একজন নারী বুকে অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব বা পিঠে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলেন। তাঁর উপসর্গগুলো হয়তো ‘ক্লাসিক’ হৃদ্রোগের লক্ষণের মতো নয়। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হতে পারে। আবার একজন নারী দীর্ঘদিন মাসিকের অনিয়ম, তীব্র ব্যথা বা অবসাদকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে সহ্য করে যাচ্ছেন, কারণ পরিবার বা চিকিৎসাব্যবস্থা তাঁর কষ্টকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এই দুই দৃশ্য আলাদা মনে হলেও তাদের পেছনে একই প্রশ্ন আছে–চিকিৎসাবিজ্ঞান কি সব সময় নারীর শরীরকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে?
বিশ্বজুড়ে এখন ‘উইমেনস হেলথ গ্যাপ’ বা নারীর স্বাস্থ্য–বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও ম্যাককিনসি হেলথ ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণ বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ২৫ শতাংশ বেশি সময় অসুস্থতা বা স্বাস্থ্যের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেঁচে থাকেন। শুধু আয়ু নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার বছর–এই সূচকেই পার্থক্যটি স্পষ্ট। এই ব্যবধান কমানো গেলে কোটি কোটি নারীর জীবনমান উন্নত হবে এবং অর্থনীতিতেও বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কথা উঠলেই আমাদের আলোচনার বড় অংশ চলে যায় মাতৃত্ব, গর্ভধারণ, প্রসব বা প্রজনন স্বাস্থ্যের দিকে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নারীস্বাস্থ্য শুধু প্রজননস্বাস্থ্য নয়। হৃদ্রোগ, ক্যানসার, অটোইমিউন রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য, অস্থিসংক্রান্ত সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা–এসব ক্ষেত্রেও নারী–পুরুষের অভিজ্ঞতা, ঝুঁকি ও উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জৈবিক পার্থক্যের পাশাপাশি সামাজিক লিঙ্গভূমিকা, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং কাঠামোগত বৈষম্যও নারীর রোগঝুঁকি, চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার এবং সেবার মানকে প্রভাবিত করে।
হৃদ্রোগের উদাহরণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বুকের তীব্র ব্যথা অনেকের কাছেই হার্ট অ্যাটাকের ‘চেনা’ উপসর্গ। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, নারীদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, বমিভাব, বমি, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। উপসর্গের এই পার্থক্য সম্পর্কে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী–দু’পক্ষেরই সচেতনতা না থাকলে রোগ শনাক্তে দেরি হতে পারে।
নারীস্বাস্থ্যের ঘাটতি বোঝাতে এন্ডোমেট্রিওসিস একটি শক্ত উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রজনন ক্ষম বয়সী প্রায় ১০ শতাংশ নারী–প্রায় ১৯ কোটি মানুষ–এই দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত। তীব্র মাসিকব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত, বন্ধ্যাত্ব, পেট ফাঁপা বা বমিভাব এর লক্ষণ হতে পারে। তবু রোগটি শনাক্ত হতে গড়ে চার থেকে বারো বছর পর্যন্ত দেরি হতে পারে। এর একটি কারণ হলো, মাসিকের তীব্র ব্যথাকেও অনেক সমাজে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া। ফলে একজন কিশোরী বা তরুণী বছরের পর বছর ব্যথা সহ্য করেও চিকিৎসা চান না, কিংবা চিকিৎসা নিলেও দ্রুত সঠিক রোগনির্ণয় পান না। WHO–ও বলছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে সময়মতো রোগনির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার এখনও সীমিত।
সমস্যার আরেকটি শিকড় চিকিৎসা গবেষণার ইতিহাসে। বহু দশক ধরে ক্লিনিক্যাল গবেষণায় পুরুষের শরীরকে ‘ডিফল্ট’ ধরে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। সামপ্রতিক বছরগুলোতে অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং অনেক গবেষণায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু অসমতা পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের ও কিছু বিশেষায়িত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনও কম হতে পারে। গবেষণা–পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নারীরা বিশেষত বর্ণগত ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক নারীরা–ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অপর্যাপ্তভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন; এতে রোগ, ওষুধের প্রতিক্রিয়া এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
এখানেই একটি জরুরি প্রশ্ন আসে: একটি ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি যদি প্রধানত পুরুষ অংশগ্রহণকারীর ওপর পরীক্ষা করা হয়, তবে নারী শরীরে তার কার্যকারিতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি একই থাকবে? সব ক্ষেত্রে উত্তর এক নয়। শরীরের গঠন, হরমোন, বিপাকক্রিয়া, বয়স এবং অন্যান্য জৈবিক পার্থক্য ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। সে কারণেই আধুনিক চিকিৎসা গবেষণায় নারী ও পুরুষের ফল আলাদা করে বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। তবে বৈষম্য শুধু গবেষণাগারে নয়, চিকিৎসকের চেম্বারেও তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, উদ্বেগ বা অনিদ্রার মতো উপসর্গে নারীদের অভিজ্ঞতাকে কখনো কখনো ‘স্ট্রেস’, ‘হরমোন’ বা ‘মানসিক’ সমস্যা বলে দ্রুত ব্যাখ্যা করার অভিযোগ বহু দেশে রয়েছে। সব ক্ষেত্রে এমন হয় না, কিন্তু রোগীর কথা মন দিয়ে শোনা, উপসর্গের পূর্ণ ইতিহাস নেওয়া এবং প্রয়োজনে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা–এসবের গুরুত্ব নারীস্বাস্থ্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। চিকিৎসায় লিঙ্গ–সংবেদনশীলতা মানে নারীদের আলাদা সুবিধা দেওয়া নয়; বরং ভিন্ন জৈবিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে চিকিৎসা সিদ্ধান্তে বিবেচনায় নেওয়া।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনার আরও একটি মাত্রা আছে–চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার। গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের বহু নারী নিজের অসুস্থতাকে পরিবারের অন্য সদস্যের প্রয়োজনের পরে রাখেন। যাতায়াত, খরচ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সামাজিক সংকোচ বা নারী চিকিৎসকের অভাব–এসবও চিকিৎসা নেওয়ার সময়কে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশভিত্তিক সামপ্রতিক কর্মসূচিতে মাসিকস্বাস্থ্য পণ্যের ঘরে পৌঁছে দেওয়া, নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যতথ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; এতে বোঝা যায়, সেবা আছে কি না শুধু তা নয়, সেবা নারী কীভাবে বান্তবে ব্যবহার করতে পারছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নারীস্বাস্থ্যের আরেকটি অন্ধ জায়গা হলো জীবনের মধ্যবর্তী পর্ব। কৈশোরে মাসিক, পরে মাতৃত্ব–এই দুই অধ্যায় নিয়ে কিছু আলোচনা থাকলেও পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ নিয়ে আমাদের সামাজিক ও চিকিৎসাগত কথাবার্তা এখনও সীমিত। অনিদ্রা, মুডের পরিবর্তন, হাড়ের ঘনত্ব কমা, হৃদ্রোগের ঝুঁকির পরিবর্তন–এসবকে বয়সের স্বাভাবিক ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে দিলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা জীবনযাপনের সহায়তা দেরি হতে পারে। একইভাবে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের মতো অবস্থাও শুধু সন্তান ধারণের সমস্যা নয়; WHO বলছে, এর সঙ্গে উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও ঘুমের সমস্যার ঝুঁকিও জড়িত থাকতে পারে। এই স্বাস্থ্য–বৈষম্যের অর্থনৈতিক দিকও উপেক্ষা করা যায় না। অসুস্থতা মানে শুধু হাসপাতালের বিল নয়; কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া, পড়াশোনায় বাধা, পরিচর্যার বাড়তি চাপ এবং আয় হারানোর ঝুঁকিও। ম্যাককিনসি ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, নারীর স্বাস্থ্য–বৈষম্য কমাতে পারলে ২০৪০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্য যোগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ নারীস্বাস্থ্যকে ‘ব্যক্তিগত’ বা ‘পারিবারিক’ বিষয় হিসেবে দেখলে বান্তব চিত্রের বড় অংশই বাদ পড়ে।
সমাধান শুরু হতে পারে গবেষণা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সচেতনতা–এই তিন জায়গা থেকে। গবেষণায় নারীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব ও নারী–পুরুষভিত্তিক ফল আলাদা করে বিশ্লেষণ দরকার। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে উপসর্গের লিঙ্গভেদ এবং সামাজিক বাস্তবতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর পরিবার ও সমাজে নারীর নিজের শরীরের কথা বলাকে ‘অভিযোগ’ বা ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখার অভ্যাস বদলাতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো নারীস্বাস্থ্যকে শুধু ‘নারী রোগ’ হিসেবে না দেখা। একজন নারীর হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, হাড়, হরমোন, মানসিক স্বাস্থ্য–সবই চিকিৎসাবিজ্ঞানের পূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। চিকিৎসার লক্ষ্য যদি সবার জন্য সঠিক রোগনির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসা হয়, তবে নারীকে একই মাপকাঠিতে মাপাই সমতা নয়; যেখানে পার্থক্য আছে, সেখানে সেই পার্থক্যকে জানা ও স্বীকার করাই প্রকৃত সমতা।
নারীর শরীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রান্তিক অধ্যায় নয়। বিশ্বের অর্ধেক মানুষের শরীরকে যথেষ্ট ভালোভাবে না বুঝে ‘সবার জন্য চিকিৎসা’ দাবি করা সম্ভব নয়। তাই আজকের প্রশ্ন কেবল নারীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না নয়; প্রশ্ন হলো–চিকিৎসাবিজ্ঞান তাঁদের শরীরকে কতটা মন দিয়ে পড়ছে।
তথ্যসূত্র: World Health Organization—Women’s Health, Cardiovascular Diseases, Endometriosis, Polycystic Ovary Syndrome; World Economic Forum I McKinsey Health Institute—Closing the Women’s Health Gap; NIH/PMC–তে প্রকাশিত clinical trial representation – সংক্রান্ত গবেষণা; World Bank— বাংলাদেশের menstrual health উদ্যোগ।











