সত্য বলছি, বাংলার প্রেমিক পুরুষেরা আল মাহমুদের সোনালী কাবিনেই স্বাক্ষর চায় প্রেমিকার। প্রেমিকার সম্মতি আদায় ও প্রেম নিবেদনে সোনালী কাবিনের তুলনা নেই। প্রেম একদিকে বলছে, তোমায় সর্বস্বটুকু দিলাম, আমার হাত থাকুক খালি, কিচ্ছু চাই না ভালোবাসা ছাড়া। তবে কি প্রেমের কাগজ হয়? বিবেকের হাত ছেড়ে দিলে যেমন মানুষ আর মানুষ থাকে না তেমনই মন ছাড়াও কি প্রেমের উদয় হয়? কিন্তু বাস্তবের নিকাহ্নামায় কত শত শর্তে একে অপরকে ঘায়েল করতে হয়। দু’পক্ষের সমস্ত সংঘর্ষকে এড়িয়ে সই হয়, বিয়ে হয়। অন্য ধর্মেরও রীতি আছে, আছে যুক্তি, নীতি, কাগজ। ইসলাম ধর্মেও কাজী বিয়ে পড়ায়, সই করতে হয় নিকাহ্নামায়।
সংবিধান মোতাবেক বিধি ২৭(১) (ক) অনুসারে, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর বিধি ২৮(১) (ক) অনুযায়ী বিবাহ ফরমে বেশ কিছু তথ্য দিয়ে দু’পক্ষের সম্মতিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এতে দেনমোহরের পরিমাণ ধার্য্য করা হয়, স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রমাণ রাখা হয় ফলে চুক্তি বলা যায় কিন্তু উক্ত নিকাহ্নামার ফরম পড়লে চুক্তি বলা যাবে কিনা এতে সন্দেহ আছে। যেকোনো চুক্তির প্রথম শর্তই হলো দুটি পক্ষের পরিপূর্ণ তথ্য, চাহিদা এবং শর্তকে প্রতিফলিত করা এবং চুক্তি নিরপেক্ষ একটি প্রমাণনামা। তবে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ মোতাবেক যে তথ্যগুলো চাওয়া হয় তার প্রত্যেকটি পড়লে মনে হবে এটি একটি ওয়ারেন্টি/ক্রয়/ সার্টিফিকেট নামা যেটি কেবল পুরুষের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। কোনো নারীর সাথে চুক্তি না হয়ে যেন ওয়ারেন্টি নেওয়া হচ্ছে। এখন বলা যায়, তবে বিবাহ’র যে ধারণা কিংবা মুসলিম পারিবারিক যে ধারণা সবই তো ঐ একটাই পক্ষ থেকে বিবেচিত, এতই বুঝলে বিয়ে করলেন কেন? এক কথায় বলছি, মানুষ বিয়ে করে সমাজের চাপে, সমাজকে খুশী করতে, সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে। সমাজের অন্যান্য অনেক পাহাড়ের ভিত্তি এই বিবাহ, যেগুলো আজ যুগ যুগ থেকে টিকে আছে এই একটিমাত্র কার্যক্রমে। সে যাই হোক, যেহেতু চুক্তি তাই এর শর্তগুলো অন্তত আমাদের পড়ে দেখা উচিত।
যেদিন বিয়ের অনুষ্ঠান হয়, সেদিন কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এক অন্য ধরণের আবেগে তাড়িত হয় মেয়েরা বিশেষত। জীবনের নতুন অধ্যায়, নতুন পথচলা, সঙ্গীর সামাজিক স্বীকৃতি কত কি… আর সাজগোজ তো আছেই। আমি গত বছর যখন নিকাহ্নামায় সই করি, প্রত্যেক তথ্যগুলো ভালো করে যাচাই করছিলাম। কাজী, রেজিস্ট্রার বেশ বিরক্ত! এত পড়ার কি আছে? স্পষ্ট বলেছিলাম, এটাই কিন্তু প্রমাণ। এখন ভুল লিখলে ভুলেই শুরু হবে শুরুটা। এরপর গোটা বছর দু’জনের কারোরই নিকাহ্নামার প্রয়োজন পড়েনি। ঐ যে, স্বামীর নাম বসালেই প্রমাণ দিতে হয়! তাই নিকাহ্নামা তুলেছিলাম। এবার কিন্তু ভালোমতো পড়েছি। সঙ্গীর সাথে খুনসুটি করছিলাম, কিরে আমাকে তালাক দেওয়ার অনুমতি কেন দিলা? তার রসিক উত্তর, যেন তুমি উড়ে যেতে পারো। তবে নিকাহ্নামার এমন অনেকগুলো পয়েন্টেই বেশ আপত্তি হলো। হাসি রেখে বোঝার চেষ্টা করলাম। প্রথম প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি–
কন্যা কুমারী, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্ত নারী কি না?
বৈজ্ঞানিকভাবে কুমারীত্বের যে ধারণা তাতে আসলে স্বয়ং নারী এবং ডিএনএ টেস্ট ছাড়া কুমারী কি না জানার উপায় নেই। স্বামীর অধিকার আছে জানার, কিন্তু এটি একান্ত ব্যক্তিগত, আবেগস্পর্শী ব্যপার। এতে চুক্তিতে আলাদা কি পার্থক্য হয়? জানা নেই। তবে যদি জানতেই হবে তাহলে তো বর কুমার কিনাও জানা জরুরি ছিল। এমন কোনো প্রশ্ন নেই নিকাহ্নামায়। তবে বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্ত এই তথ্যগুলোও জানা জরুরি উভয় পাক্ষিক দিক থেকে। ফলে একে একপাক্ষিক ওয়্যারেন্টিনামা নামকরণ করলে মন্দ হয় না।
দেনমোহরের পরিমাণ
এ বিষয়ে বহু বিতর্ক আছে। বলা যায়, ক্রয়ের মূল্য যেন। স্পর্শের আগে পরিশোধযোগ্যও নাকি। অদ্ভুত। কিন্তু আমাদের দেশের যে অবস্থা, নারীদের উপর নির্যাতন, যৌতুকপ্রথা কিংবা অন্যায়ভাবে ভরণপোষণ না দেওয়ার মত ঘটনায় দেনমোহর নারীর অধিকারেরই বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বর্তমান যুগে অনেক নারীই বলছেন, আরেহ ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার পক্ষেও না। বিতর্ক চলছে, চলুক…
স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করিয়াছে কি না? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে?
যার সাথে আমার এখনো চুক্তি হয়নি, বিবাহ হয়নি, যার প্রতি আমার কোনো দায়বদ্ধতা নেই বিবাহের আগে তার কি ক্ষমতা হয় আমাকে একটি ক্ষমতা শর্ত দিয়ে প্রদান করার? এ ক্ষমতার হস্তান্তর করতেও তো ক্ষমতা লাগে। তাই না? ক্ষমতাই বা দেওয়ার জন্য দ্বারস্থ হবো কেন? যদি তালাক দেওয়ার জরুরি হয়ে ওঠে, তাহলে তো যেকোনো পক্ষই তা দিতে পারে। এ প্রশ্নের মাধ্যমে তিনটি প্রশ্ন আসে, ১। স্বামী যদি ক্ষমতা অর্পণ না করে তবে? ২। শর্ত কে নির্ধারণ করছে? ৩। শর্তগুলোর ন্যায্যতা কিসের ভিত্তিতে নির্ণয় হবে?
মজার বিষয়, স্বামীর তালাকের বিষয়ে প্রশ্নটা খুবই ঘুরিয়ে করা, স্বামীর তালাক প্রদানের অধিকার কোন প্রকারে খর্ব হইয়াছে কি না?
অর্থাৎ স্বামী বিনা কোনো ধার না ধেরেই তালাক দিতে পারেন এবং এটি তার অধিকার। এতে খর্ব হওয়ার অবকাশ থাকলেও তা রাখা সম্ভব না। কেননা শরিয়াহ্মোতাবেক এ উত্তরগুলো রেজিস্ট্রার নিজেই লিখে দেয়। আহা, সুযোগ দিলে লিখে দিতাম খর্ব করা হলো। হা হা হা…
এমন আরো অসংখ্য বিষয়ে কথা বলার ইচ্ছা মিটে গেলো, এই নিকাহ্নামা কোনো অংশেই উভয় পাক্ষিক না। সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি থেকেই, পুরুষের জন্যই একটি দলিল তৈরি হয়। আবার এ–দলিল খারিজ করার জন্য নারীর চরিত্রের উপর দাগ টানলেই হয়। কোথায় তাহার আদালত। এর বিপরীতে একটা গল্প বলি, শাহী (ছদ্মনাম) ভাই খুব লাজুক, ভদ্র মানুষ। চেষ্টা করেও প্রেম হয় নাই। মা–বাবার সম্মতিতে পারিবারিক বিয়ে করে কিন্তু অনুষ্ঠান হবার আগেই জানতে পারে স্ত্রীর আগে বিবাহ হয়েছে। প্রমাণ পেলেও বেচারা মানতে চায় না। এরপর কোর্ট–সালিশ কত কিছু। পরে যখন আদালতে গেলো তালাক নিয়ে, আদালত বললো আপনাকে সমস্ত ভরণপোষণ এবং দেনমোহর দিতে হবে। স্বল্প বেতনে, এত প্রতারণার পরে নিজেকেই এত শাস্তি কেন? মজার ব্যাপার, ঐ নারীর পক্ষে একটাই প্রমাণ সাক্ষ্য দিয়েছে তা হলো নিকাহ্নামা। তাতে লিখা ছিল নারী কুমারী… এসব ভাবলে খারাপ লাগে। যে কেউই তো ঠকতে পারে কিন্তু সমাজে নারীর বিরুদ্ধে এত শর্ত, ষড়যন্ত্র না হলে কি কেউ কেউ পার পেতে পারতো? আমরা ভুলে যাই, অন্যের জন্য গর্ত করলে, সবার আগে নিজেকেই সে গর্তে পড়তে হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই নিকাহ্নামার মোড়কে একেকটা প্রশ্ন বিদ্ধ করে সমাজকে, সমাজের নারীকে কিন্তু এর থেকে কি মুক্তি নেই? মুক্তি হোক আমার, আপনার, সকল নারী–পুরুষের। পুরুষ তাদের কূপ থেকে বেরিয়ে দেখুক, আকাশটা কত বিশাল।











