পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসবের দিন। আনন্দের দিন। ঐতিহ্যের দিন। সংস্কৃতির দিন। পরিচয়ের দিন। বহুকাল থেকে বাঙালি এ দিনটিতে নিজের স্বরূপ অন্বেষণ করে। এ বিশেষ দিনটিকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নিজের কৃষ্টিকে তুলে ধরতে চায়। বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয়। সবার মঙ্গল কামনা করে। সারা বছর যেন ভালোভাবে কাটে সে প্রার্থনা করে। অশুভ সব কিছুর বিনাশ চায়। অবসান চায়। বিগত বছরের জ্বরা গ্লানি মুছে দিয়ে নব উদ্যমে নতুন বছরে ঢুকতে চায়। ধর্ম বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে চায়। সম্প্রীতির বন্ধন যেন অটুট থাকে সবাই সে বন্ধনা করে। এ দিনটিতে অতীত ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামীর পথ চলা শুরু করে। এ পথ চলা যেন হয় সাম্যের, সৌহার্দ্যের, সম্প্রীতির। পারস্পরিক সহমর্মিতার, সহাবস্থানের, সহিষ্ণুতার। সবার জন্য কল্যাণের।
পহেলা বৈশাখে আয়োজনের শেষ নেই। তার অন্যতম আয়োজন হলো মেলা। গ্রামে গঞ্জে শহরে বন্দরে নগরে সবখানে মেলা বসে। অনেকে বৈশাখী মেলা বলে। কোথাও কোথাও চৈত্রের শেষ দিনে এ মেলা শুরু হয়। কেউ কেউ চৈত্র সংক্রান্তিও বলে থাকে। চাকমা মারমারা এ উৎসবকে বৈশাবি বলে। আবার কোন সম্প্রদায় বিজু উৎসব নামে উদযাপন করে। যে নামে পালন করুক না কেন সবাই বৈশাখকে ঘিরে উৎসব উদযাপন করে থাকে। পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে চায়। এর মাঝে এরা আনন্দ খুঁজে পায়। নিজেদের অস্তিত্বকে দেখতে পায়। প্রত্যেকের যে নিজস্ব স্বকীয়তা আছে আবার আলাদা সংস্কৃতি আছে তা উপলব্ধি করতে পারে। একইসাথে সবাই যে অভিন্ন ধারায় অবহাগন করতে পারে তা বৈশাখে প্রতিয়মান হয়। বছরের শেষ দিনে ব্যবসায়িরা হিসাব নিকাশ চুকাতে চায়। যাকে হালখাতা বলে। প্রথম দিনে নতুন করে আবার হিসাব শুরু করে।
এদিনে দেশের সর্বত্র মেলা বসে। দেশীয় পণ্যের মেলা। হস্ত শিল্প, কারুশিল্প, মৃৎশিল্প কোনকিছুর কমতি থাকে না। গৃহস্থালী জিনিসপত্র, তৈজসপত্র, বাঁশ বেতের পণ্যসামগ্রী, মাটির তৈরি হাড়ি পাতিল, ফুলের টব, হাতি–ঘোড়া, রং বেংয়ের পুতুল, খেলনা আরো কতকিছু পাওয়া যায়। নাগর দোলা, পুতুল নাচ মেলার আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দেয়। বাঁশি বাজিয়ে ছেলে মেয়েরা অন্যরকম আনন্দ উপভোগ করে। তালপাতার হাত পাখা গরমের মধ্যে যেন স্বস্তি এনে দেয়। দেশীয় ফলমূল বাঙ্গি, তরমুজের মতো রসালো ফল মেলায় ভরপুর থাকে। ফুল ঝাড়ু, শলার ঝাড়ু থেকে শুরু করে শীতল পাটি যতসব প্রয়োজনীয় জিনিস মেলায় পাওয়া যায়। খৈয়ের ওরা, মুড়ির মোয়া, সরিষা, তিলির টপি, চনামনার ট্যাং শুধু ছেলেমেয়েরা না বড়রাও পছন্দ করে। ঘরের শোভা বর্ধনের জন্য নানা কারুকাজপূর্ণ সৌন্দর্য্যময় জিনিসের সমাহার হয় মেলায়।
বৈশাখী মেলার সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে। কোতোয়ালীর মোড় থেকে শুরু হয়ে আন্দরকিল্লার মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়ে মেলা বসে। এ মেলা থেকে মানুষ সারা বছরের প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি জিনিসপত্র সংগ্রহ করে রাখে। পূর্বদিকে আমানত শাহ দরগাহ এবং পশ্চিমে সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত বিস্তৃত এ মেলা হরেক রকমের জিনিসপত্রে ভরে ওঠে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন ছুটে আসে এ মেলায়। সিলেট থেকে বাঁশ বেতের তৈরি নানা রকম পণ্য সামগ্রী নিয়ে আসে। এমন কোন জিনিস নেই যা এ মেলায় পাওয়া যায় না। নারী পুরুষ সবাই এসে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিয়ে যায়। বিশেষ করে নারীরা ঘরের ব্যবহার্য জিনিসপত্র কিনতে ব্যস্ত থাকে। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ বলী খেলা। জব্বারের বলী খেলাকে কেন্দ্র করে এ মেলা বসে। বিভিন্ন এলাকার বলীরা এসে লালদিঘির মাঠে কুস্তি খেলায় মেতে ওঠে। একজন আরেকজনকে ধরাশায়ী করে। একজন শ্রেষ্ঠ বলীর খেতাব পায়। মেডেল গলায় দুলিয়ে দুহাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানায়।
শতাব্দী কাল থেকে ডিসি হিলে যে মেলাটি বসে সেটা বেচা কেনার মেলা নয়। তেমন কেউ পসরা সাজিয়ে বসে না এখানে। বেলা ওঠার সাথে সাথে শিশু কিশোরের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। ঢোলের শব্দে আর বাদ্যের তালে তালে এরা যেন নাচতে শুরু করে, গাইতে শুরু করে। ‘এসো হে বৈশাখ’। সকালের কাঁচা সোনা মাখা রোদ এদের চোখে মুখে এসে পড়ে। এরা সবাই যেন নব কেতনের জয়গান গেয়ে নব বর্ষকে স্বাগত জানায়। ততক্ষণে ডিসি হিল চত্ত্বর কানায় কানায় ভরে ওঠে। কবি শিল্পী সাহিত্যিক সংষ্কৃতি কর্মী সবাই মিলিত হয় এ চত্ত্বরে। কখনো গান, কখনো কবিতা কখনো নাটকের সংলাপ ভেসে আসে মঞ্চ থেকে। উপস্থিত শ্রোতা দর্শকেরা মুদ্ধ হয়ে শোনে। বাজনার তালে তালে তারাও যেন অনুরণিত হতে থাকে। একের সাথে অন্যের ভাব বিনিময় করে। ভাবের আদান প্রদান করে। এ যেন অন্যরকম এক মেলা। কেউ কেউ বলে মিলন মেলা। অনেকে বলে প্রাণের মেলা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মেলা চত্বরে আর জায়গা থাকে না। এতো মানুষ কোথা থেকে আসে। নারী পুরুষ শিশু কিশোর তরুণ তরুণী কেউ যেন আর ঘরে থাকে না। ছেলে মেয়ে পরিবারের সবাই এ মেলায় ছুটে আসে। কিসের টানে আসে। কেউ বলে নাড়ির টানে, কেউ বলে প্রাণের টানে। পহেলা বৈশাখ যেন বাঙালির শেকড়, বটবৃক্ষের শেকড়। যে বৃক্ষের ছায়াতলে সবাই আসতে চায়।
বেশ কয়েক বছর থেকে সিআরবিতে আরেকটা মেলা বসে। বছর বছর এ মেলাটিতে লোক সমাগম বাড়তে থাকে। একসাথে তারুণ্যের জোয়ারে মেলা ভাসতে থাকে। এখানেও বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিল্পীরা গান শোনায়, আবৃতি করে, নাচে গানে সবাইকে মাতিয়ে তোলে। গাছ গাছালি শোভিত এ জায়গাটা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। যেখানে অনুষ্ঠান সেখানে মানুষ যায়। আবার বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হলে কথাই নেই। ছুটির দিন হওয়ায় মানুষের ঢল নামে। শিশুকিশোর আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই ছুটে আসে বৈশাখের মেলায়। তখন চারিদিকে পাহাড় ঘেরা এ জায়গাটি অন্যরকম হয়ে ওঠে। সিআরবির দালান কোঠা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। মানুষের সমাগম সবকিছুকে যেন বিবর্ণ করে দেয়। উঁচু উঁচু শাখা প্রশাখা বিস্তৃত পুরানো বৃক্ষরাজি আর ঢেউ খেলানো পাহাড়ের চুড়া দুপুরের সূর্যটাকে আড়াল করে রাখে। দুপুরটা আর দুপুর থাকে না। কখন পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে পড়ে কেউ টের পায় না। মানুষের পদচারনায় সবকিছু নতুন করে পল্লবিত হয়ে ওঠে।
পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও শোভাযাত্রা বের হয়। অনেকে বলে মঙ্গল শোভাযাত্রা। কেউ বলে আনন্দ শোভা যাত্রা। আবার এখন বলে বৈশাখী শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের একটি অংশ। বাঙালির চিরায়ত বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা মঙ্গলের বার্তা পৌঁছাতে চেষ্টা করে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বলে। অশুভকে বিনাশ করে সঠিক পথে চলতে বলে। নানা রকম বাধা আসে। বাধাকে শক্তি আর সাহস দিয়ে মোকাবেলা করতে হয়। সংস্কৃতির শক্তি, সম্প্রীতির শক্তি দিয়ে। অসম্প্রদায়িক চেতনা আর মানবিক মনোবল দিয়ে সাম্প্রদায়িক দানবকে রুখে দিতে হয়। এবারের পহেলা বৈশাখ সবাইকে এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এক সূত্রে গেঁথে রাখুক। এ হোক আমাদের কামনা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী।












