বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। প্রকৃতির সাজসাজ রূপ মনের মাঝে দোলা দিয়ে জানান দিচ্ছে – এসে গেল বাংলা নববর্ষ। আমরা নববর্ষ উদযাপন করি জাতীয় সংস্কৃতির নান্দনিক স্পর্শের কারণে। সংস্কৃতি সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনের প্রত্যয়গত চেতনার প্রকাশ। শৈশব থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের মানসজাত প্রক্রিয়া, জীবনের গভীর বিশ্বাস, প্রকাশের অভিনব রূপ, নিজেকে সজ্জিত করার বিভিন্ন বিন্যাস আর মনের আবিষ্কার নানাভাবে প্রকাশ করে জীবনের পরিপূর্ণ একটি রূপ নির্মাণ করে, যা জাতীয় জীবনের গৌরব হিসেবে কারুকার্য পূর্ণ নকশার বিভাসিত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জাতীয় জীবনে বৈশাখ মাস বারো মাসে একবার ই আসে বলে তাকে বরণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি।
বাংলা নববর্ষ আমাদের অহংকার, আনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ যার মধ্যে স্বার্থপরতার কোন স্পর্শ নেই, শুধু চারপাশে নিজের আনন্দকে হলদে সর্ষে ফুলের মতো বাতাসের মধ্যে আন্দোলিত করা। জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও আনন্দ চিরস্থায়ী। নববর্ষ উদযাপন তার সাক্ষী। এদেশের কৃষকদের আঙিনা যখন নতুন শস্যের সুগন্ধে ভরে যায়– কৃষক বধু আঁটি বেঁধে ধান সাজিয়ে রাখে আর ঢেঁকিতে ধান ভানে, নতুন চাল দিয়ে বাড়িতে তৈরি হয় পিঠে আর ক্ষীর, নতুন বাংলা বছরকে বরণ করার জন্য ই তো এই আয়োজন। এদেশে এখনো বাংলা নববর্ষ গ্রামীণ জনপদের। বাংলা বর্ষ গণনা কে জীবনের সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা, আকাশের রূপ দেখে তার মনে পড়ে ষড় ঋতুর আগমনী বার্তা, কাশফুল তার মনে শুধু জানিয়ে দেয়না শরতের আগমনী বার্তা –ঋতুর কথা ও স্মরণ করিয়ে দেয় – তবে কবে কোন জমিদার পূণ্যাহ পালন করতেন – তা হয়তো জানা নেই– কিন্তু হালখাতার উৎসব পালন করেন আন্তরিক ভাবে।
রমনার বটমূলে আমরা যখন সমবেত হই তখন আমাদের একটাই পরিচয় ‘আমরা বাঙালি আমরা মানুষ’। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে। অনেক নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে – তাদের ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক নামাচ্ছে বাজারে। আবার এতে সম্পৃক্ত হচ্ছে গ্রামীণ নারীরা। মাটি ও ফুলের গয়না, কাঠের তৈরি নানা ধরনের ঘর সাজানোর জিনিস – এসবে যুক্ত হচ্ছে গ্রামীণ নারীরা। নববর্ষকে ঘিরে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন – বিনিয়োগ শিল্পে বাড়ছে বিনিয়োগ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটছে – অর্থাৎ নববর্ষ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বিপুল সংখ্যক তরুণ তরুণীর কর্মসংস্থানও ঘটছে। ঐতিহ্যবাহী খাবারের চাহিদাও বাড়ছে – নববর্ষকে ঘিরে।
আধুনিকায়নের নামে স্বদেশী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার কোনও উপায় নেই। বরং একে সঙ্গে নিয়েই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। প্রযুক্তির সমন্বয়ে আমাদের সৃজনশীল তরুণ তরুণীদের যদি নববর্ষের সর্বজনীন সংস্কৃতির মধ্যে যুক্ত রাখা যায় – তাহলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও লাভবান হ ওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় -‘বাংলাদেশে নানা নদী এসে সমুদ্রে পড়েছে, সেই বহু নদীর সমুদ্র সংগম থেকেই বাংলাদেশ আপনি একটি বিশেষ প্রকৃতি লাভ করে তৈরি হয়ে উঠেছে।’ সকল অর্থেই বাংলাদেশ এক “মেল্টিঙ পট’
সারা বিশ্বের শিক্ষা – সংস্কৃতির সুবাতাস বাংলাদেশে বইবার কথা। বহুমাত্রিক জীবনবোধ, গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা, নানা ধর্মের ও বর্ণের মিলনমেলা হবার কথা বাংলাদেশের। কিন্তু সকলের মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করার প্রকৃতি যেন নানামুখী আক্রমণের মুখে। আমাদের নষ্ট ও বিভাজনের সংস্কৃতি সমাজবদ্ধ সংস্কৃতির ইতিবাচক শক্তিকে উন্নয়নের কাজে লাগাতে দিচ্ছে না। দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বার্থপরতা, আমলাতন্ত্রের অহমিকা এবং সুশিক্ষার সংকটের কারণে সাংস্কৃতিক শক্তি ও বিপন্ন।
তবে এটি আমরা হারিয়ে দিতে পারি না। বরং সৃজনশীল পরিশ্রমী , সামষ্টিক চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী লক্ষ্য কোটি মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং উদ্যমী তারুণ্যের দেশপ্রেমে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ সামনের দিকে, মানবিকতা ও কল্যাণের প্রতীক হবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আজকের বিপন্নতা ও ব্যর্থতা নিশ্চিত কেটে যাবে। শুভ নববর্ষ সবাইকে।
লেখক : সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ।













