চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সদ্য নিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে অবরুদ্ধ দশা থেকে উদ্ধারের পর তাঁর দেওয়া বক্তব্য এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে চরম অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতে চুয়েট ক্যাম্পাসে আর না ফেরার’ শর্তেই উপাচার্যকে নিরাপদে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল; অন্যদিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উপাচার্য পদত্যাগ বা ক্যাম্পাসে না ফেরার বিষয়টি অসত্য দাবি করে সুস্থ হয়ে পুনরায় দায়িত্ব পালনে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের ফলে টানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়টির অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
গত সোমবার সকালে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে চুয়েটের প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকের তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন সদ্য নিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রথমে আল্টিমেটাম দেন পরে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাঁকে টানা ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পরদিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের উপস্থিতিতে জরুরি প্রবেশপথ দিয়ে তাঁকে বের করে পুলিশি পাহারায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে উপাচার্যের ক্যাম্পাস ত্যাগের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যন্ত্রকৌশল ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মহোদয় একটি শর্তেই অবরুদ্ধ থাকা নবনিযুক্ত ভিসিকে বের করে নিয়ে গেছেন। শর্তটি ছিল–তিনি ভিসি হিসেবে চুয়েট ক্যাম্পাসে আর কখনও ফিরে আসবেন না। সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত এই শাটডাউন অব্যাহত থাকবে।’ একই সুর ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহারিয়ার হিসামের গলায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘তিনি (উপাচার্য) চুয়েটের মাটিতে ভিসি পদে আর কখনও পা রাখতে পারবেন না। এর অন্যথা ঘটলে আমরা কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলনে যাব। শরীফুল স্যারের চলে যাওয়া আমাদের চূড়ান্ত বিজয় নয়, সায়েম স্যার পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’ এছাড়া তড়িৎ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলমও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের ঘোষিত শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গণমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করব না–এ রকম কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দিইনি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতেই আমি চট্টগ্রামে এসেছি, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে বা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আসিনি।’ সরকার তাঁকে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে উল্লেখ করে সুস্থ হয়ে দ্রুত ক্যাম্পাসে ফেরার কথা জানান তিনি।
উপাচার্যের সঙ্গে অবরুদ্ধ থাকা চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, উপাচার্য কোনো লিখিত মুচলেকা বা পদত্যাগপত্র দেননি। প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে বহাল আছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে চুয়েট শিক্ষক সমিতির জরুরি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে শিক্ষকরা জানান, তালা ভেঙে উপাচার্য কার্যালয়ে প্রবেশের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, যা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্রের নিরাপত্তাকে সংশয়ে ফেলেছে। আগের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত সর্বাত্মক অসহযোগ ও কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা দেন তারা।
টানা ২৩ দিন ধরে চলা ক্লাস–পরীক্ষা বর্জন, তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং সর্বাত্মক শাটডাউনে পুরো চুয়েট ক্যাম্পাস এখন স্থবির। এর মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি। অচলাবস্থা আর ছুটির টানে ব্যাগ হাতে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছাড়তে দেখা গেছে। উৎসবের আমেজের বদলে একরাশ হতাশা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে চুয়েট প্রাঙ্গণে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।












