মানুষের যে গুণটি সবার আগে থাকা উচিত সেটি হচ্ছে মানবিকতা। মানুষকে মানুষ বলা হয় কারণ তার মধ্যে মানবিকতা আছে, বোধ–বিবেক আছে, হিতাহিত জ্ঞান আছে, ভালো–মন্দ যাচাই করার সক্ষমতা আছে যা অন্য কোনো প্রাণী বা জীবের মধ্যে থাকে না। আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যম থেকে পাচ্ছি অসংখ্য অমানবিক সংবাদ। কখনো নির্মমভাবে পিটিয়ে শিশুহত্যা, কখনো শিশু ধর্ষণ, কখনো ধর্ষণের পর হত্যা নয়তো বা কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করার খবর।
সামাজিক জীবনে শিশুরা বড়ো অবহেলিত। অবহেলিত সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা, বেড়ে ওঠার নিরাপদ পরিবেশের ক্ষেত্রে। সে শারীরিকভাবে দুর্বল। তাই তার প্রতিবাদ চলে না। সে খুন হয়। খুনের বিচার হয় না।
লেখক এমিলি মজুমদার তাঁর এক লেখায় লিখেছিলেন, ‘কয়েক দিন আগে একটি ভিডিও দেখলাম। একটি জীবিত কুকুরের শরীরের সাথে ভারী বস্তা বেঁধে তাকে ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হলো। যারা কাজটি করছিল, তারা হাসছিল, উল্লাস করছিল। কিছুদিন আগে দেখেছি কয়েকটি কুকুরের বাচ্চাকে বস্তাবন্দি করে পুকুরে চুবিয়ে মারা হয়েছে। দৃশ্যটি শুধু একটি প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতার নয়, আমাদের সমাজের মানসিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি। আজ রাস্তায় একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হলেও সাহায্যের হাত বাড়ানোর বদলে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতেই মানুষ বেশি ব্যস্ত থাকে। এসব দেখে বারবার মনে প্রশ্ন জাগে আমাদের মানবিকতা কোথায় হারিয়ে গেল? মাঝেমধ্যে আমি নিজের ছোটবেলার কথা ভাবি। আমাদের কি আলাদা করে মানবিকতার কোনো পাঠ ছিল? মনে হয়, ছিল না। অথচ আমাদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপেই অজান্তে সেই শিক্ষাগুলো আমাদের ভেতরে গড়ে উঠেছিল।’
আর যখনই এ ধরনের খবরগুলো শুনতে হয় তখনই মনে হয় আমরা বোধ হয় সভ্যজগত থেকে আজ অনেক দূরে। সভ্যতার আলো বোধহয় আমাদের স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আজ বিবেকহীন হয়ে গেছি! আমাদের মাঝে মানবতা নেই বললেই চলে!
বার্নার্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘আমাদের ধর্ম হোক ভালোবাসা আর জাত হোক শুধু মানবতা। তবেই আমরা জয়ী হবো।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব, তাহাকে আর কোনো নাম দেবার দরকার পড়েনা।’ তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘মনুষ্যত্বের মূলে আর একটি প্রকাণ্ড দ্বন্দ্ব আছে ; তাকে বলা যেতে পারে প্রকৃতি এবং আত্মার দ্বন্দ্ব। স্বার্থের দিক এবং পরমার্থের দিক, বন্ধনের দিক এবং মুক্তির দিক, সীমার দিক এবং অনন্তের দিক–এই দুইকে মিলিয়ে চলতে হবে মানুষকে।’
আজ এই লেখায় একজন মানবিক চিকিৎসকের কথা বলতে চাই। তিনি হলেন অধ্যাপক ডা. শিব শংকর সাহা, আমাদের এই নগরীর একজন প্রখ্যাত জেনারেল, কোলোরেক্টাল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন। অনেকবার তাঁর চেম্বারে যেতে হয়েছে আমাকে। আমি, আমার পরিবার ও আত্মীয়–স্বজনের অনেকেই তাঁর চিকিৎসাসেবা পেয়েছি সনিষ্ঠ আন্তরিকতায়। এতোটা হৃদয়বান ও দায়িত্বশীল, তাতে আমি অভিভূত। কিন্তু নিজেকে তিনি জনপ্রিয় সার্জন মনে করেন না। আয়েশা হক শিমু সম্পাদিত ‘নন্দনশৈলী’তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, আমি আমার নাতিদীর্ঘ চাকুরি জীবনে যতবার বদলির কবলে পড়েছি তার জন্যই আমি জনপ্রিয় সার্জন হতে পারিনি। কথাটা বিশ্লেষণ করে বলতে গেলে যা দাঁড়ায়, আমার আঠারো বছর সরকারি চাকুরি জীবনে আমাকে বারো বার বদলি করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সব মেডিকেলে আমাকে বদলি করা হয়। তবে আমি চিকিৎসক হিসেবে কোনো বিষয়ে আপস করিনি। পরে সব ভেবেই শেষ পর্যন্ত আমি মাঝপথে চাকুরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছি।
ডা. শিব শংকর সাহা, যাঁর নামডাক আছে এ শহরে। তবে শৈশবে তিনি চিকিৎসক হতে চাননি। বড় ভাইদের মতো তাঁরও লক্ষ্য ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। কিন্তু সবারই অজান্তে জীবন অন্য দিকে বাঁক নিলো। তাঁর এক ভাই ইঞ্জিনিয়ার গ্রাম বিদ্যুতায়ন বোর্ডে কাজ করতেন রংপুরে। তিনি যখন নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করলেন, তখন তাঁর রংপুরে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার বড় ভাই তাঁকে রংপুরে নিয়ে যান এবং সেখানেই তাকে লেখাপড়া করতে বলেন। তিনি সেখানে গিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে যথারীতি উত্তীর্ণ হন। তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছে থাকলেও সে দাদাই তাকে মেডিকেলে পড়তে পরামর্শ ও উৎসাহ যোগান। অবশেষে তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং এমবিবিএস পাস করেন। তাঁর মেজভাই ও সেজ ভাই দুজনকেই তিনি মেন্টর মানেন যারা দুজনই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। প্রথম মেন্টর মেজভাই হলেও পরে তিনি সেজ ভাইকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চান। আদর্শ হিসেবে মেজ ভাইকে মানলেও তাঁর মতে সেজ ভাইয়ের অবদান সংসারে তুলনামূলক বেশি ছিল। তাঁর সেজ ভাই আবার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁর নাম শান্তিময় সাহা।
ডা. শিব শংকর বলেন, ডাক্তারি পেশা যেখানেই হোক সরকারি– বেসরকারি যে অবস্থায় হোক না কেন ডাক্তারদের সৎ হতে হবে। একজন রোগীকে সুস্থ করার জন্য যা যা করণীয় তাই তাকে করতে হবে। আর একটা বিষয় হলো, যেটা তার হাতের বাইরে তা যেন দ্রুত ছেড়ে দেন কালক্ষেপণ না করেন। সার্জারি বিষয়ে বলতে গেলে জীবনে আমি মাথার, হাড়ের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অপারেশন করা শিখেছি। তাই বলে আমি কখনো কোনো রোগীর মাথার অপারেশন করিনি। সার্জারির সময় হয়তো তাদের সাথে থেকে সহযোগিতা করেছি। তবে নিজে ডাক্তার সেজে মাথার বা হাড়ের অপারেশন করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি এখন যেহেতু শরীরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের বিশেষায়িত ডাক্তার আছে, সেহেতু যে যেই বিষয়ে সমধিক অভিজ্ঞ তার সে বিষয়ে অপারেশন করা উচিৎ।
তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু জানার আছে, শেখারও আছে অনেক কিছু। নিতে হবে মানবিকতার পাঠও। আমাদের সবকিছু দরকার। শিক্ষা, সংস্কৃতি যেমন দরকার, তেমনি দরকার মানবিকতার পাঠ। আদর্শ মানুষ হতে পারে চিরায়ত সংস্কৃতি বিকাশের বাহন, হতে পারে মানবতার পাঠশালা। বিজ্ঞান, চিকিৎসার পাশাপাশি শুদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ যেমন জরুরি, আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এক মনীষী বলেছেন, ‘ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধকে পরিশুদ্ধ করার নিমিত্তে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সর্বার্থে মানুষ হওয়ার জন্য তাদের সামনে আদর্শ থাকা জরুরি।’ আমরা অন্ধ বিবেকের বদ্ধ ঘরে থাকতে চাই না। আমাদের সমাজ, আমাদের দেশকে সুন্দরভাবে সাজাতে চাই। মানবিক আলোয় ভরে তুলতে চাই আমাদের সমাজ। সত্য, সুন্দর ও স্বচ্ছতায় জাগিয়ে তুলতে হবে বিবেক। সবার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা মানবিকতা এবং মনুষ্যত্ব জাগ্রত হোক।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;
ফেলো, বাংলা একাডেমি।












