নিজেরই খোলসের আবরণে, নিরাপদ জীবন কাটাতে চেয়েছি

মূল: জেসিকা হেনরিকুয়েজ

অনুবাদ: মাহমুদ আলম সৈকত | শনিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

সামুদ্রিক মেয়ে কচ্ছপ যখন ডিম ফুটে বের হয়, তখন তার দৈর্ঘ্য বড়জোর দুই ইঞ্চি হয়; আর জীবনের শুরুতেই সে প্রথম যে কাজটি করে, তা হলো দ্রুতগতিতে সমুদ্রের জলের দিকে ছুটে যাওয়া। একদমই পিছনে ফিরে তাকায় না, দ্বিধাহীন। সে কেবল ছুটতেই থাকে। এরপর কয়েক দশক সে খোলা সমুদ্রে কাটায় এবং অবশেষে ডিম পাড়ার জন্য ঠিক সেই বালুকাময় সৈকতে ফিরে আসে যেখানে সে জন্মেছিল।

তার শরীরের ভেতরেই যেন একটি মানচিত্র বা তার জন্মস্থানের এক বিশেষ ছাপ গেঁথে থাকে। সমুদ্রের জল স্পর্শ করার আগেই যা তার ভিতরে মুদ্রিত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ন্যাটাল হোমিং’ বা জন্মস্থানে ফিরে আসার সহজাত প্রবৃত্তি। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, আমাদের মধ্যেও এমন মানচিত্র থাকে, সেখানে এমন সব গন্তব্য থাকে যার দিকে আমরা এগিয়ে চলি, অথচ ঠিক কোথায় যাচ্ছি তা হয়তো আমরা তখনও জানি না।

বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁইয়ে এসে আমার ভিতরে কেমন এক ভয়ের উদয় হলো। জীবনের যতটা পথ আমি পেরিয়ে এসেছি, সামনের পথ হয়তো তার চেয়েও ছোট। জীবনের সেরা ভালোবাসাগুলো হয়তো এসে চলেও গেছে, সব দরজা–কপাট যেন বন্ধ হয়ে আসছে; ব্যস এটুকুই–এর বেশি আর কিছুই হয়তো আমার ভাগ্যে নেই।

এরকম একটা ধারণা আমি মেনে নিয়েছিলাম, ভেবেছি–আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি ঠিক নতুন করে ভালোবাসা চাইনি বা নতুন কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ–এসব কিছুই চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম জীবনে একটু নিরাপদ বোধ করতে। এমন কারো সাথে একটা ঘরে থাকতে, যেখানে আমাকে সারাক্ষণ ভাবতে হবে না, যে, আমি কী ভুল বললাম, কিংবা ক্ষমা করা বা ক্ষমা চাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। বলতে দ্বিধা নেই, কোনো পুরুষই আমাকে সেই স্বস্তি বা নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

ত্রিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই চারবার বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলাম, দুবার তাতে সম্মতি দিয়েছিলাম এবং দুবার বিয়ে ও বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমি এমন মানুষদের ভালোবেসেছিলাম যারা আমাকে ভালোবাসত বটেই, কিন্তু কোনো সম্পর্কই আমাকে জীবনের কোনো সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সাহায্য করেনি। আমি কেবল ভেবেই গেছি যে, পরের মানুষটি হয়তো আমাকে সেই স্থিরতা দেবে।

চল্লিশের দোরগোড়ায় আমি ঠিক সেভাবেই পৌঁছালাম, যেভাবে একজন মানুষ ম্যারাথন শেষ করে–পায়ে টান ধরা, ফুসফুসে জ্বালাপোড়া আর জয়ের আনন্দ অনুভব করার মতো শক্তিটুকুও বাকি নাই। প্রতিটি সম্পর্কই আমার কাছ থেকে ভিন্ন কোনো সত্তার দাবি জানিয়েছিল; আর প্রতিবারই আমি নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম, শুরুতে আমার যে নিজস্ব সত্তাটুকু ছিল, তার কিছুটা কিছুটা করে আমি একেকটা সম্পর্কেই হারিয়ে ফেলেছি। যখন এক এক করে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি ভেবেছিলাম যে এই পরিস্থিতির সঙ্গেও মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। কোনোকিছুর হাত থেকে বাঁচতে কিংবা কোনোকিছুর দিকে ছুটতে ছুটতে আমি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সম্ভবত ঠিক এই কারণেই আমি কচ্ছপদের সন্ধানে নামি।

ক্যালিফোর্নিয়ার টোপাটোপা পর্বতমালার পাদদেশে নব্বই একর শুকনো ঝোঁপঝাড়পূর্ণ এলাকায় কচ্ছপ সংরক্ষণ কেন্দ্রটির অবস্থান। সেখানে ছয়শ’রও বেশি জল–কচ্ছপ ও ভূমি–কচ্ছপ বাস করে; তাদের দেখাশোনা করেন এমন সব তত্ত্বাবধায়ক, যারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে, এক গভীর নিষ্ঠা নিয়ে, কচ্ছপের ঘেরের ভেতর চলাফেরা করেন।

আমি কচ্ছপদের ঘেরা জায়গাটা পরিষ্কার করতাম, নতুন অ্যাভোকাডো পাতা ছড়িয়ে দিতাম, খাবারের পাত্রগুলোতে লেটুস পাতা, ফুল ও ক্যাটলফিশের শুটকি দিয়ে ভরে দিতাম। ওদের খোলসের উপরে হাত দিয়ে নারিকেল তেল মাখিয়ে মাখিয়ে সকালবেলাটা কাটত, ওই সময়টায় ওরা আমার গায়ে গা ঘেঁষে থাকত, সেই স্পর্শে এমন একটা অনুভব হতো…যেন ওরা আমাকে বিশ্বস্ত কেউ হিসাবে মনে করছে। কাছ থেকে দেখলে মনে হবে, কচ্ছপের খোলস যেন এক শিল্পকর্ম! খোলসের প্রতিটি টুকরো বা ‘স্কুট’–এর চারপাশে একে অপরকে ছাপিয়ে আসা বলয়ের মতো রেখা থাকে। পিঠজুড়ে সেই নকশার পুনরাবৃত্তি ঘটে ঠিকই, কিন্তু কোনোটিই আবার হুবহু এক নয়। নিজের পুরো ইতিহাসকে শরীরের বাইরের অংশে বয়ে বেড়ানোর দৃশ্যটা এমনই।

এখানে আসার আগে আমার ধারণা ছিল, কচ্ছপের খোলস বুঝি কোনো ধার করা ঘর–যা একসময় ছোট হয়ে যায় আর কচ্ছপ সেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু খোলসটা এমন কিছু নয় যা কচ্ছপ কেবল বয়ে বেড়ায়; বরং খোলসটাই কচ্ছপের সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি সারাক্ষণ এ নিয়ে ভাবতাম–আজন্ম এমন এক সুরক্ষার আবরণে ঢাকা থাকার অনুভূতিটা কেমন হতে পারে।

বিবাহিত জীবনের কত রাত যে কেটেছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে, বাতি জ্বালিয়ে, পাশে শোয়া স্বামীর শ্বাস–প্রশ্বাসের উঠা–নামা শুনতে শুনতে। সে আমাকে তাঁর সাধ্যমতোই ভালোবাসত, মানে যেটুকু ভালোবাসা তাঁর জানা ছিল। আর আমি শুয়ে শুয়ে আমাদের মাঝখানের দূরত্ব মাপতাম–বিছানার চাদরের সেই কয়েক ইঞ্চির ব্যবধান এতটাই বিশাল মনে হতো যে, সেই বিশালতার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা কল্পনাও করতে পারতাম না।

আমি কিছুই বলতাম না। কখনোই না। সমস্যাটা ঠিক এখানেই, আমাদের বিয়েটাও ছিল এক ধারার–একজন নারী আলো নিভিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছে, কিছু বিষয় হয়তো চিরকাল অদেখাই থেকে যাবে।

তুমুল তর্কের সময় শরীর যখন ভয়ে কাঁপতে শুরু করত, তখন কতবার যে তাঁর হাত ধরতে চেয়েছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। নিজেকে বিসর্জন দেওয়াটা আমার কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল যে, নিজের ক্ষতগুলোর কথা ভাবার বা বুঝে ওঠার আগেই আমি কোমলতার কিংবা ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিতাম।

ভালোবাসা পেয়েও যে অনিরাপদ বোধ করা যায়, সেটা আসলে সম্ভব। আমাদের সম্পর্কে কিছু একটা অভাব ছিল যার কোনো নাম আমি তখনো জানতাম না; এমন কিছুর অভাব যা আমি ভুল মানুষের কাছে পাওয়ার চেষ্টা করতাম। যে পুরুষরাই আমাকে ভালোবাসত, তাদের ওপর আমি এক অসম্ভব দায়িত্ব চাপিয়ে দিতাম: তুমি অটল থাকো যাতে আমিও নিজেকে অটল মনে করতে পারি; আমাকে সুরক্ষা দাও যাতে আমি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারি।

একটা কচ্ছপের সাথে আমার বেশ সখ্য গড়ে উঠেছে; আমি তার নাম দিয়েছি ড্যামিয়েন। ড্যামিয়েন–যেন দরজার সামনে রাখা এক ভারী পাথর। গ্যালাপাগোস কচ্ছপেরা অনায়াসেই একশো বছরের বেশি বাঁচতে পারে। এদের অনেকেই বেঁচে আছে সেই গৃহযুদ্ধের আগে থেকে, টেলিফোন আবিষ্কারের আগে থেকে–এমনকি আমার জানাশোনা কোনও অস্তিত্বের ধারণারও অনেক আগে থেকে।

রোজ সকালে যখন আমি ঘেরের ছোট্ট দরজাটা খুলি, দেখি ড্যামিয়েন তার বিশাল শরীর নিয়ে দরজার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেন এক নির্বিকার পাথরখন্ড। অন্য কচ্ছপেরা শেষমেশ তার ওপর দিয়েই হেঁটে বেরিয়ে পড়ে। সে হেলেদুলে প্রস্তুত হয়ে বাইরে আসে; নিজের মর্জিমাফিক চলার মতো বয়স হয়েছে কী–না!

(আগামী সংখ্যায় শেষ হবে)

পূর্ববর্তী নিবন্ধযে কবি ভয়কে লিখে রেখেছিলেন
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের ১২তম সভা