১৭ আগস্ট সোমবার পূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ৬ মাস বা ১৮০ দিন। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষিত অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ের পর্যবেক্ষণও শেষ হচ্ছে এ সময়ে।
সরকার গঠনের পর শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিএনপি। তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই শুরু হওয়া এলপিজি গ্যাস সংকট এক পর্যায়ে তীব্র রূপ নেয়, যার ফলে দ্বিগুণ মূল্যে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হন ভোক্তারা। সরকারি কিছু পদক্ষেপে এলপিজি পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও মার্চ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানিসংকট নতুন করে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের অধিকাংশ পেট্রোলপাম্প বন্ধ হয়ে যায় এবং রাত জেগেও তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন চালকরা। পরবর্তী সময়ে তেল পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও জুলাই মাস থেকে নতুন করে দেখা দেয় গ্যাস সংকট। গ্যাসের তীব্র অভাবে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। ফলে দেশজুড়ে শুরু হওয়া নজিরবিহীন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একের পর এক চরম জ্বালানি সংকটে পুরোদেশে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা।
জুলাইয়ে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্লিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটিতে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বন্ধ হয়ে যায় দেশের প্রায় ৯০০টির মতো শিল্প প্রতিষ্ঠান। অচল হয়ে যায় সার কারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। মাসব্যাপী সারা দেশে যে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, তা জনজীবন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন–সবকিছুকেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এ সংকটের মূল কারণ বিশ্ববাজারে গ্যাসের দুষ্প্রাপ্যতা নয়, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অপরিণামদর্শিতা, অস্বচ্ছতা ও অযোগ্যতা ও তদবির। এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল গ্যাস সরবরাহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও সেখানে খালাস করার মতো কোনো কার্গো নেই। এ পরিস্থিতি কেবল হতাশাজনক নয়, বরং উদ্বেগজনক। দেশের জ্বালানি খাত সবচাইতে নাজুক এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, কিন্তু এ সেক্টরটাই সবচাইতে দুর্বল। অদূরদর্শী পরিকল্পনা, অযোগ্য অদক্ষ এবং মেধাহীন লোকদের নিয়ে এ সেক্টরটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এ সেক্টরে আমার দীর্ঘ চল্লিশ বছরের অধিক সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, সরকারের প্রথমত যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদেরকে সঠিক পদে পদায়নে ব্যর্থতা। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষার অভাবে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার নামে হয়রানি। ফলে অনেক মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন, আবার অনেকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং মেধাবিকাশে প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি কমিশন বা বিভিন্ন আইন বিভাগ কর্তৃক টানাহেঁচড়া আইনি সুরক্ষা না পাওয়া প্রভৃতি কারণে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তা হতে শুরু করে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবং প্রতিটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিচালনা পরিষদ সমূহ সবকয়টি পদে মেধাবী প্রকৌশলীদের পরিবর্তে অদক্ষ আমলাদের আমাদের পদায়ন করে তাদের হাতে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্বল, অথর্ব, অযোগ্য মেধাহীন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে জ্বালানি সেক্টরটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। ছয় মাস বা এক বছরে এর সমাধান হবে না। জ্বালানির এ সংকট সমাধানে ন্যূনতম দুই বছর লাগবে। গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চলমান গ্যাস সংকট তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বাড়বে এটা স্বাভাবিক বিষয়। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হাহাকার এবং চালু শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে।
জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সংকটের সমাধানে সরকারকে তিন বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আদর্শ ও নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পদধারীদের অযোগ্যতা ও ভুল সিদ্ধান্ত্তের ফলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এবারের গ্যাস সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে দর্শনগত ও নীতিগত জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। জ্বালানি খাতকে বেপরোয়াভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। এটা সেবা খাতে রূপান্তর করতে হবে। অতি মুনাফা করার চেষ্টা থেকে সরে আসতে হবে। গ্যাস সরবরাহের নামে অর্থনীতিকে জিম্মি করা হয়েছে। গ্যাস সংকটে অর্থনীতির যেখানে করুণ অবস্থা সেখানে শিল্পের চাকা ঘুরে না অথচ গ্যাস সেক্টরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা লক্ষ লক্ষ টাকা মুনাফা পায় কী করে?
গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে নজর দিতে হবে।
সরকারকেই প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। তা হলো ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রে সরকার ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ হয়ে যেন না দাঁড়ায়। দুই নম্বর হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তার কথা যেটা এসেছে, সেখানে যেন সরকার ব্যবসা না করে। যে জিনিস আমি দেশে উৎপাদন করি না, সেই জিনিসের ওপর যদি কর আরোপ করি, পক্ষান্তরে যদি বলি আমি ভর্তুকি দিচ্ছি, এটা কিন্তু সত্যিকারের ভর্তুকি নয়।
সরকার যেন ব্যবসায়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়। কারণ, আমাদের এখন দরকার বিনিয়োগ। বিনিয়োগের জন্য যা যা করা দরকার সরকারকে তা করতে হবে। গ্যাস সংকটের সমাধানের ভার সরকার বিদেশিদের হতে তুলে দিয়েছে যা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিদেশিদের দিয়ে কূপ খনন সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। বিদেশিরাই গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করে দেশীয় প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সংকটের সমাধান করতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক– শিল্পশৈলী।












