যে কবি ভয়কে লিখে রেখেছিলেন

পল্লবী বড়ুয়া | শনিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

লেনিনগ্রাদের একটি কারাগারের বাইরে দীর্ঘ সারি। প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য নারী। কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও ভাইকে তুলে নিয়ে গেছে স্তালিনের গোপন পুলিশ। ভেতরে তাঁদের কী হচ্ছে, কেউ জানেন না। অপেক্ষমাণ নারীদের একজন আনা আখমাতোভা। তাঁর ছেলে লেভ গুমিলেভও বন্দী। সারিতে তাঁর পেছনে দাঁড়ানো এক নারীর ঠোঁট ঠান্ডায় নীল হয়ে গেছে। তিনি আখমাতোভাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। একসময় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন–এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তিনি কি লিখতে পারবেন?

আখমাতোভার উত্তর ছিল, ‘পারব।’

পরে তিনি লিখেছিলেন, উত্তরের পর নারীর মুখে ক্ষণিকের জন্য হাসির মতো কিছু একটা ফুটে উঠেছিল।

বিশ শতকের রুশ কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আনা আখমাতোভার জীবনকে বোঝার জন্য সম্ভবত এই একটি দৃশ্যই যথেষ্ট। কারণ তিনি শুধু কবিতা লেখেননি; এমন এক সময়ে মানুষের ভয়, অপেক্ষা, মৃত্যু ও শোকের সাক্ষ্য বহন করেছেন, যখন সত্য উচ্চারণ করাই ছিল বিপজ্জনক। ১৮৮৯ সালের ২৩ জুন বর্তমান ইউক্রেনের ওডেসার কাছে বলশয় ফনতানে জন্ম আনা আন্দ্রেয়েভনা গোরেঙ্কোর। অল্প বয়স থেকেই কবিতা লিখতেন। তাঁর বাবা পারিবারিক নাম দিয়ে কবিতা প্রকাশে আপত্তি করেছিলেন। ফলে তিনি ‘আখমাতোভা’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। পরে এই নামেই তিনি রুশ সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যান।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ Ecening প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালে। দুই বছর পর আসে Rosary। তখন তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গের সাহিত্যজগতে পরিচিত মুখ। আখমাতোভা ও তাঁর প্রথম স্বামী কবি নিকোলাই গুমিলেভ ‘অ্যাকমেইজম’ নামে পরিচিত সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রতীকবাদের দুর্বোধ্যতার বিপরীতে স্পষ্ট ভাষা, দৃশ্যমান জগৎ এবং মানবিক অভিজ্ঞতার সুনির্দিষ্ট প্রকাশকে গুরুত্ব দিয়েছিল এই আন্দোলন। প্রথম দিকের আখমাতোভার কবিতায় প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতি প্রধান হয়ে উঠেছিল। সংযত ভাষা এবং অল্প কথায় তীব্র আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু রুশ বিপ্লব এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর কবিতার পৃথিবীই বদলে দেয়। ১৯২১ সালে তাঁর সাবেক স্বামী নিকোলাই গুমিলেভকে বলশেভিকবিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে সোভিয়েত গোপন পুলিশ। তাঁদের ছেলে লেভের বয়স তখন মাত্র নয় বছর। বাবার রাজনৈতিক পরিচয় পরবর্তী সময়ে ছেলের জীবনেও দীর্ঘ ছায়া ফেলে।

নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক নীতির সঙ্গেও আখমাতোভার কবিতা খাপ খাচ্ছিল না। তাঁর কবিতাকে ‘বুর্জোয়া’ ও অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলে আক্রমণ করা হতে থাকে। ১৯২০–এর দশকের মাঝামাঝি থেকে দীর্ঘ সময় তাঁর নতুন কবিতা প্রকাশ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অথচ তিনি দেশ ছাড়েননি। তাঁর অনেক বন্ধু ও সমসাময়িক লেখক দেশ ছেড়েছিলেন, নির্বাসিত হয়েছিলেন কিংবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। আখমাতোভা থেকে গেলেন। সবচেয়ে কঠিন সময় আসে স্তালিনের মহাসন্ত্রাসের বছরগুলোতে। তাঁর ছেলে লেভকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয় ১৯৩৫ সালে; ১৯৩৮ সালে আবার গ্রেপ্তার করে শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও শিল্প–ইতিহাসবিদ নিকোলাই পুনিনও বারবার গ্রেপ্তার হন এবং শেষ পর্যন্ত গুলাগে মারা যান। ছেলের খবর জানার জন্য আখমাতোভা লেনিনগ্রাদের ক্রেস্তি কারাগারের সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতেন। তাঁর নিজের হিসাবে, কারাগারের সারিতে এভাবে কেটেছিল সতেরো মাস।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা Requiem।

১৯৩৫ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে মূলত রচিত এই কবিতাগুচ্ছ শুধু একজন মায়ের বন্দী ছেলের জন্য শোক নয়। আখমাতোভা নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে স্তালিনীয় সন্ত্রাসে সন্তান, স্বামী ও স্বজন হারানো অগণিত নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেন। ফলে Requiem–এর ‘আমি’ ক্রমে একজন কবি কিংবা একজন মা থেকে একটি সময়ের অসংখ্য মানুষের কণ্ঠে পরিণত হয়। কিন্তু এই কবিতা লিখে রাখাও ছিল বিপজ্জনক। রাষ্ট্রীয় তল্লাশিতে পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেলে তাঁর নিজের এবং পরিচিতদের জীবন বিপন্ন হতে পারত। তাই আখমাতোভা কবিতার অংশ বিশ্বস্ত বন্ধুদের পড়ে শোনাতেন। তাঁরা মুখস্থ করে নিতেন। তারপর লেখা কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হতো। একটি সাহিত্যকর্ম এভাবে মানুষের স্মৃতির ভেতর লুকিয়ে বেঁচে ছিল।

Requiem আখমাতোভার জীবদ্দশায় সোভিয়েত ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৬৩ সালে এটি বিদেশে প্রকাশিত হয়; সোভিয়েত ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ আসে আরও অনেক পরে, ১৯৮৯ সালে। যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সাক্ষ্য তিনি লিখে রেখেছিলেন, সেই রাষ্ট্রে পাঠকের কাছে প্রকাশ্যে পৌঁছাতে লেখাটিকে প্রায় অর্ধশতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৬ সালে আখমাতোভার ওপর আবার রাষ্ট্রীয় আক্রমণ নেমে আসে। কমিউনিস্ট পার্টির এক সিদ্ধান্তে তাঁর সাহিত্যকে আদর্শগতভাবে ক্ষতিকর বলে নিন্দা করা হয়। তাঁকে সোভিয়েত লেখক সংঘ থেকে বহিষ্কার করা হয়, তাঁর বই প্রত্যাহার করা হয় এবং প্রকাশের পথ আবার বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৪৯ সালে ছেলে লেভ আবার গ্রেপ্তার হন। তাঁকে দশ বছরের শ্রমশিবিরের সাজা দেওয়া হয়। ছেলেকে মুক্ত করার মরিয়া চেষ্টায় আখমাতোভা স্তালিনের প্রশস্তিমূলক কবিতাও লিখেছিলেন– যে কবির স্বাধীন কণ্ঠকে রাষ্ট্র স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, সেই কবিকেই সন্তানের জন্য রাষ্ট্রের কাছে নত হতে হয়েছিল। তাতেও লেভ মুক্তি পাননি। স্তালিনের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুটা শিথিল হলে ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি পান আখমাতোভার নিজের স্বীকৃতিও জীবনের শেষ দিকে ফিরতে শুরু করে। ১৯৬৪ সালে ইতালিতে তিনি Etna-Taormina আন্তর্জাতিক কবিতা পুরস্কার পান। পরের বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দেয়। ১৯৬৬ সালের ৫ মার্চ, ৭৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

কিন্তু আখমাতোভাকে স্মরণীয় করে রেখেছে শুধু তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া নিপীড়ন নয়। নিপীড়নের শিকার হওয়া এবং সেই অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপ দিতে পারা এক বিষয় নয়। তাঁর বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি ব্যক্তিগত বিপর্যয়কে এমন ভাষা দিয়েছেন যেখানে একটি দেশের ইতিহাস এসে আশ্রয় নিতে পারে। কারাগারের সামনে সেই অচেনা নারী আসলে আখমাতোভার কাছে কবিতা চাননি। তিনি চেয়েছিলেন সাক্ষ্য। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে যা ঘটছে, তা কি কেউ ভাষায় ধরে রাখতে পারবে? এমন কোনো চিহ্ন কি থাকবে, যার কারণে ভবিষ্যৎ একদিন জানতে পারবে–এই মানুষগুলো ছিল, তারা অপেক্ষা করেছিল, ভয় পেয়েছিল, সন্তান হারিয়েছিল।

আখমাতোভা বলেছিলেন, ‘পারব।’ জবয়ঁরবস প্রমাণ করে, তিনি পেরেছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাদক নির্মূলে প্রতিটি মসজিদে কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা উচিত
পরবর্তী নিবন্ধনিজেরই খোলসের আবরণে, নিরাপদ জীবন কাটাতে চেয়েছি