চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমির উপর চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) গ্রাউন্ডব্রেকিং বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে গত সোমবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে বিনিয়োগই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগ–প্রথমত বিনিয়োগ, দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ এবং তৃতীয়তও বিনিয়োগ। কারণ, বিনিয়োগই দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রধান চালিকাশক্তি হবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শুধু একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজের সূচনা নয়, বরং বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ও অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ দূর করছে এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের (ডিরেগুলেশন) মাধ্যমে ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু করেছে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশ এখন ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন–সব সময় ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু বিনিয়োগ নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে তিনি চীনের রাষ্ট্রদূতের প্রতি আনোয়ারা বা চট্টগ্রামে একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি তৈরি পোশাকের বাইরে সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি চীনের সরকার ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কৌশলগত শিল্পে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোরও আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চট্টগ্রামের চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন চীন–বাংলাদেশ সহযোগিতার অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। ২০১৪ সালে আলোচনা শুরু, ২০১৬ সালে চুক্তি স্বাক্ষর, ২০২২ সালে সমঝোতা স্মারক এবং এবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এক দশকেরও বেশি সময়ের প্রচেষ্টা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সহজ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বিনিয়োগের পূর্বশর্তই হলো নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ। এ লক্ষ্যেই সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ভিত্তি হলো শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা। বিনিয়োগকারীরা সবসময় তাদের পুঁজি নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশে বিনিয়োগ করতে চান। জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্য শঙ্কা থাকলেও বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বিদেশি বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে একটি দেশ রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। দেশের বাইরের কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি যখন আমাদের দেশে অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে, তখন আমাদের দেশের অর্থনীতি আরও সচল হয়ে ওঠে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন হয়, বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশীয় কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতেও সহায়তা করে থাকে। এতে অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন খাতের অবকাঠামো উন্নয়নেও বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে ও দ্রুত সময়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন তার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তারা যাতে ব্যবসায়িক লভ্যাংশ সহজ প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারেন তার জন্য ডিজিটাল সেবা চালু রাখতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের বিনিয়োগ করা কোনো প্রতিষ্ঠানে সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে তা দ্রুততার সঙ্গে সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকার বড় কোনো সংস্কার করতে পারেনি। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নতি না হওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে চলমান ব্যবসা–বাণিজ্যে গতি নেই। সে জন্য দেশে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আনোয়ারার এ শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ–চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিদেশী বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।







