ফটিকছড়িতে শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে খামার মালিকসহ ২ জনের সলিল সমাধি

ফটিকছড়ি প্রতিনিধি | শনিবার , ৩০ মে, ২০২৬ at ১১:২৭ অপরাহ্ণ

একদিকে দুই অবুঝ শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার আনন্দ, অন্যদিকে চোখের পলকে তলিয়ে যাওয়া আরেক শিশুকে বাঁচাতে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার এক চরম আত্মত্যাগ। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ঘটে গেল তেমনই এক বুক ফাটানো মর্মান্তিক ঘটনা।

পুকুরের পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিলেন মৎস্য খামার মালিক মফিজ (৪৫)। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না আড়াই বছরের ফুটফুটে শিশু মুনতাহিনারও। আজ শনিবার (৩০ মে) বিকেল সাড়ে ৫টায় পাইন্দং ইউনিয়নের ডলু নয়াবাজার আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় থমকে গেছে পুরো এলাকা।

তখন কেবল বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ডলু নয়াবাজার এলাকার মৎস্য খামারের শান্ত পুকুরে ভাসমান একটি ছোট্ট নৌকায় হাসিখেলো মেতেছিল তিনটি অবুঝ শিশু। কেউ জানত না, এই খেলাই তাদের জীবনের শেষ খেলা হতে যাচ্ছে। হঠাৎ এক অসাবধানতায় উল্টে যায় নৌকাটি। মুহূর্তের মধ্যে শিশুদের কলকাকলি রূপ নেয় বাঁচার আকুল আর্তনাদে। শান্ত পানির বুক চিরে ভেসে আসে তাদের হাবুডুবু খাওয়ার শব্দ।

দূর থেকে সেই আর্তনাদ কানে পৌঁছাতেই আর এক মুহূর্তও ভাবেননি খামার মালিক মফিজ। নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন গভীর পানিতে। পরম মমতায়, এক এক করে দুটি শিশুকে টেনে তোলেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। তীরে থাকা মানুষ তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল। কিন্তু মফিজের নজর ছিল পানির দিকে—তখনো যে নিখোঁজ আড়াই বছরের ছোট্ট মুনতাহিনা!

দুই শিশুকে বাঁচিয়ে হাঁপিয়ে ওঠা মফিজ এতটুকু জিরিয়ে নেওয়ার সময় নেননি। মুনতাহিনাকে বাঁচাতে তিনি আবারও ডুব দেন পুকুরের অতল গহ্বরে। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে হাত দুটি একটু আগে দুই শিশুকে নতুন জীবন দিয়েছিল, সেই হাত দুটিই পানির নিচের চোরাবালির কাছে হেরে গেল। দীর্ঘক্ষণ পার হলেও মফিজ আর ভেসে উঠলেন না।

উপস্থিত মানুষের উল্লাস মুহূর্তেই রূপ নিল কান্নায়। স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। পরে স্থানীয়রা পুকুরে নেমে যখন মফিজের নিথর দেহটি ওপরে তুলে আনেন, তখন তার চোখ দুটি যেন সিক্ত ছিল মুনতাহিনাকে বাঁচাতে না পারার এক অব্যক্ত যন্ত্রণায়। এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ৮টার দিকে উদ্ধার হয় ফটিকছড়ি পৌরসভার কে.এম. টেক এলাকার ব্যবসায়ী আজাদের কলিজার টুকরো মুনতাহিনার নিস্পাপ মরদেহটি।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফটিকছড়ি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন ঘটনাস্থলে ছোটেন, ততক্ষণে দুটি প্রাণ হারিয়ে গেছে চিরতরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিস এলেও তাদের সাথে ছিল না কোনো ডুবুরি। ফলে আধুনিক এই যুগেও উদ্ধারকারীদের কেবল দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছে লাশের মিছিল। কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় ফায়ার সার্ভিসের ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, “কত প্রাণ অকালে ঝরলে প্রশাসনের টনক নড়বে?”

একই সাথে বীর হৃদয়ের মানুষ মফিজ এবং নিষ্পাপ শিশু মুনতাহিনার এই চলে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছেন না। মুনতাহিনার মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ আর মফিজের পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে ফটিকছড়ির আকাশ-বাতাস। ফটিকছড়ি থানা পুলিশ জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পরের উপকারে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া মফিজের এই মহান আত্মত্যাগ ফটিকছড়ির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর রূপকথা হয়ে থাকবে, আর মুনতাহিনার অকাল মৃত্যু মনে করিয়ে দেবে উৎসব বা আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক চিরন্তন ট্র্যাজেডির কথা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২ যুবক নিহত