‘অণুর দর্পণ’ রহস্যের সমাধান করে রসায়নে দুই বিজ্ঞানীর নোবেল

| বৃহস্পতিবার , ৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ

জীবদেহের অণুগুলো কেন একটি নির্দিষ্ট ‘দর্পণ প্রতিবিম্ব’ বা মিরর ইমেজ বেছে নেয়, শতাব্দীপ্রাচীন এই রহস্য সমাধানের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর রসায়নের নোবেল পাচ্ছেন দুই বিজ্ঞানী। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস গতকাল বুধবার এ পুরস্কারের জন্য ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগাঁ এবং জাপানি গবেষক কেনসো সোআইয়ের নাম ঘোষণা করে। নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, ‘অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিনথেসিসে নন–লিনিয়ার ইফেক্ট এবং অটোক্যাটালাইসিস’ আবিষ্কারের জন্য তাদের এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।

ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া অঁরি বি. কাগাঁ অধ্যাপনা করেন প্যারিস দক্ষিণ ইউনিভার্সিটিতে। আর জাপানের গবেষক কেনসো সোয়াই কাজ করেন টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্সে। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য বাবদ এক কোটি বিশ লাখ সুইডিশ ক্রাউন (১২ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি) ভাগ করে নেবেন তারা। নোবেল কমিটির রসায়ন পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান হাইনার লিংকে বলেন, এবারের পুরস্কার ‘ভিত্তিমূলক রসায়ন’ নিয়ে।

অ্যামিনো অ্যাসিডের মত কিছু অণুর দুটি রূপ রয়েছে, যেগুলো একে অপরের আয়নার প্রতিবিম্বের মত। মানুষের ডান ও বাম হাতের মত দেখতে হলেও এদের একটির ওপর আরেকটি হুবহু বসানো যায় না। এ ধরনের অণুকে ‘হোমোচিরাল’ বলা হয়। শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষার ‘একই’ ও ‘হাত’ থেকে। মজার ব্যাপার হল, জীবদেহে এর যেকোনো একটি রূপই কেবল বিদ্যমান থাকে। কোষের প্রোটিনে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো এর অন্যতম উদাহরণ। প্রকৃতিতে এর উল্টো প্রতিবিম্বটি খুব কমই পাওয়া যায়। খবর বিডিনিউজের।

জীবদেহে এই একমুখী রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে তৈরি হল, এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তা রসায়নবিদদের কাছে ছিল একটি রহস্য। সেই রহস্যের সমাধান করার পথ দেখিয়েছেন অঁরি কাগাঁ ও কেনসো সোয়াই। ল্যাবরেটরিতে রসায়নবিদরা যখনই এই অণুগুলো তৈরির চেষ্টা করতেন, টেস্টটিউবে সবসময় দুটি রূপই সমান অনুপাতে তৈরি হত। কিন্তু ওষুধ শিল্পের মত সংবেদনশীল ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা কেবল একটি রূপই তৈরি করতে চান। কারণ মানবদেহে ওষুধের কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে এর নির্দিষ্ট একটি প্রতিবিম্ব বা রূপই কেবল কাজ করতে পারে।

১৯৮৬ সালে অঁরি কাগাঁ রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের নতুন একটি উপায় আবিষ্কার করেন, যা দিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে একটি নির্দিষ্ট রূপের অণু তৈরি করা সম্ভব হয়। তার এই উদ্ভাবন ওষুধ, সুগন্ধি, স্বাদ তৈরির উপাদান এবং নতুন উপকরণ তৈরিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরের ধাপটি পার করেন জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। ১৯৯৫ সালে তার একটি গবেষণাপত্রে প্রথমবারের মত এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা তুলে ধরা হয়, যার হোমোচিরাল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অবশেষে ২০০৩ সালে তিনি পুরোপুরি সফল হন। তিনি এমন একটি বিক্রিয়া উপস্থাপন করেন যেখানে দুটি সম্ভাব্য প্রতিবিম্বের মধ্যে মাত্র একটিই তৈরি হয়েছিল।

নোবেল কমিটির ভাষ্য, জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছাড়া এর আগে এমন অসাধ্য কেউ সাধন করতে পারেননি। সোয়াইয়ের নামে পরিচিত এই বিক্রিয়াকে রসায়নের অন্যতম চমকপ্রদ পরীক্ষামূলক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গত বছর রসায়নে নোবেল পান সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন ও ওমর ইয়াগি। ধাতু ও জৈব অণু দিয়ে তৈরি কাঠামো, যাকে মেটাল–অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক বলা হয়, তা তৈরির জন্য তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। এসব আণবিক কাঠামো জলবায়ু পরিবর্তন ও সুপেয় পানির সংকটের মতো সমস্যা মোকাবিলায় কাজে লাগতে পারে।

বরাবরের মতই চিকিৎসা বিভাগের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সোমবার চলতি বছরের নোবেল মৌসুম শুরু হয়। মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বুধবার এল রসায়নের নোবেল। বৃহস্পতিবার আসবে সাহিত্যের নোবেল ঘোষণা। এরপর শুক্রবার শান্তি ও আগামী ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে এবারের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। আর ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেবেন সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ। দিনটি আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী। পুরস্কার বিতরণের পর স্টকহোম সিটি হলে আয়োজন করা হবে নৈশভোজের।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসড়কের কাজে বালুর বদলে মাটি, হাতেনাতে ধরলেন এমপি
পরবর্তী নিবন্ধদিল্লিতে ফের আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা