কেন বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ : চট্টগ্রামের বাস্তবতায় গবেষণার ঘাটতি ও করণীয়

ডা. আবুল ফয়সাল মো. নুরুদ্দিন চৌধুরী | বুধবার , ৪ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের একটি রোগ নয়, এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নগর ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার সক্ষমতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ে, প্রাণহানিও ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো–বছরের পর বছর একই সংকট ফিরে আসার পরও আমরা কেন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতে পারছি না?

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু : স্থানীয় বাস্তবতা বুঝতে হবে

চট্টগ্রামের জনঘনত্ব, নির্মাণকাজ, বৃষ্টিপাত, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তুলতে পারে। ডেঙ্গু এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় শুধু জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান নয়, এলাকাভিত্তিক তথ্যও জরুরি। কোন ওয়ার্ডে সংক্রমণ বেশি, কোথায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন এবং কোথায় গুরুতর রোগী ও মৃত্যুর হার বেশি–এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর স্থানীয় পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন। চট্টগ্রামের জন্য তাই রোগীর তথ্য, মশার ঘনত্ব ও পরিবেশগত পরিস্থিতি সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু এবার খারাপ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ কী

ডেঙ্গুর বিস্তার বা তীব্রতা বৃদ্ধির পেছনে একটি মাত্র কারণকে দায়ী করা যায় না। বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবেশ ও জলবায়ু : বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন এডিস মশার প্রজননকে প্রভাবিত করে। ছাদের টব, পানির পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন ও জমে থাকা পানি মশার প্রজননস্থল হতে পারে।

ভৌগোলিক বিস্তার : নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ বাড়লে স্থানীয় হাসপাতাল, পরীক্ষাগার ও প্রশিক্ষিত জনবলের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ভাইরাসের ধরন ও পূর্ববর্তী সংক্রমণ : ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন রয়েছে। আগে এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য ধরনের ভাইরাসে সংক্রমিত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ২০২৬ সালে কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাসের ধরন সংক্রমণ বা মৃত্যুর জন্য বেশি দায়ী কি না, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা দরকার।

চিকিৎসা পেতে বিলম্ব : বিপদসংকেত শনাক্ত করতে দেরি, দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের অভাব গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস ও হাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

ডেঙ্গু গবেষণায় ঘাটতি কোথায় :

বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তবে রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার তুলনায় গবেষণার ধারাবাহিকতা, সমন্বয় এবং ফলাফল বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।

প্রথমত, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণ পুরোপুরি বোঝা যায় না। যাঁরা চিকিৎসাকেন্দ্রে আসেন না বা যাঁদের রোগ শনাক্ত হয় না, তাঁরা সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ভাইরাসের সেরোটাইপ ও জিনগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে নিয়মিত দেশব্যাপী নজরদারি জরুরি। কোন অঞ্চলে কোন ধরন ছড়াচ্ছে এবং তার সঙ্গে গুরুতর রোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা জানতে পরীক্ষাগার ও ক্লিনিক্যাল তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। তৃতীয়ত, আবহাওয়া, মশার ঘনত্ব, নগরায়ণ ও রোগীর তথ্য সমন্বয় করে আগাম সতর্কতাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডেঙ্গুতে প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করলে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব, অঙ্গের জটিলতা এবং প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, উন্নত পরীক্ষাগার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসায় মূলনীতি : রোগীকে দেখুন, শুধু প্লাটিলেট নয়

ডেঙ্গুতে প্লাটিলেটের সংখ্যা একমাত্র ঝুঁকি নির্ধারক নয়। রোগীর রক্তচাপ, নাড়ির চাপ, রক্তসঞ্চালন, প্রস্রাবের পরিমাণ, হেমাটোক্রিটের পরিবর্তন, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময় রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে। তাই বিপদসংকেত দেখা দিলে দ্রুত মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তরল ব্যবস্থাপনায়ও সতর্কতা জরুরি–অতিরিক্ত তরল যেমন ক্ষতিকর, তেমনি প্রয়োজনীয় তরল দিতে বিলম্ব করাও বিপজ্জনক।

এখন করণীয় কী?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিতে হবে :

১. রোগী, মশা ও পরিবেশের তথ্য সমন্বয় করে এলাকাভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা।

২. চট্টগ্রামসহ উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক সংক্রমণ মানচিত্র তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করা।

৩. ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা চিহ্নিত করা।

৪. শুধু কীটনাশক ছিটানো নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা।

৫. ডেঙ্গুর টিকা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার মূল্যায়ন জোরদার করা।

চট্টগ্রামের মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ, গবেষক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি ধারাবাহিক গবেষণা উদ্যোগ গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় সংক্রমণের কারণ শনাক্ত এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে।

উপসংহার : প্রতিক্রিয়া নয়, চাই আগাম প্রস্তুতি

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর একই ধরনের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণানির্ভর সিদ্ধান্ত, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা। আমাদের শুধু জানতে হবে না কতজন আক্রান্ত হলেন বা কতজন মারা গেলেন, জানতে হবে কেন সংক্রমণ বাড়ছে, কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন এবং কোন পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নয়–শুরু হয় বাড়ির আঙিনা, কর্মস্থল, নগর ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণাগারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু কতজন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হলো, তা নয়; বরং কতজনকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা গেল এবং কতটি মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হলো।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅন্য আলোয় রবীন্দ্রনাথ : ডা. মাহমুদ এ চৌধুরী আরজুর ‘কবিগুরুর স্বাস্থ্যচিন্তা ও অন্তিম দিনগুলি’
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ট্রেইলার ট্রান্সপোর্ট মার্চেন্ট গ্রুপের মতবিনিময় সভা