সকাল সাতটা বাজলেই বহু পরিবারে দেখা যায় চেনা দৃশ্য সন্তানের আকুল অনুনয়, “আজ স্কুলে যাব না!” প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিশু কেন মাঝেমধ্যে কিংবা নিয়মিত স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, তা আমাদের ভাবায়। প্রথমে একে শিশুর অলসতা বা একগুঁয়েমি মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে শিশুমনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, মানসিক বিকাশ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নানা জটিলতা।
চার থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের জগৎ কৌতূহল, কল্পনা ও আনন্দে পরিপূর্ণ। চারপাশের পরিবেশ থেকে তারা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চায়। কিন্তু ঘরের মুক্ত পরিবেশ ছেড়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি, নিয়মকানুন ও শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলায় অভ্যস্ত হওয়া সব শিশুর জন্য সহজ নয়। প্রতিটি শিশুর মানসিক প্রস্তুতি ও মানিয়ে নেওয়ার গতি আলাদা।
খেলাধুলা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ। অথচ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, বই–খাতা, বাড়ির কাজ ও নিয়মিত পাঠের চাপে তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ব্যাহত হতে পারে। যে বয়সে খেলাই আনন্দের প্রধান উৎস, সে বয়সে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা শিশুর জন্য কঠিন। ফলে স্কুল তার কাছে আনন্দের বদলে দায়িত্ব ও চাপের জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
নতুন সহপাঠী, শিক্ষক এবং অপরিচিত পরিবেশও শিশুর মনে শঙ্কা তৈরি করতে পারে। কারও শেখার গতি দ্রুত, কারও ধীর। অন্যদের সঙ্গে নিজের তুলনা, ভুল উত্তরের জন্য বকুনি কিংবা উপহাসের আশঙ্কা শিশুর মধ্যে অনিরাপত্তাবোধ জাগায়। তখন পরিচিত ও নিরাপদ ঘর ছেড়ে স্কুলে যেতে তার অনীহা দেখা দিতে পারে।
শিশুর এই অনীহাকে অলসতা বা অবাধ্যতা হিসেবে না দেখে সহানুভূতির সঙ্গে বোঝা জরুরি। কেন সে স্কুলে যেতে চাইছে না, তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। পরিবার ও বিদ্যালয়ের সম্মিলিত উদ্যোগে তার জন্য তৈরি করতে হবে আনন্দময়, নিরাপদ ও উৎসাহব্যঞ্জক শিক্ষার পরিবেশ।
গল্প বলা, ছবি আঁকা, হাতে–কলমে কাজ, গান ও খেলাধুলার মাধ্যমে পাঠদান করলে শেখার প্রতি শিশুর আগ্রহ বাড়ে। পাশাপাশি ভুল করলে বকাঝকা না করে উৎসাহ দেওয়া, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মেশার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয় যদি শিশুর কাছে কেবল নিয়মের বেড়াজাল না হয়ে আবিষ্কার, বন্ধুত্ব ও আনন্দের ঠিকানা হয়ে ওঠে, তবে স্কুলভীতি অনেকটাই দূর হবে। শিশুর শৈশবকে অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষাকে আনন্দময় করাই হোক পরিবার ও বিদ্যালয়ের অঙ্গীকার। তখন সকালবেলা অনীহা নয়, নতুন কিছু শেখার আগ্রহেই শিশু নিজে থেকে বলবে, “চলো, আজ স্কুলে যাই!”










