আধুনিকতার আড়ালে নানা বীভৎসতা ও সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ

আমাদের চারিদিকে যে অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে, তার মূলে রয়েছে দারিদ্র্য। দেশের বিনিয়োগে খরা এবং অর্থনীতির গতিশীলতা দারিদ্র্যের বিস্তার ঘটাচ্ছে। আর এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। দেশের হানাহানির সংস্কৃতি বলি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি বলি, মব কালাচার বলিএ সবকিছুই আসছে দারিদ্র্য থেকে। যদি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার না বাড়ে এবং সঠিক মাত্রায় কর্মসংস্থান না হয় সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়বেই। যেভাবে দিন দিন দারিদ্র লোকের সংখ্যা বাড়ছে। তাতে শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজে এটা একটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে। সরকার তার মত করেই নিজস্ব গতিতেই চলছে। কিছু কিছু কাজ সরকারকে খুব দ্রুত করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিক যে কাজগুলো রয়েছে সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই দ্রুত করতে হবে অগ্রাধিকারের কাজগুলো। সরকার এগিয়ে নিলে জাতি একটা আশার আলো দেখতে পাবে। পুরো দেশ একটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তেমন কোনো চমকপ্রদ সংবাদ আমরা পাচ্ছি না। সবকিছুতেই কেমন যেন একটা ম্লান অবস্থা বিরাজ করছে।

আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মিলছে না সাধারণ মানুষের। নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামহীন দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসা, পরিবহন ও শিক্ষা ব্যয়। সংসারের খরচ সামলাতে একের পর এক প্রয়োজনীয় ব্যয় ছাটাই করছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে মাছমাংস। কমছে ফলমূল কেনা। ফলে পুষ্টির চাহিদার চেয়ে পেট ভরা মেটানোই যেন হয়ে উঠছে বড় চিন্তা। পাশাপাশি বিনোদনেও লাগাম টানতে হচ্ছে। পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোও অনেকের কাছে এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খরচ কমাতে উৎসব ভিত্তিক হয়েছে জামাজুতা কেনা। জরুরি নয় এমন সব কেনাকেটা বন্ধ করেও মাস শেষে হিসাব মেলাতে পারছে না অনেকে। বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে ধার দেনা।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম নগরী এটি দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নগরীর নাগরিক জীবনের অন্যতম বড় দুভোর্গ হয়ে আসছে যানজট। কর্মব্যস্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের স্থবিরতা, অপর্যাপ্ত পার্কিং, ফুটপাত দখল। অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং নকশাবাহির্ভূত স্থাপনা। আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিত অসংখ্য হাসপাতাল ও স্কুল স্থাপন করে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আবাসিক এলাকায় স্থাপিত স্কুল ও হাসপাতালের কারণে অবৈধ পার্কিং ও যানজট প্রকটাকার ধারণ করেছে সাথে সাথে বিকট শব্দের হরণ ব্যবহারের কারণে নাগরিক জীবন শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের কিছু উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এর ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হয়নি। আবাসিক এলাকায় স্থাপিত স্কুল সমূহ যানজট নিরসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। হাসপাতাল সমূহেও কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। সিডিএ চেয়ারম্যানের বাস্তবভিত্তিক কার্যকরী পদক্ষেপে যারা আশাবাদি হয়ে উঠেছিল তাদের মাঝেও হতাশার সূর লক্ষ্য করছি। তাদের ভাষায়, যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ! সুতরাং চট্টগ্রামের আবাসিক এলাকা সমূহে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা স্কুল, হাসপাতালগুলোকে আইনের আওতায় এনে আবাসিক এলাকা ও শহরকে যানজট ও শব্দ দূষণ হতে মুক্ত করা সময়ের দাবি।

ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই মনে হয়, সময়ের কাঁটা বুঝি হঠাৎ করে উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। পরিচিত মুখগুলো কোথায় যেন বদলে যাচ্ছে। কেউ হয়ে উঠেছেন আশির দশকের সিনেমার নায়ক, কেউ নায়িকা, কারো পরনে চওড়া কলারের শার্ট, চোখে কালো চশমা, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি; কেউবা শাড়ির আঁচল, বড় টিপ, ফুলেল সাজ আর পুরনো দিনের কোমল আলোয় দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিগুলো দেখে মনে হয়, কোনো পুরনো সিনেমার পোস্টার কিংবা ফটো স্টুডিওর এ্যালবাম থেকে উঠে এসেছে আমাদেরই পরিচিত মানুষ। অথচ ছবিগুলো পুরনো নয়। পুরানো হয়ে উঠছে শুধু তাদের আবহ। আর সেই আবহ তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমতা এআই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আশির দশকই কেন? দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে আশির দশকের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। বাংলাদেশে আশির দশক শুধু একটি সময়ের নাম নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির নাম। আমার যারা সে সময়ে বেড়ে উঠেছি তাদের কাছে এই দশক মানে বিটিভির অনুষ্ঠান, ক্যাসেটের গান, সিনেমার পোস্টার, পাড়ার ফটোস্টুডিও সাদাকালো বা রঙিন টেলিভিশন আর ঈদের সিনেমা নিয়ে উত্তেজনা, শহরের দেয়ালে দেয়ালে সিনেমার পোস্টার, দোকানে দোকানে গান বাজছে, আর তরুণদের চুলের কাটিং ও পোষাকে চলচ্চিত্রের নায়কদের প্রভাব এসবই ছিল আশির দশকে আমাদের দেখা জনজীবনের পরিচিত দৃশ্য।

আমরা এআইএর আয়নায় নিজেদের মুখ বদলাই, পোশাক বদলাই, সময় বদলাই। কিন্তু সেই বদলে যাওয়া ছবির ভেতরেও খুঁজে ফিরি পরিচিত কিছু পুরনো সিনেমায় আবহ, পরিবারের অ্যালবামের উষ্ণতা, হারিয়ে যাওয়া দিনের সৌন্দর্য কিংবা নিজের জীবনের কোনো এক অনুচ্চারিত স্মৃতি।

আশির দশকের নায়কনায়িকা উন্মাদনা এটি এআইএর সৃষ্টি। কিন্তু সেই সব স্মৃতি ও ছবির প্রতি আমাদের যে টান সেটি মানুষের। আর হয়তো এ কারণেই আজকের এই রেট্রো ছবিগুলো এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর বৈজ্ঞানিক চিন্তা চেতনায় পৃথিবীর কৃত্রিমতার মাঝেও দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তারা একটু থামতে চায়, নিজের দিকে তাকাতে চায়, নিজের অতীতকে ফিরে পেতে চায়, তা তার স্মৃতির ভেতর দিয়ে নিজেকে নতুন করে চিনতে ও জানতে চায়। যে তরুণী প্রতিদিন আধুনিক পোশাকে চলাফেরা করছেন সে এক মুহূর্তেই হয়ে উঠতে পারছে পুরানো দিনের চলচ্চিত্রের নায়িকা। কোনো দম্পতি নিজের ছবিকে রূপ দিতে পারছেন সেকালের নায়কনায়িকার সিনেমার পোস্টারের মতো। কেউ আবার নিজের মাবাবার তরুণ বয়সের ছবির আবহ পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এখানে ছবিটি আর শুধু ছবি থাকছে না এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের কল্পিত আত্মজীবনীআমি যদি সেই সময়ে থাকতাম তাহলে কেমন হতো বা কেমন হতাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাংস্কৃতিতে এই প্রশ্নটি বেশ গুরুত্ব্বপূর্ণ।

আমরা সেখানে শুধু নিজেদের বাস্তব জীবনকে দেখাই না, বরং আমরা নিজেদের একটি কাঙ্ক্ষিত সংস্করণও দেখতে পাই। কখনো সুখী, কখনো সফল, কখনো রোমান্টিক, কখনো নস্টালজিক। এআই সেই আত্মপ্রদর্শনের ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি দেখছি আশির দশকে ফিরে যাওয়ায় এ কাল্পনিক প্রচেষ্টা নিজেদের সাথে এক প্রকার আত্মপ্রবঞ্চনার সামিল। আমরা বর্তমান হতে নিজেকে লুকোতে চাচ্ছি আমরা বর্তমানকে অস্বীকার করতে চাচ্ছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমানে আধুনিকতার আড়ালে সমাজের বীভৎসতা, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক এখন দানবিক। মানবিকতায় কোন সুকেসে তুলে রাখা মাটির পাত্র। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক এখন আমিত্বের ঘেরা আবেগ সঞ্চারী তরুণের মতো। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক এখন শুধু অভিনয় আর শুধু আত্মপ্রবঞ্চনা। আজ মানব জীবনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দাও ফিরে সেই অরণ্য, লও এ নগর, কবির এ কবিতায় ইট, ধোঁয়া, হর্নের শব্দ, হাসপাতালের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, ফ্লাইওভারের নিচে আটকে থাকা দুপুর। হর্নের বিকট শব্দে স্কুলে গেটের সামনে শিশুকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে ঘর্মাক্ত কলেবরে আধুনিক নগর সভ্যতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে মানুষ কল্পনায় আশির দশকে ফিরে কাল্পনিক রূপে কিছুটা হলেও নিজেকে স্বস্তি দিতে চায়। মানুষ ফিরে যেতে চায় কোলাহল মুক্ত শান্তিময় পরিবেশে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএআই যুগে স্ব-শিক্ষার জাগরণ: মুখস্থবিদ্যা থেকে বিশ্লেষণাত্মক মননের পথে
পরবর্তী নিবন্ধ‘আমাদের ধর্ম হোক ভালোবাসা আর জাত হোক শুধু মানবতা’