জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ড নিয়ে দিল্লিতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস দেওয়ার প্রসঙ্গকে হাস্যকর বলে বর্ণনা করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তার হস্তান্তর চাওয়ার কথা তুলে ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা হচ্ছেন পলাতক সন্ত্রাসী। এখানে কি শ্বশুরবাড়ি রংপুর বেড়াইতে আসবে যে– তারে পাসপোর্ট দেব, আর পাসপোর্ট দিয়ে আসবে? আমাদের অ্যাকটিভ এক্সট্রাডিশন ট্রিটি আছে টেররিস্টদেরকে ধরার, ক্রিমিনালকে ধরার। ঢাকা সফরে আসা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন। ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা দেওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসিনা পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেছেন কি না, এই প্রশ্ন করা হয়েছিল হুমায়ুন কবিরকে। উত্তরে তিনি বলেন, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠক থেকে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন তিনি। এ কারণে বিষয়টি এখনও তার জানা নেই। পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের বিষয়টাই হাস্যকর লাগল বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির। খবর বিডিনিউজের।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসী আর অপরাধীকে ধরতে পাসপোর্ট লাগে না, এটা হস্তান্তর হয়। তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আর আইনি প্রক্রিয়াগুলো বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং এখানে পাসপোর্ট দেওয়ার বা হস্তান্তরের প্রয়োজন নাই। তারা অপরাধী… একটা অপরাধী, স্বৈরাচার, একটা পালিয়ে যাওয়া টেররিস্ট; এখানে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে পালিয়ে গেছে, তাকে কি নরমাল কমার্শিয়াল ট্রাভেলার হিসেবে দেখব যে, পাসপোর্ট দেব আসেন, আসিয়া আপনার শ্বশুরবাড়ি রংপুর বেড়াইয়া যান?
ভারত যেন তাকে হস্তান্তর করে, সেই চাওয়ার কথা তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, তাকে তো হস্তান্তর চাই আমরা। তাকে হস্তান্তর করা হবে এবং সে একজন সন্ত্রাসী, একজন পলাতক অপরাধী। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে কার্যকর থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের প্রত্যর্পণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর করার বিষয়ে চীন সরকারের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, চীন–বাংলাদেশ–মিয়ানমার করিডোর হলে এখানে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন একটি সংযোগ চালু হবে। তো স্বাভাবিকভাবে আরও বেশি অর্থনৈতিক যোগাযোগ, আরও বেশি অর্থনৈতিক যাতায়াত, মানে পণ্য ও মানুষের বেশি পরিমাণের যাতায়াত। ওটা তো ভালো দিকে। আর সরকার তো ইতিবাচক। এটা ভালো দিকে যাবে।
যোগাযোগ ও অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়াতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সময় নতুন করে সামনে আনে বেইজিং। চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা নতুন কিছু নয়। এটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এর অধীন একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হল চীনের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত সংযোগ স্থাপন। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ–চীন–ভারত–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা বিসিআইএম নামে পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালের দিকে সেই উদ্যোগ আন্তঃসরকার স্বীকৃতিও পায়। কিন্তু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই নিয়ে ভারতের ভূ–রাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে পরবর্তীতে বিসিআইএম প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। মূলত এটিই এখন সম্ভাব্য ‘চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এই করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই সংযোগটি পরে সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কঙবাজার অঞ্চলের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে চীনের।
বলা হচ্ছে, এ করিডোর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে। সেইসঙ্গে যোগাযোগ ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠলে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। চীনের ভাষ্য, রাখাইনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে সেখানকার জাতিগত ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও কমে আসবে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই করিডোর প্রতিষ্ঠাকে মিলিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, এটা করার আগে, রোহিঙ্গা ইস্যু ইজ অ্যান ইম্পর্টেন্ট ইস্যু। তো ওই জায়গায় তো একটা স্থিতিশীলতার দরকার আছে। তো, আমরা আলাপ আলোচনা করব এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই ইনশাল্লাহ আমরা এটা সমাধান করতে যাব।
অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে ভূরাজনৈতিক কোনো শঙ্কা আছে কি–না, এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী উল্টো প্রশ্ন করেন, কার শঙ্কা? কী শঙ্কা? উন্নয়নে কোনো শঙ্কা থাকবে কেন? এটা তো উন্নয়নের করিডোর হবে, সেখানে শঙ্কা থাকবে কেন? মানে সবাই তো বেনিফিশিয়ারি হবে।










