মূল্যস্ফীতি : দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির হাতিয়ার

ড. নারায়ন বৈদ্য | সোমবার , ২ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

‘মূল্যস্ফীতি’– শব্দটি অর্থনীতিতে বহুল আলোচিত একটি শব্দ। কারণ অর্থনীতির সব শাখাতে মূল্যস্ফীতি আঘাত করে। আবার মূল্যস্ফীতির নির্দিষ্ট একটি সংজ্ঞা রয়েছে। সাধারণত পণ্য ও সেবার মূল্য যদি ক্রমাগত স্তরে স্তরে বৃদ্ধি পায় তবে তাকে মূল্যস্ফীতি বলা যায়। দুই একটি পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেলে তাকে মূল্যস্ফীতি বলে না। পণ্য ও সেবার মূল্য ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেতে হবে তাই অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ‘Money Inflation is a General, Sustained Increase in the prices of goods and services over time, which causes each unit of currency to buy less than it did Before’ অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে পণ্য ও সেবার সাধারণ মূল্যস্তর ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সহজ কথায়, মূল্যস্ফীতি ঘটলে আগের চেয়ে একই পরিমাণ টাকা দিয়ে কম পণ্য বা সেবা পাওয়া যায়। অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়।

সাধারণত তিনটি কারণে একটি অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। যদি সরকার কর্তৃক তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতিরিক্ত অর্থের জোগান দিয়ে থাকে তবে পণ্য ও সেবার মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজ হয়। মনে করি একটি অর্থনীতিতে যে পরিমাণ সম্পদ আছে তার পরিমাণ ১০০ একক। সরকার এই ১০০ একক সম্পদ লেনদেন করার জন্য টাকা ছাপালো বা অর্থের জোগান দিল ৫০০ টাকা। অতএব প্রতি একক সম্পদের দাম হবে ৫০০ী১০০=৫ টাকা। এখন সরকার নিজের প্রয়োজনে অথবা অর্থনীতি প্রয়োজন মেটাতে পরবর্তী বৎসর আরো ৫০০ টাকা ছাপালো। তাহলে অর্থনীতিতে মোট অর্থের জোগান হলো ৫০০+৫০০=১০০০/- টাকা। কিন্তু সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি না পাওয়াতে এখন প্রতি একক সম্পদের দাম হবে ১০০০+১০০=১০ টাকা। অর্থাৎ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি না পেয়ে যদি সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থের জোগান বৃদ্ধি করে তবে সম্পদের মূল্য তথা পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পায়। ইহাই মূল্যস্ফীতি। আবার আর্থিক ক্রয় ক্ষমতা যদি বৃদ্ধি পায় তবে সামগ্রিক চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় পণ্য ও সেবার জোগান যদি অপরিবর্তীত থাকে সে ক্ষেত্রেও পণ্যমূল্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যায়। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পণ্য ও সেবার জোগানও বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি অবদমিত হয়। আবার কোনো কোনো সময় উপাদানের দাম অর্থাৎ কাঁচামালের দাম যদি বৃদ্ধি পায় তবে সে ক্ষেত্রেও পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। এ অবস্থায়ও মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। মূল্যস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্দিষ্ট আয়ের জনগণ, সঞ্চয়কারী ও পাওনাদার। আর লাভবান হয় ব্যবসায়ী, পরিবর্তনশীল আয়ের মানুষ ও ঋণদাতারা। মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে যে, এর ফলে অর্থের নিজস্ব মূল্য হ্রাস পায়।

মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের মধ্যে সম্পর্ক আছে। ক্রমাগত পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকলে অর্থনীতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কারণ পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধির সম অনুপাতে তাদের আয় বৃদ্ধি পায় না। ফলে দারিদ্র্য সীমার কাছাকাছি যে সব জনগোষ্ঠীর অবস্থান তারা দ্রুত দারিদ্র্য সীমার নীচে নেমে যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এরূপ অবস্থা দেখা যায়। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার ছিল ত্রিশ শতাংশ। এ বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী অতি দরিদ্রের আওতাভূক্ত ছিল। পরবর্তী দশকে তা হ্রাস পেয়ে বিশ শতাংশে নেমে এসেছিল। বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য এক সময় উন্নয়ন আলোচনার সবচেয়ে জোরালো উদাহরণগুলোর একটি ছিল। অনেক বছর ধরে দেখা গেছে প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয়, প্রবৃদ্ধি ইত্যাদির সাথে দারিদ্র্য হ্রাসের ইতিবাচক সম্পর্ক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্ক আর ইতিবাচক থাকছে না। ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী টানা চার বছর ধরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। অতি সাম্প্রতিক সময়ে অর্থাৎ ২০২৫ সালের শেষে দিকে প্রায় ৮০ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এর মতে, শুধুমাত্র ৮০ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়নি। একই সাথে প্রায় সোয়া ছয় কোটি মানুষ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেম এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানও একমত প্রকাশ করেছেন। গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লোকদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এনেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দরিদ্র পরিবারের প্রকৃত আয় দ্রুত ক্ষয় করছে। উচ্চ আয়ের পরিবার কিছু সঞ্চয় কমিয়ে বা খরচের ধরন বদলে মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে পারে। দরিদ্র পরিবারগুলো তা পারে না। তাদের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে কম খাবার, কম পুষ্টি, ছোট–খাট অসুখে ডাক্তারের কাছে না যাওয়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমানো এবং ঋণ পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া। এজন্য মূল্যস্ফীতি শুধুমাত্র সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা নয়। বরং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের সমস্যাও। তাছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে। সেখানে চাকুরির নিশ্চয়তা কম, সামাজিক বিমা নেই বললেই চলে। এই ক্ষেত্রে নামমাত্র মজুরি কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে এই জনগোষ্ঠীর বাস্তব আয় কমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। কাজেই পরিস্থিতিটা এরকম যে, পরিবারগুলোর নিকট একদিকে মূল্যস্ফীতি চাপ, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির সুযোগ আটকে গেছে। তাছাড়া শিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ ভালো কাজ পাচ্ছে না। নারীর কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি থমকে আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা জ্বালানী, চাহিদা হ্রাস ও বাজার অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে আছে। ফলে দারিদ্র্য থেকে সামান্য উপরে ওঠা পরিবারগুলো নিরাপদ অবস্থায় থাকতে পারছে না। দরিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। হঠাৎ অসুস্থতা, চাকুরি হারানো, বন্যা বা খরায় ফসলহানি, খাদ্য দামের উচ্চলম্ফ গাড়ীভাড়া বেড়ে যাওয়া, শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়া, এসব কিছু একটা পরিবারের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে যদি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে হিসাব করা না হয় তবে দারিদ্র্য হ্রাসের পূর্বের অর্জনও টেকসই থাকবে না।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এরূপ যে, ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ব্যর্থতার ব্যয় অনেক সময় রাষ্ট্র বহন করে। কিন্তু একজন শ্রমিক চাকুরি হারালে বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুঁজি হারালে তার জন্য কোনো শক্তিশালী সুরক্ষা নেই। ব্যক্তি নিজকে তা বহন করতে হয়। অর্থাৎ শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইত্যাদি জনগোষ্ঠীকে যে কোনো ব্যর্থতার দায় নিজে বহন করতে হয়। এরূপ রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে সম্পদ ও সুযোগ ধীরে ধীরে ধনী জনগোষ্ঠীর দিকে সরে যায়। আর দরিদ্র ও দুর্বল পরিবারগুলো আরো দুর্বল ও অনিরাপদ হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোটি বড়ই আশ্চর্য। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সেই বাড়তি খরচ খুব দ্রুত নিচের দিকে চাপিয়ে দেয়া হয়। ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর ওপর দ্রুত এর প্রভাব পড়ে। আর এ অবস্থায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরো দরিদ্র হয়ে যায়। আর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলে এর সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোক্তার কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না। ফলে ধনীরা আরো ধনী হয়। এভাবে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ে। কর ব্যবস্থায়ও রয়েছে বিশাল বৈষম্য। বাংলাদেশের বাজেটে দেখা যায়, পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। কিন্তু পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর তুলনামূলক বেশি বোঝা চাপায়। অপরপক্ষে উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠী থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব পুরোপুরি আদায় হয় না। কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা রাজস্ব সক্ষমতা কমায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, নগর সেবা ইত্যাদিতে।

মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে দারিদ্র্যকে যেমন বৃদ্ধি করে তেমনি অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি করে। মূল্যস্ফীতির কারণে হোক অথবা অন্য কারণে হোক, ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে যাওয়া এবং সোয়া ছয় কোটি মানুষের ঝুঁকিতে থাকা কোনো ছোট বিচ্যুতি নয়। এটি উন্নয়ন কৌশলের একটি সতর্কবার্তা। উন্নয়নের সাফল্য তখনই অর্থবহ হয় যখন মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে। অতএব দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর জন্য যে কোনোভাবে মূল্যস্ফীতিকে নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভাষা সৃষ্টির রহস্য
পরবর্তী নিবন্ধরাউজানে বিদেশি পিস্তলসহ যুবক গ্রেপ্তার