বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশবাসীর মাথাপিছু আয় বেড়ে ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার হয়েছে। যা টাকার হিসাবে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ১৫ পয়সা ধরে)। গত অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার। এ হিসাবে বছরের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৫১ মার্কিন ডলার। এদিকে দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), অর্থাৎ অর্থনীতির আকারও ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন ডলার। বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও সঞ্চয় স্থবিরতার মধ্যেও চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাতভেদে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেবা খাতে। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এ ছাড়া শিল্পে ২ দশমিক ৮৬ এবং কৃষিতে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমলেও শিল্প খাতে বেড়েছে।
দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি সুসংবাদ। এটা সরকারেরও জন্য বড় অর্জন। তবে দেশের শতভাগ মানুষ কখনোই একটি সরকারের সকল অর্জনকে সমান চোখে দেখবে না। আমরাও সেটা প্রত্যাশা করি না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে চমক দেখিয়ে আসছে। বলা হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধরন বিবেচনা করলে দেখা যায়, উভয় দেশে সামপ্রতিককালে আয়বৈষম্য বেড়েছে। সম্পদবৈষম্যও বেড়েছে। তবে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে বৈষম্য বেশি। দুই দেশেই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। এটা মনে রাখতে হবে যে, ভারতের অর্থনীতির আকার বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বড়। আবার অনেক বড় দেশ হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থার বেশ তারতম্য রয়েছে। সুতরাং অর্থনীতির আকার, দেশের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যকার অবস্থার পার্থক্য, কোভিড অতিমারির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক কাঠামো ও তার শক্তি প্রবৃদ্ধির ধরন, বৈষম্য পরিস্থিতি ইত্যাদির বিবেচনায় পুরো বিষয়টি দেখতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, আমাদের দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। তবে তা সমানুপাতিক হারে সবার ভাগে পড়ছে না। সমাজে ধনীর সংখ্যা বাড়ছে তরতর করে। কিছু লোকের হাতে ধন সম্পদ জমা হচ্ছে এমনভাবে, যার ভাগ দেশের সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। এ অবস্থাতেও বাংলাদেশের জিডিপি বেড়েছে অবাক করা সংখ্যায়। এই অর্জনের ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে আসে নি। এর স্বীকৃতি এসেছে আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই। এবার ভাবতে হবে সীমিত আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন নিয়ে। দেশের অর্থনীতি যেভাবে এগোচ্ছে, সর্বশ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মানও সেভাবে বাড়াতে হবে।
তবে তাঁরা বলেন, জিডিপির অর্জন নিয়ে প্রতিবছরই বিতর্ক হয়। এই বিতর্কের অবসান হওয়া দরকার। পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ অর্থনীতির নীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রেই সমস্যা বেশি হয়। জিডিপি বা প্রবৃদ্ধিই যে উন্নতির একমাত্র লক্ষণ নয়, তা ষাটের দশকেই প্রমাণ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে সীমিত আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসছেও না। যে মাথাপিছু আয় চোখে দেখা যায় না, অনুভবও করা যায়, সেই প্রবৃদ্ধি দিয়ে কী হবে–সেটাই বড় প্রশ্ন। সন্দেহ নেই দেশের অর্থনীতি এগোচ্ছে। তবে ঠিক কতটা, তার প্রকৃত চিত্রটা জানা জরুরি।
ড. নারায়ন বৈদ্য এক লেখায় বলেছিলেন, মাথাপিছু আয় শব্দটি মোট জনসংখ্যার সাথে সম্পর্কিত। নির্দিষ্ট সময়ের মোট উৎপাদনের পরিমাণকে আর্থিকভাবে প্রকাশ করা হলে এ সময়ের মোট আয় পাওয়া যায়। এখানে উৎপাদন বলতে পণ্য ও সেবার উৎপাদনকে বুঝানো হয়। আবার মোট জাতীয় আয়ের পরিমাণকে মোট জনসংখ্যা দ্বারা ভাগ করা হলে নির্দিষ্ট সময়ের একটি অর্থনীতির মাথাপিছু জাতীয় আয় পাওয়া যায়। প্রত্যেক দেশের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি করা। এ কারণে প্রত্যেক দেশ নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ও সেবার উৎপাদনকে বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করে। এর ফলে অর্থনীতি দুইভাবে লাভবান হয়। প্রথমত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য শিল্প কারখানা স্থাপনের ফলে বস্তগত পণ্যের উৎপাদন বাড়ে এবং একই সাথে কর্মসংস্থানের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। আবার সেবা খাতে যদি প্রকল্প হাতে নেয়া হয় তবে সেবা খাতের উৎপাদন বাড়ে এবং সে ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।






