিবি অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূরীকরণে ইন্দোনেশিয় ব্যাংক রিস্ট্রাচারিং এজেন্সি গঠন করেন। এই সংস্থার মাধ্যমে ব্যাংক খাতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়, এর মাঝে উল্লেখযোগ্য, ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজানো, ব্যাংকে দায় দেনা, সরকারি অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহিতা, ব্যাংক ঋণ এবং শেয়ার হোল্ডারদের মাঝে সম্পর্কের জবাবদিহিতা এবং সমন্বয়করণ ছিল ইন্দোনেশিয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাবিবির শাসনামলে আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। উল্লেখ্য ১৯৭৫ সালে পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৬ সালে ইন্দোনেশিয় সেনাবাহিনী পূর্ব তিমুরে ব্যাপক অভিযান চালায়।
হাবিবি ঘোষণা দেন পূর্ব তিমুর তাদেরকে দেওয়া স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা না মেনে যদি স্বাধীন হয়ে যেতে চায় তবে তারা তা করতে পারে। সামরিক বাহিনী হাবিবি’র অবস্থানের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়। সামরিক বাহিনীর বক্তব্য পূর্ব তিমুরকে স্বাধীনতা প্রদান করা হলে তা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করবে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, ভোটাভুটির মাধ্যমে পূর্ব তিমুরিজরা তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ভোটাভুটি হলে ৭৮ শতাংশ পূর্ব তিমোরিজ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীন হয়ে যায়।
এমন এক প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট বাচারুদ্দিন হাবিবি সামরিক বাহিনীর যেমন অপ্রিয়ভাজন হন তেমনি তার বিরুদ্ধে ‘ব্যাংক বালি’ দুর্নীতির অভিযোগ জোরালোভাবে সামনে আসে। অবস্থা সামাল দিতে বাচারুদ্দিন হাবিবি ১৯৯৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
এ নির্বাচনে মেঘবতী সুকর্ন কন্যা গরিষ্ঠসংখ্যক ভোট পেয়ে জয়ী হলেও নানা চক্রে পড়ে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেন এবং প্রেসিডেন্ট হন আবদুর রহমান ওয়াহিদ। বছর যেতেই দুর্নীতির অপবাদ কাঁধে নিয়ে ওয়াহিদ সংসদে অভিশংসিত হন। এর পর মেঘবতী ইন্দোনেশিয়ার প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হন।
২০০৪ সালের ভোটে মেঘবতীকে পরাজিত করে তারই এককালীন মন্ত্রী ‘ইয়াধোন্যে’ ইন্দোনেশিয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে নির্বাচিত হয়ে সুশিলো বামবাং ইয়াধোন্যে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। জেনারেল সুহার্তোর পর তিনি দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট যিনি সেনাবাহিনীর থেকে নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালের নির্বাচনে জকো ওয়াইদুদু ইন্দোনেশিয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রভু সুবিয়ান্তো ইন্দোনেশিয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সুবিয়ান্তোও সেনাবাহিনীর জেনারেল ছিলেন। তিনি জেনারেল সুহার্তোর জামাতা। ১৯৫৫ সালের ১৮ থেকে ২৪ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং এ ড. সুকর্নো, পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু এবং জামাল আবদুল নাসেরের উদ্যোগ এবং নেতৃত্বে পৃথিবীর জোট নিরপেক্ষ দেশগুলির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন আমেরিকা – সোভিয়েৎ ইউনিয়নকে ঘিরে স্নায়ু যুদ্ধের যাতাকলে পড়া দেশগুলিকে একটি স্বতন্ত্র অভিযাত্রার পথ দেখায়।
ইন্দোনেশিয়া সম্বন্ধে আমার সাধারণ জ্ঞান এ পর্যন্ত এতটুকুই এবং এই জ্ঞান যে অসম্পূর্ণ তা সাম্প্রতিক ঢাকাস্থ ইন্দোনেশিয় রাষ্ট্রদূত এবং সেদেশের অর্থ ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তার সাথে হোটেল সোনার গাঁ এ এক একান্ত আলোচনায় একেবারে নিদারুণভাবে প্রমাণিত হয়। আমি মান্যবর রাষ্ট্রদূতকে জিজ্ঞেস করি তিনি ইন্দোনেশিয়ার কোন অঞ্চলের অধিবাসী, তিনি জানান তিনি জাভা’র অধিবাসী, আমি তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করি জাভা জাকার্তা থেকে কত দূরে? তিনি স্মিত হেসে বলেন জাকার্তা জাভাতে অবস্থিত। আমার ইন্দোনেেিশয়া সম্বন্ধে জ্ঞান এখানে হোঁচট খায়। তবে এই আলোচনা সূত্রে আমি ইন্দোনেশিয়া সফরের একটি আমন্ত্রণ পাই, এবং ৬ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই ইন্দোনেশিয়া সফর করি।
ইন্দোনেশিয়া ১৭০০০ (সতের হাজার) দীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত। এদেশে রয়েছে ১৩০ (একশত ত্রিশ) টি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। প্রশান্ত মহা সাগরীয় রিং অব ফায়ার তথা জলন্ত আগ্নেয় গিরি সমূহের অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়া দারুন উর্বর এক ভূমিতে পরিণত।
শতের হাজার দ্বীপের মধ্যে মূলত জাভা, সুমাত্রা, বর্ণিও, সুলেওশি এবং পাপুয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তিনটি টেকটোনিক প্লেইটের উপর ইন্দোনেশিয়া নিয়তই ভূকম্পনের মুখোমুখি। উল্লেখ্য গত ১৩ আগস্ট ২৬ ইন্দোনেশিয় তিমুর অঞ্চল রিক্টার স্কেলে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়।
টেকটোনিক প্লেইটের উপর অবস্থিতির কারণে আগ্নেয়গিরি সমূহ প্রায়ই জ্বলন্ত লাভা উদগীরণে ব্যপ্ত হয়। এসব আগ্নেয়গিরির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কারাকাতোয়া’ ‘মাউন্ট থামবুরা’ ‘মাউন্ট সিনাবা’ ‘হালমাহেরা’ এবং ‘মাউন্ট মারাফি’।
ইকোটেরিয়াল জলবায়ুর কারণে ইন্দোনেশিয়া বিচিত্র বর্ণিল এক অরণ্যানীর দেশে পরিনত। প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল এক আধার ইন্দোনেশিয়া। (চলবে)
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।











