একটি সেতু শুধু নদীর দুই পাড়ের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে না; এটি একটি জনপদের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়ার মানুষের ভাগ্যে জোটেনি কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থা। নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অসমাপ্ত পিলারগুলো যেন দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, অবহেলা ও অপূর্ণ স্বপ্নের নীরব সাক্ষী।
২০০৬ সালের মে মাসে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে উজানটিয়া নদীর ওপর প্রায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল উজানটিয়া ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করিয়ারদিয়ার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন। সেতুর পিলার নির্মাণের কাজ শেষ হলেও পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ। এরপর একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন আর এগোয়নি। ফলে প্রায় দুই দশক ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেতুটি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেতু নির্মাণের জন্য আনা সিমেন্টের বস্তাগুলো দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থেকে জমাট বেঁধে পাথরের মতো হয়ে গেছে। নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য রাখা লোহার রডে ধরেছে মরিচা। অনেক নির্মাণসামগ্রীই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পিলারগুলোর বিভিন্ন অংশেও ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা যায়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
একসময় যেসব নির্মাণসামগ্রী দিয়ে একটি সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন দ্বীপের মানুষ, আজ সেগুলোই পড়ে আছে অবহেলা আর অযত্নের স্মারক হয়ে। নির্মাণসামগ্রীর এই অপচয় শুধু একটি প্রকল্পের স্থবিরতার চিত্রই তুলে ধরছে না, বরং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা মানুষের দুর্ভোগের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্যোগে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। তিনি প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় ১৮০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির কাজ পায় মেসার্স চকোরী কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে ২০০৭ সালে এক–এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে গেলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়।
অসমাপ্ত পিলারে ক্ষয়ের চিহ্ন দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় সেতুর নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর স্রোতে পিলারের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পিলারের লোহার রড কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। একসময় যে স্থানে পূর্ণাঙ্গ সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন দ্বীপবাসী, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে অবহেলা ও অযত্নের চিহ্ন বহনকারী কয়েকটি অসমাপ্ত পিলার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে শুরু হওয়া প্রকল্পটি পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তারা। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ নয়। জনগণের অর্থে শুরু হওয়া প্রকল্পের সুফল পাওয়ার অধিকার সাধারণ মানুষের। সরকার পরিবর্তন হলেও জনগণের প্রতি সেই দায়িত্ব বহাল থাকে।
নদী পারাপারে নৌকাই একমাত্র ভরসা : করিয়ারদিয়া নদীবেষ্টিত একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। দ্বীপটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। নদীর এক পাশে পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়ন, অন্যপাশে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ইউনিয়ন। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এখানকার মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা নৌকা। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে নদী পার হয়ে যাতায়াত করতে হয়। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই দুর্ভোগ আরও প্রকট। বর্ষা মৌসুম ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নদী উত্তাল থাকলে পারাপার নিয়ে তৈরি হয় বাড়তি অনিশ্চয়তা। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনেও অনেক সময় রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার প্রভাব পড়ছে এলাকার অর্থনীতিতেও। উজানটিয়া ও করিয়ারদিয়া অঞ্চলে উৎপাদিত লবণ, চিংড়ি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচ গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের। সেতুটি নির্মিত হলে এসব পণ্য সহজে বাজারজাত করা সম্ভব হতো। পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতো।
উজানটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও কঙবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মীর মোশাররফ হোসেন টিটু বলেন, সেতুটি নির্মাণের দাবিতে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিন এলাকা পরিদর্শন করে সেতু নির্মাণের আশ্বাসও দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রকল্পটির আর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। মোশাররফ হোসেন টিটুর মতে, সেতুটি নির্মিত হলে উপকূলীয় এই অবহেলিত অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসা–বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উজানটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন এমজারু বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটত। বিশেষ করে লবণ ও চিংড়ি পরিবহনে খরচ কমার পাশাপাশি ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসার ঘটত। অথচ একটি সেতুর প্রত্যাশায় গত দুই দশক ধরে অপেক্ষার প্রহর গুণছেন দ্বীপের মানুষ।
পেকুয়া উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী রবিউল হোছাইন জানান, নতুন করে সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চকরিয়া–পেকুয়া–মাতামুহুরী আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম জানান, ২০০৬ সালে তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্যোগে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেতুটি। এবার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।











