হানিমুন ও সফর

রোকেয়া হক | সোমবার , ২ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

হানিমুন শব্দের বাংলা অর্থ মধুচন্দ্রিমা। বিবাহের পর নবদম্পতির একান্তে, নিবিড়ভাবে কিছুটা সময় কাটানোই হানিমুনের মূল উদ্দেশ্য। এ সময় তাঁরা দেশের কোনো সুন্দর স্থানে পাহাড়ের রিসোর্টে, সমুদ্রের কিনারায় কিংবা প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে বেড়াতে যান। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তাঁরা দেশের বাইরে বিভিন্ন রোমান্টিক জায়গায় ভ্রমণ করেন। যেমন ব্যাংকক, সুইজারল্যান্ড, ভারতের তাজমহল, নেপাল কিংবা কাশ্মীর। এসব স্থানে তাঁরা মধুচন্দ্রিমার আনন্দ উপভোগ করেন।

আবার যাঁরা ভালোবেসে বিয়ে করেন কিংবা অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন, তাঁদের কারও কারও আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা বা অঙ্গীকার থাকে। বিয়ে সফল হলে তাঁরা সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরানের (রহ.) মাজার জিয়ারত করতে যাবেন। কেউ কেউ এ রকম আরও অনেক পবিত্র স্থানেও ভ্রমণ করেন।

কিন্তু বর্তমানে নবদম্পতিদের মধ্যে একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিষয়টি পারিবারিক প্রেরণার কারণে হোক কিংবা ধর্মীয় অনুরাগের কারণেই হোক, যাঁদের পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ রয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ হানিমুনের গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নিচ্ছেন। ওমরাহ পালনের নিয়ত নিয়ে তাঁরা মক্কা–মদিনায় যাচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো, হানিমুনের উদ্দেশ্যে এভাবে পবিত্র স্থানকে বেছে নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত? মক্কা ও মদিনা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান। অতীতে মানুষ অনেক কষ্ট করে জাহাজে চড়ে হজ পালন করতে যেতেন। আমার দাদাকে এভাবে তিনবার হজ পালন করতে যেতে দেখেছি। হজ পালনের পর অনেকের জীবনযাপনে পরিবর্তন আসত। তাঁরা সংসারজীবনের নানা ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সরে এসে আল্লাহর ইবাদতে অধিক মনোযোগী হতেন।

পরবর্তীকালে উড়োজাহাজের যাত্রা সহজলভ্য হলে হজযাত্রীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। তবে হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন, দোয়া–দরুদ এবং ধর্মীয় বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ। শিশু থেকে শুরু করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যও এখন এসব পবিত্র স্থানে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু যাঁরা ধর্মীয় বিধিবিধান সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না, তাঁদের উচিত সফরের আগে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

বর্তমানে মক্কা–মদিনায় বহুতল ভবন, আধুনিক হোটেল ও বিলাসবহুল আবাসনের বিস্তার লক্ষণীয়। সেসব স্থাপনার জৌলুশ দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এত আরাম–আয়েশের মধ্যে থেকে একজন মানুষ কতটা একনিষ্ঠভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারেন? হোটেলের উঁচু ভবন, বারান্দা থেকে দেখা শহরের দৃশ্য কিংবা রঙিন ফোয়ারার সৌন্দর্য মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতেই পারে। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর স্মরণে মনকে নিবিষ্ট রাখাই তো ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য।

পাহাড়–পর্বতবেষ্টিত মক্কা ও মদিনা মুসলমানদের ধর্মীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গভীর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসব পবিত্র স্থানে এসেছেন ইবাদত করতে, আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে এবং অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করতে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, কেউ কেউ পুণ্য অর্জনের আশায় পবিত্র স্থানে গেলেও দেশে ফিরে আবার পুরোনো অনৈতিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ধর্মীয় সফর তাঁদের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে না।

হ্যাঁ, এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। সদ্যবিবাহিত দম্পতিরা হানিমুনের গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবকে কেন বেছে নিলেন? তাঁরা কি আগে থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে বিয়ে হলে ওমরাহ পালনের জন্য পবিত্র মক্কায় যাবেন? যদি তা–ই হয়ে থাকে, তাহলে বিয়ের কয়েক বছর পরও তো তাঁরা ওমরাহ পালন করতে যেতে পারতেন। তাঁদের পরিবার কি সবাই এ সিদ্ধান্তে উৎসাহ জুগিয়েছেন? পারিবারিকভাবেই কি তাঁদের হানিমুনের গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল?

যদি তা–ই হয়ে থাকে, তাহলে নবদম্পতি একবারও কি ভেবে দেখেননি যে তাঁদের দুজনের ভালোবাসা ও ভালো লাগার সম্পর্কটি তখনই পূর্ণতা পেতে শুরু করবে, যখন তাঁরা পরস্পরকে আরও নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ পাবেন?

ভালোবাসা, ভালো লাগা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তখনই গভীর হয়, যখন দুজন মানুষ একে অপরের কাছাকাছি আসে, নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে, স্নেহ–ভালোবাসার স্পর্শে সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করে। ছোট ছোট দুষ্টুমি, গান, কবিতা, গল্প বলা, পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে জানা, তাঁদের পছন্দ–অপছন্দ নিয়ে আলোচনা করা এসবের মধ্য দিয়েই দাম্পত্যজীবনের ভিত গড়ে ওঠে। স্বামী–স্ত্রী পরস্পরের পছন্দ–অপছন্দ, আশা–আকাঙ্‌ক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলার জন্য পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে কিছুটা একান্ত সময় কাটাতে চান। হানিমুনের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো এই সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করা এবং নতুন জীবনের সূচনাকে স্মরণীয় করে রাখা।

অন্যদিকে, হজ ও ওমরাহর মতো ধর্মীয় ইবাদতের সফরে কিছু নির্দিষ্ট বিধিবিধান ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে ইহরাম অবস্থায় স্বামী–স্ত্রীর জন্যও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই হানিমুনের রোমান্টিক প্রত্যাশা এবং ধর্মীয় ইবাদতের উদ্দেশ্য এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। পবিত্র স্থানে যাওয়া অবশ্যই সম্মানের বিষয়; তবে সেখানে যাওয়ার আগে উদ্দেশ্য, প্রস্তুতি ও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

যে দম্পতি দাম্পত্যজীবনের সূচনালগ্নে একান্তে সময় কাটাতে চান, তাঁদের জন্য এমন গন্তব্য বেছে নেওয়া কি অধিক যুক্তিযুক্ত নয়, যেখানে তাঁরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে পারবেন? আর যাঁরা ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা–মদিনায় যেতে চান, তাঁরা যথাযথ ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রস্তুতি নিয়ে সেই সফরে যেতে পারেন। একটির সঙ্গে অন্যটির বিরোধ থাকা জরুরি নয়; প্রয়োজন হলো উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।

এখানে আমার মূল বক্তব্য হলো, ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানও থাকা প্রয়োজন। কেবল বাহ্যিক পোশাক–পরিচ্ছদ, পর্দা কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রকাশই ধর্মচর্চার পূর্ণতা নয়। হাতমোজা, পামোজা, মুখে নেকাব কিংবা আলখেল্লা পরিধান করার পাশাপাশি মনের পবিত্রতা, নৈতিকতা, সহনশীলতা এবং ধর্মীয় বিধিবিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করাও জরুরি।

প্রথমে পাপ–পুণ্য সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কোন বয়সে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে হয়, তা বুঝতে হবে। ধর্মীয় দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাও প্রয়োজন। আল্লাহর ইবাদত কেবল নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দৈনন্দিন জীবনের সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও নৈতিক আচরণও একজন মানুষের ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সবশেষে বলতে চাই, ‘হানিমুন’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য যদি নবদম্পতি ভালোভাবে বুঝতেন, তাহলে হয়তো তাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভ্রমণের গন্তব্য নির্ধারণ করতেন। আর ধর্মীয় সফরে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতেন। ধর্মীয় অনুরাগ যেন অজ্ঞতা বা অন্ধবিশ্বাসে পর্যবসিত না হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তিবোধ, জ্ঞান ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটুক এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: কবি ও রন্ধনশিল্পী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভীতি নয়, স্কুল হোক আনন্দের ঠিকানা
পরবর্তী নিবন্ধভাষা সৃষ্টির রহস্য