অন্য আলোয় রবীন্দ্রনাথ : ডা. মাহমুদ এ চৌধুরী আরজুর ‘কবিগুরুর স্বাস্থ্যচিন্তা ও অন্তিম দিনগুলি’

​রিনিক মুন | বুধবার , ৪ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

​আমরা রবীন্দ্রনাথকে চিরকাল জেনে এসেছি এবং দেখে এসেছি এক অবিচল, প্রশান্ত ঋষির বেশে, যাঁর চেহারায় থাকে কেবলই এক স্বর্গীয় আলো। ডা. মাহমুদ এ চৌধুরী আরজুর ‘কবিগুরুর স্বাস্থ্যচিন্তা ও অন্তিম দিনগুলি’ বইটি এই বহুল প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত ছবিটাকে ভেঙে দিয়েছে নিঃশব্দে, কোনো অনাবশ্যক তর্ক না তুলেই। জানুয়ারি ২০২৬–এ চট্টগ্রামের ‘ইতিহাসের খসড়া‘ থেকে প্রকাশিত তিনশো টাকা দামের এই বইটি হাতে নিয়ে বসলে একটা কথাই বারবার মনে আসে–আমরা যাঁকে দেবতা হিসেবে মানি, তিনি আসলে কতটা রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন। তাঁর যে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা হতো, অসুস্থ হয়ে শরীর অচল হয়ে পড়লে মন বিদ্রোহী হয়ে উঠত, সেই সত্যকে এমন নিপুণ ও প্রামাণ্য তথ্যে খুব কমই উপস্থাপন করা হয়েছে।

​শুরুটা হয় শৈশবের এক টুকরো অদ্ভুত স্মৃতি দিয়ে। বালক রবি তখন গৃহশিক্ষকের সঙ্গে জোড়াসাঁকোর অন্দরমহলে দেখেন ঝুলন্ত এক নরকঙ্কাল। ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, সেই অপার কৌতূহলের টানে তিনি গিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজের রক্তে–মাংসে ভরা ব্যবচ্ছেদ ঘরে পর্যন্ত। সেখানে সারে সারে সাজানো টেবিলে শোয়ানো এক বৃদ্ধার মৃতদেহ তাঁকে তেমন নাড়া দেয়নি, কিন্তু মেঝেয় পড়ে থাকা একখণ্ড কাটা পা–সেই নির্জীব দৃশ্য তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল বহু বছর। লেখক এই ছোট্ট প্রারম্ভিক ঘটনা দিয়েই যেন আমাদের বুঝিয়ে দিতে চান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি এই অমলিন টান কবির শেষ বয়সের কোনো ক্ষণস্থায়ী শখ ছিল না, এটি ছিল তাঁর বাল্যকাল থেকেই গড়ে ওঠা এক গভীর অনুসন্ধিৎসার প্রকাশ।

​তারপর বই এগোয় ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্রিটিশ পদক্ষেপ ও রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা’ অধ্যায়ে, যেখানে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রবীন্দ্রনাথকে–যিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, সোচ্চার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিঃসংকোচে সরব। পরাধীন ভারতে যখন কলেরা আর ম্যালেরিয়ায় বাংলার পল্লী অঞ্চল একের পর এক উজাড় হয়ে যাচ্ছে, তখন ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বৈষম্যমূলক ও দায়সারা জনস্বাস্থ্য নীতি নিয়ে কবি প্রশ্ন তুলেছেন নিজের শাণিত কলমে। গ্রামের প্রজা ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা কীভাবে রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, তা তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। এই অংশ পড়ে পরিষ্কার বোঝা যায়, তাঁর কাছে স্বাস্থ্যচিন্তা কোনোদিনই কেবল ব্যক্তিগত শারীরিক সুস্থতার বিষয় ছিল না, তা ছিল এক গভীর নাগরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির অংশ।

​এরপর ‘চিকিৎসা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের জ্ঞানের উৎস’ অধ্যায়টা সাধারণ পাঠককে রীতিমতো চমকে দেয়। মেডিকেল ছাত্র অঘোরবাবুর কাছে বাড়িতে প্রাইভেট পড়ে তিনি নিখুঁতভাবে অ্যানাটমি শিখেছিলেন, মানবদেহের কঙ্কালের প্রতিটা হাড়ের নাম মুখস্থ ছিল তাঁর। শুধু তথ্য শেখাই নয়, নিজে বাংলায় নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পরিভাষা তৈরি করেছিলেন–ফ্যাগোসাইটকে তিনি ডাকতেন ‘ভক্ষককোষ’ নামে, প্যাথোজেন হয়ে গেছে ‘ব্যাধিবীজ‘, আর রক্তরস বা প্লাজমাকে বলেছেন ‘বর্ণহীন রস‘। সাধনা পত্রিকায় লেখা তাঁর ‘মানবশরীর‘ প্রবন্ধে আমরা পড়ি, কীভাবে শরীরের ভেতরে অসংখ্য অদৃশ্য কোষের দল এক অপূর্ব শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে নিজ নিজ কাজ সামলে চলেছে। তা ভাবলে কবির মনে গভীর বিস্ময় জাগত–এই জায়গাগুলো পড়তে গিয়ে গভীরভাবে টের পাওয়া যায়, কবি আর বিজ্ঞানী তাঁর ভেতরে কখনো আলাদা দুজন মানুষ ছিলেন না, দুটো সত্তা মিশে গিয়েছিল একই মোহনায়।

​‘হোমিওপ্যাথ ও কবিরাজ রবীন্দ্রনাথ’ অংশে এসে পাঠক আরও অবাক হন। নিজেকে হাসিমুখে ‘কবিরাজ’ পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন কবি। শান্তিনিকেতনে পরিবার ও আশপাশের লোকজনের অসুখ–বিসুখে নিজেই নানা টোটকা–নিদান আজমাতেন। বিশেষ করে হোমিওপ্যাথিক ও বায়োকেমিক ওষুধের প্রতি তাঁর ছিল এক প্রবল অনুরাগ ও প্রগাঢ় আস্থা। নিজে মোটা মোটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই পড়ে ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করতেন। এই খুঁটিনাটি ইতিহাস পড়তে গিয়ে বিশ্বকবির মহাজাগতিক আড়ম্বরের আড়ালে এক চঞ্চল, কৌতূহলী ও পরীক্ষাপ্রিয় মনের সন্ধান মেলে, যা পাঠককে এক অনন্য অনুভূতির মুখোমুখি করে।

​খাবার নিয়ে তাঁর বাতিক ও পছন্দ–অপছন্দও কম আকর্ষণীয় নয়। ‘বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস’ আর ‘খাদ্য নিয়ে গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য ভাবনা’–এই দুই অধ্যায় পড়তে পড়তে চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে কবির খাওয়ার টেবিল। ফলের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল সীমাহীন; বিশেষ করে কমলালেবু, কলা আর লেবুর শরবত ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। অন্যদিকে রান্নাবান্নায় নিরামিষ থেকে শুরু করে মাছ–মাংসের রকমারি পদের দেশি–বিদেশি রেসিপি নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালাতেন তিনি। নন্দগোপাল সেনগুপ্ত ও অন্যান্য সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ থেকে নেওয়া চমৎকার উদ্ধৃতিগুলো বইয়ের এই অংশটিতে এক জীবন্ত প্রাণ ঢেলে দিয়েছে, যার ফলে রবীন্দ্র–জীবনের এক ঘরোয়া পরিবেশের সুবাস পাওয়া যায়। তবে বইয়ের গভীরতম ও বেদনাতুর জায়গাটা শুরু হয় ‘মৃত্যুচিন্তায় রবীন্দ্রনাথ’ অধ্যায় থেকে। যিনি সারা জীবন মৃত্যুকে নিয়ে লিখে গেছেন একের পর পর কালজয়ী গান আর কবিতা, নিজের বাস্তব বার্ধক্যে এসে সেই মৃত্যুই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে ভারী, নিরেট, প্রায় দমবন্ধ করা এক কঠিন বাস্তবতা। ‘অসুখ যখন সঙ্গী হলো’ অধ্যায়ে আমরা পৌঁছাই ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন কিডনির মারাত্মক জটিলতায় প্রথমবারের মতো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। সেবার চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় তিনি সেরে ওঠেন ঠিকই, কিন্তু তা যেন ছিল এক আসন্ন ঝড়ের দীর্ঘ পূর্বলক্ষণ মাত্র। ১৯৪০ সালে কালিম্পংয়ে ভ্রমণকালে তিনি আবারও হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। রক্তপরীক্ষায় ধরা পড়ে প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের চরম সমস্যা। প্রায় অচেতন অবস্থায় সেখান থেকে তাঁকে ফেরানো হয় কলকাতায়। প্রায় এক মাস শয্যাশায়ী থাকার পরেও সামান্য চেতনা ফিরতেই তিনি আকুল হয়ে ছটফট করেন শান্তিনিকেতনে ফেরার জন্য, শরীর যতই অচল ও জীর্ণ হোক না কেন, কবির মন তখনও অদম্য অস্থির ও মুক্তিকামী।

‘অন্যের সেবা–যত্নে অনীহা’ নামের ছোট অধ্যায়টাই আমার কাছে এই গোটা বইয়ের সবচেয়ে ভারী ও বিষাদময় জায়গা বলে মনে হয়েছে। ১৯৩৪ সালের এক জুলাই বিকেলে, যাঁর দুই পা চেপে ধরে হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে, লাঠি ধরে বা কারও কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতেও যাঁর চরম আপত্তি, সেই আত্মমর্যাদাবান কবি রানী চন্দকে ব্যাকুল হয়ে বলেছিলেন-‘দেখ, কারো উপর নির্ভর করতে হবে এ বয়সটা ভারী খারাপ। আমি কোনোদিনও কারও উপর নির্ভর করতে ভালোবাসিনে। করিনি কখনো। কিন্তু এখন দেখছি পদে পদে আমাকে অন্যের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, অথচ উপায় নেই, নিজের সামর্থে কুলোয় না। এ যে আমার একেবারে স্বভাব বিরুদ্ধ। এমন কষ্ট হয় ভাবলে।’ এই সামান্য কটা বাক্যের ভেতর যেন এক মহীরুহের পতনের নীরব কান্না জমা হয়ে আছে। আজীবন যিনি নিজের শর্তে ও মহিমায় বেঁচেছেন, শেষ দিনগুলোতে তাঁকেও মাথা নোয়াতে হয়েছিল নিজেরই জীর্ণ শরীরের কাছে।

​‘অন্তিম দিনগুলি’ অধ্যায়ে পৌঁছে পাঠক হিসেবে মনে হয় আমরা যেন জোড়াসাঁকোর সেই নিস্তব্ধ ঘরটিতেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। ইরিসিপেলাসে আক্রান্ত হওয়ার পর কবি নিজে খুব একটা বিচলিত না হলেও তাঁর চারপাশের স্বজন, অনুরাগী ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা উদ্বেগে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছিলেন কেবল শেষবারের মতো বিশ্বকবিকে একনজর দেখার জন্য। ড. ডি. এম. সেন রাতের অন্ধকারে মালগাড়িতে চড়ে, তারপর মাইলের পর মাইল হেঁটে বর্ধমান পৌঁছে টেলিফোনে খবর দেন প্রখ্যাত চিকিৎসক স্যার নীলরতন সরকারকে–এই একটিমাত্র হৃদয়বিদারক বর্ণনা পড়লেই বোঝা যায়, একজন মহামানবের শারীরিক অসুস্থতার খবরে গোটা দেশ কীভাবে নিঃশ্বাস আটকে উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

​সবশেষে ‘অপারেশন নিয়ে মত–দ্বিমত’ অধ্যায়ে চিকিৎসকদের মধ্যকার মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, পরিবারের তীব্র উৎকণ্ঠা, আর ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাইয়ের সেই চূড়ান্ত কালবেলা ফুটে ওঠে। বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে ললিতমোহন ব্যানার্জি বা ললিতমোহন বস্তুঅস্ত্রোপচার করা ঠিক হবে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে ছিল প্রবল সংশয়। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার হলেও কবির অত্যন্ত ক্লান্ত ও বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীর সেই ধকল আর সইতে পারেনি। রক্তে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়া, নলের সাহায্যে তরল খাবার দেওয়া আর যন্ত্রণাদায়ক প্রহরগুলোর পর অবশেষে ২২ শ্রাবণের দুপুরে নিভে যায় সেই মহাজীবন। বইয়ের একেবারে শেষ পাতায়, ‘চিত্রে রবীন্দ্রনাথ’ অংশে সংরক্ষিত দুর্লভ ছবিগুলো যেন নীরবে বলে যায় সেই না–বলা করুণ কথাগুলো, যা সাধারণ শব্দে কোনোদিন ধরা যায় না।

​লেখকের কলম গোটা বইজুড়েই ছিল অত্যন্ত সংযত, প্রামাণ্য ও তথ্যনিষ্ঠ, অথচ কোথাও তা শুষ্ক বা প্রাণহীন হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্র রচনাবলি, সমসাময়িকদের লেখা স্মৃতিকথা এবং তৎকালীন নানা পত্রিকা থেকে টেনে আনা অজস্র উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রতিটা দাবিকে দাঁড় করিয়েছেন অত্যন্ত শক্ত ভিত্তির ওপর; প্রায় নব্বইটি তথ্যসূত্র জুড়ে দিয়েছেন বইয়ের শেষে। একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর প্রশিক্ষিত প্রজ্ঞাবান চোখ আর অনুরাগী ভক্তের আবেগ মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এমন এক সাবলীল গদ্য, যা কঠিন তথ্যকেও অত্যন্ত প্রবহমান সাহিত্য বা কবিতার মতো পড়তে দেয়।

​খুঁত যে একেবারেই নেই তা বলবো না–তবে বইটা পাঠককে যা উপহার দিয়েছে, তা অনেক বড়। এটি রবীন্দ্রনাথকে অনুধাবন করার সম্পূর্ণ নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি। যিনি গান বেঁধেছিলেন পরম আনন্দে মৃত্যুভয় জয় করার, তিনিও শেষ বয়সে ভুগেছেন জীর্ণ শরীরের কাছে হার মানার করুণ যন্ত্রণায়; যিনি লিখেছিলেন জীবন–মরণের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার গান, তিনিও জীবনের অন্তিম প্রহরে খুঁজেছেন কেবল এক মুঠো শারীরিক স্বস্তি। এই বইয়ের শেষ পাতাটি উল্টে উঠে দাঁড়ানোর পর কবিগুরুকে দূর আকাশের নক্ষত্র বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় আরও কাছের এক প্রিয় মানুষ–যিনি শত মহিমার মাঝেও শেষ পর্যন্ত ছিলেন আমাদেরই মতো রক্তমাংসের এক নশ্বর মানবপুত্র।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধকেন বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ : চট্টগ্রামের বাস্তবতায় গবেষণার ঘাটতি ও করণীয়