২০২৬ সালের ১ নভেম্বর পূর্ণ হলো কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের জন্মশতবর্ষ। বাংলা কথাসাহিত্যে এমন লেখক খুব বেশি নেই, যাঁদের অল্পসংখ্যক রচনাই সাহিত্যিক পরিচয়কে স্থায়ী করে তুলেছে। আবু ইসহাক তাঁদের একজন। মাত্র তিনটি উপন্যাস ও দুটি গল্পগ্রন্থের লেখক তিনি। অথচ তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য–দীঘল বাড়ী পাঠকস্মৃতিতে এমন গভীর জায়গা করে নিয়েছে যে, সেই একটি বইয়ের খ্যাতির আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর অন্য সাহিত্যকর্ম। জন্মশতবর্ষের এই সময়ে তাই প্রশ্নটি নতুন করে তোলা প্রয়োজন–সূর্য–দীঘল বাড়ীর বাইরে আবু ইসহাককে আমরা কতখানি পড়েছি? পদ্মার পলিদ্বীপ, জাল কিংবা তাঁর ছোটগল্পগুলোকে পাশাপাশি না রাখলে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র কি পাওয়া সম্ভব?
১৯২৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন ফরিদপুর জেলার শিরঙ্গল গ্রামে আবু ইসহাকের জন্ম। কৈশোরেই তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়; কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত নবযুগ–এ ছাপা হয়েছিল ‘অভিশাপ’। তরুণ বয়সে তিনি সূর্য–দীঘল বাড়ী লেখা শেষ করেন ১৯৪৮ সালে, কিন্তু বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। লেখার সময় আর প্রকাশের সময়ের এই ব্যবধান তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি লক্ষণীয় ঘটনা। আরও লক্ষণীয়, ১৯৫৫ সালের পর দ্বিতীয় উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপ প্রকাশিত হতে সময় লাগে একত্রিশ বছর। মাঝখানে অবশ্য প্রকাশিত হয়েছে গল্পগ্রন্থ হারেম (১৯৬২) ও মহাপতঙ্গ (১৯৬৩)। এই বিরতিগুলোকে শুধু সৃষ্টিশীল নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; প্রকাশের সময়রেখা আর রচনার সময়রেখা তাঁর ক্ষেত্রে এক নয়।
সূর্য–দীঘল বাড়ী যে ঐতিহাসিক সময়কে ধারণ করে, তা ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কাল। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, সামপ্রদায়িক উত্তেজনা ও দেশভাগের অভিঘাত উপন্যাসটির পটভূমিতে উপস্থিত। কিন্তু লেখক বৃহৎ ঘটনাগুলোকে ইতিহাসের ঘোষণাপত্রের মতো সাজাননি। জয়গুনের জীবনসংগ্রাম, সন্তানদের ক্ষুধা, আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা এবং কুসংস্কারের চাপের মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে মানুষের ঘরে নামিয়ে এনেছেন। জয়গুন কোনো বিমূর্ত দারিদ্র্যের প্রতীক নন; তিনি একজন নারী, যাঁকে বাঁচার জন্য সামাজিক নিষেধের সঙ্গে লড়তে হয়। এইখানে আবু ইসহাকের বাস্তববোধের শক্তি। দুঃখকে কেবল করুণার বিষয় না করে তিনি তার পেছনের সামাজিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার বিন্যাস দেখান। তাঁর বর্ণনা অনেক সময় সংযত; ঘটনাই পাঠকের সামনে মানুষের অসহায়ত্ব ও প্রতিরোধের মাত্রা উন্মোচন করে।
কিন্তু সূর্য–দীঘল বাড়ীর সাফল্যই যেন পরবর্তী পাঠে এক ধরনের আড়াল তৈরি করেছে। পদ্মার পলিদ্বীপ–এ লেখক ফিরে এসেছেন ভূমিহীন ও প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামে, তবে এখানে পরিসর ও সংঘাতের ধরন আলাদা। নদীর পলি জমে চর জাগে, আবার নদী সেই ভূখণ্ড কেড়ে নেয়। ভূমির এই অনিশ্চিত অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বসতি, জীবিকা, মালিকানা ও ক্ষমতার প্রশ্ন। প্রকৃতি এখানে কেবল দৃশ্যপট নয়, মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণের সক্রিয় উপাদান। চর জেগে ওঠা মানেই নতুন সম্ভাবনা, কিন্তু সেই সম্ভাবনার ওপর কার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে–এই প্রশ্নেই শুরু হয় সংঘাত। জমি পাওয়া এবং জমি ধরে রাখার সংগ্রাম একই নয়; আবু ইসহাকের উপন্যাসে সেই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পদ্মার পলিদ্বীপ–এর রচনাকাল সম্পর্কেও একটি বিস্ময়কর তথ্য রয়েছে। লেখকের মুখবন্ধের সূত্রে জানা যায়, ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে উপন্যাসটি নির্মিত হয়েছে। প্রায় পঁচিশ বছরের এই পরিসরকে অবশ্য অবিরাম লেখালেখির সময় বলে ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু এটি স্পষ্ট যে বইটির প্রকাশের পেছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পুনর্বিবেচনার ইতিহাস রয়েছে। প্রথম উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করলে এখানে বিষয়গত ধারাবাহিকতার পাশাপাশি আখ্যানের বিস্তারও চোখে পড়ে। সূর্য–দীঘল বাড়ীতে ঘর ও পরিবারের টিকে থাকার লড়াই প্রবল; পদ্মার পলিদ্বীপ–এ ভূমি ও ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব জড়িয়ে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই লেখকের মনোযোগ প্রান্তিক মানুষের দিকে, কিন্তু তিনি একই কাহিনি পুনরাবৃত্তি করেননি।
আবু ইসহাকের আরেকটি কম আলোচিত পরিচয় পাওয়া যায় জাল–এ। এটি রহস্য বা গোয়েন্দা উপন্যাস। তাঁর অন্য দুই উপন্যাসের সামাজিক বাস্তববাদী পরিসর থেকে এর প্রকরণ আলাদা। মজার বিষয়, বইটি আশির দশকের শেষ দিকে প্রকাশিত হলেও এর পাণ্ডুলপি তৈরি হয়েছিল পঞ্চাশের দশকেই। সূর্য–দীঘল বাড়ীর প্রকাশক পেতে অসুবিধার সময়ে অপেক্ষাকৃত সহজে প্রকাশযোগ্য একটি গোয়েন্দা কাহিনি লেখার চিন্তা তাঁর মাথায় এসেছিল। পরে প্রথম উপন্যাসের স্বীকৃতি পাওয়ার পর জাল প্রকাশে তিনি দীর্ঘদিন দ্বিধা করেছিলেন–এমন বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর নিজের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে আলোচনায়। এই ঘটনা লেখকের সাহিত্যিক আত্মপরিচয় নিয়ে এক আকর্ষণীয় প্রশ্ন তোলে। গম্ভীর সামাজিক উপন্যাসের লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রহস্যকাহিনি প্রকাশ করতে দ্বিধা কেন? সাহিত্যিক মর্যাদা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা কি লেখকের নিজের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করেছিল? জাল–কে সূর্য–দীঘল বাড়ীর মানদণ্ডে বিচার করলে তাই তার স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যটি হারিয়ে যেতে পারে। গোয়েন্দা কাহিনির নিজস্ব শর্ত আছে–রহস্যের বিন্যাস, তথ্যের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ, অনুসন্ধানের গতি এবং পাঠকের প্রত্যাশা। আবু ইসহাক যে ভিন্ন ধরনের আখ্যানের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন, সেটিই তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে একমাত্রিক হতে দেয় না। একটি রচনার সাফল্য দিয়ে লেখকের অন্য সব প্রচেষ্টাকে পরিমাপ করার প্রবণতা এখানেও সংশোধন করা প্রয়োজন।
উপন্যাসের পাশাপাশি তাঁর ছোটগল্পও মনোযোগ দাবি করে। হারেম ও মহাপতঙ্গ গল্পগ্রন্থের বিভিন্ন রচনায় সমাজের বৈষম্য, শোষণ, নৈতিক ভন্ডামি ও মানুষের অসহায়তার চিত্র উঠে এসেছে। ‘জোঁক’–এর মতো গল্পের শিরোনামেই শোষণমূলক সম্পর্কের একটি তীক্ষ্ম প্রতীকী সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর গল্পের তাৎপর্য শুধু বিষয় নির্বাচনে নয়; সীমিত পরিসরে একটি সামাজিক পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত নিষ্ঠুরতা প্রকাশের চেষ্টাতেও। উপন্যাসে যে অভিজ্ঞতা বিস্তৃত পটভূমিতে বিকশিত হয়, গল্পে তাকে সংহত করতে হয় নির্বাচিত ঘটনা, চরিত্র ও ইঙ্গিতের সাহায্যে। আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক মূল্যায়নে এই ছোট পরিসরের রচনাগুলোকে বাদ দেওয়া যায় না।
তাঁর শিল্পসংযম বলতে কেবল কম বই লেখা বোঝানো উচিত নয়। সংযমের প্রশ্নটি তাঁর ভাষা ও আখ্যানের নির্মাণেও প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষের জীবনকে সাহিত্যিক বিষয় করে তুলতে গিয়ে তিনি তাঁদের অভিজ্ঞতাকে অলংকারের আড়ালে সরিয়ে দেন না। আবার নিছক সামাজিক সমস্যার বিবরণ দিয়েও থেমে থাকেন না। ব্যক্তি ও পরিবেশের সম্পর্ক, ক্ষুধা ও মর্যাদার সংঘাত, জমি ও জীবিকার অনিশ্চয়তা–এসবের মধ্য দিয়ে চরিত্রের নিয়তি গড়ে ওঠে। এই শিল্পরীতির শক্তি বিচার করতে হলে তাঁর রচনার ঘটনাবলি যেমন দেখতে হবে, তেমনি দেখতে হবে কোন ঘটনা তিনি নির্বাচন করছেন, কোথায় বর্ণনাকে থামাচ্ছেন এবং কীভাবে পাঠককে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জায়গা দিচ্ছেন।
আবু ইসহাকের সাহিত্যিক শ্রম কথাসাহিত্যের বাইরেও বিস্তৃত। সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান প্রণয়নের কাজ তাঁর শব্দ ও ভাষা নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরিচয় দেয়। স্মৃতিবিচিত্রা–র মতো স্মৃতিমূলক রচনাও রয়েছে তাঁর গ্রন্থতালিকায়। ফলে তাঁকে শুধু তিন উপন্যাসের লেখক বললে প্রকাশিত কথাসাহিত্যের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তাঁর সমগ্র্র বৌদ্ধিক শ্রমের পরিচয় পাওয়া যায় না। একজন কথাসাহিত্যিকের ভাষাসচেতনতা এবং অভিধানপ্রণেতার শব্দ–অনুসন্ধানকে পাশাপাশি রেখে পড়ার সুযোগও এখানে রয়েছে।
আবু ইসহাকের জন্মশতবর্ষে তাই সবচেয়ে জরুরি কাজ শুধু সূর্য–দীঘল বাড়ীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুনরুচ্চারণ নয়। সেই উপন্যাসের বাইরে গিয়ে তাঁর অন্য রচনাগুলো পাঠ করা, তাদের শিল্পগত সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা বিচার করা এবং প্রকাশের দীর্ঘ ব্যবধানের পেছনের সাহিত্যিক ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। তাঁর গুরুত্ব এই যে, সীমিত সংখ্যক রচনার মধ্য দিয়ে তিনি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে মানুষের অস্তিত ্বসংকট, সামাজিক ক্ষমতা ও জীবনের অনিশ্চয়তাকে ধরতে চেয়েছেন। সাহিত্যিক উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত বইয়ের সংখ্যা দিয়ে নয়, সেই বইগুলো নতুন পাঠের কতখানি সম্ভাবনা ধরে রাখে, তা দিয়েই বিচার্য। আবু ইসহাকের রচনাগুলো আজও সেই পুনর্পাঠের দাবি জানায়।











