দেশের একমাত্র থিম পার্ক : শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স

অধ্যাপক ওয়াই এমডি জাফর | বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে সর্বাধিক খ্যাত, উপমহাদেশের প্রাচীনতম সমুদ্র বন্দরের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ইতিহাস আশ্রিত, আর নাম নিয়েই শুধু পরিচয় যার “বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম” তার কথাই বলছি। সেই চট্টগ্রামে আমাদের গর্বিত কাল, প্রাণ বাজিরাখা সময়, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ঘোষণা– ইথার তরঙ্গে প্রক্ষেপণ স্থান– দক্ষিণ ও পূর্ব চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার বহদ্দার হাটের অনতিদূরে কালুরঘাট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বেতার কেন্দ্র সংলগ্ন ১১ বিঘা তথা ১৬.৩৭ একর জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ মৃত্যু বাজিরাখা ঘোষণা ও ঘোষক মেজর জিয়ার নামের সম্মানে ২০০৬ সালে “শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স” প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর দেশে দেশে নিজ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, সামস্টিক চিন্তা চেতনা, মন, মনন, উদ্ভাবন ভবিষ্যলোক, গণমানুষ ও শিশুতোষ ভাবনার জাগরুক আনন্দ, আর আনন্দের আকরে শিক্ষার প্রভাবের মিশেলে গড়ে উঠেছে অনাবিল ধারায় এ থিম পার্ক। আর তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠা এ থিম পার্ক তথা কমপ্লেক্সে টিকেট কেটে ঢুকতেই আপনার দৃষ্টিকে হতচকিত করে দেবে লেকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘জাতীয় সংসদ ভবন’, নিচে লেকের পানিতে পাখাঝাঁপড়িয়ে খেলছে শুভ্র রাজহাস, আর পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আপনাকে যেন পখর করছে ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’, পাশে গর্ব ভরে দাঁড়িয়ে আছে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর ১১ দফা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী তুঙ্গ আন্দোলন, সর্বৈভ বিদ্রোহ ও মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রস্তাবিত সূতিকাগার, ইতিহাসখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কার্জন হল’। কিছুদূর সামনে এগুতেই দেখা যাবে ঢাকা সদরঘাটের ‘আহসান মঞ্জিল’, ঢাকা ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’, ইতিহাস খ্যাত ‘লালবাগের কেল্লা’, ‘দরবার হল’, ‘হাইকোর্ট’, বাগেরহাটের ‘সোনা মসজিদ’, ‘বড়কুঠি’, ‘ছোট কুঠি’, দিনাজপুরের ‘কান্তজীর মন্দির’, রংপুরের ‘পাহাড়পুর বিহার’ ও ‘সেন্ট নিকোলাস চার্চ’।

পার্কের প্রতিটি স্থাপনায় প্রতিটি নিদর্শনে দেশের ইতিহাস যেন আপনার সাথে কথা বলে। আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে ইতিহাস, কথা বলে আপনার অন্তমন, বিস্ময়ে তাকান আপনি– সময় বয়ে চলে– সময়ের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যতক্ষণ ইচ্ছা আপনি সাথী নিয়ে বা সাথীদের সাথে সময কাটাতে পারেন। ঘুরতে ঘুরতে নামাজের সময় হলে সোনা মসজিদ আপনাকে কাছে ডাকবে, সন্ধ্যা আরতির সময়ে কান্তজীর মন্দিরে যেতে পারেন, পাহাড়পুর বিহারে আপনার আরাধনা সারতে পারেন এবং সেন্ট নিকোলাস চার্চে আপনি ইভিনিং প্রেয়ারও সারতে পারেন।

ঘুরতে ঘুরতে, আরাধনা আচারে এবাদতে, ক্লান্তবোধ করলে ২৪ তালা বিশিষ্ট ২৫০ ফিট উচ্চতার ঘূর্ণায়মান রিভলভিং রেস্টুরেন্ট বা স্বাধীনতা স্তম্ভে উঠে হালকা নাস্তা পানীয় খেয়ে ওয়াচ টাওয়ার থেকে পুরো চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আপনার মনে প্রশান্তি ও অন্তরমাঝে গর্ব অনুভূত হতে পারে আপনার প্রিয় চট্টগ্রামের জন্য। এ যে মায়াবি অনন্য এক ঐতিহাসিক শহর যার পরতে পরতে ইতিহাস কথা বলে সাক্ষ্য হয়ে– তাইতো প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এ চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম শহর, চট্টগ্রাম অঞ্চল রাজা, বাদশা, সম্রাট, সুলতানের ইচ্ছায় বাংলার নাজিমদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়– আসতে থাকেন সুফি দরবেশ, তেজারতী, পরিব্রাজক, ব্যবসায়ী– হয়ে পড়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলন স্থল, ধর্মীয় সম্প্রীতির অনাবিল প্রশান্তিস্থল, বৃহত্তর চট্টগ্রাম। তারই প্রত্যক্ষ ছবি আপনি খুঁজে পাবেন পরবর্তী স্থাপনায় বা রেপ্লিকায়।

কমপ্লেক্সটির উপজাতীয় জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন অঞ্চলের আদলে তৈরি প্রতিটি বিভাগের বাসস্থানের মডেলগুলো– আপনাকে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি পাহাড়ি বনভূমির টিলায় টিলায় গড়ে তোলা ঘরের আবহে নিয়ে যাবে আপনাকে যেন চাক্ষুষ দেখছেন তাদের জীবনমান। ঠিক পাহাড়ি জনপথের সাথে সাজুয্য রেখে গড়ে তোলা হয়েছে কৃত্রিম ঝরনা– অপরদিকে গড়ে তোলা হয়েছে এমউইজমেন্ট পার্ক– যেখানে গিয়ে বৃদ্ধারাও তরুণ হয়ে যায় মজার মজার রাইড উপভোগে আর শিশুদের তো কথাই নেই। তাদের কিড্‌স জোন, ঝরনার পাশাপাশি ৫টি পানির ফোয়ারা, আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দেবে। লেকের পেডেল বোট, ফ্যামিলি কোস্টার, বেবি কেসেল, বেলুন ফুইল, ঝক ঝক ঝক ঝক রেল গাড়ি– পাশে শনের ছাউনি ঘরে পুনঃ নাস্তাও সারতে পারেন।

বিশ্বের সেরা থিম পার্কগুলোর অন্যতম কয়েকটি সম্পর্কে জেনে আমরা পরখ করে দেখতে পারি এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং কেন এ থিম পার্ক সৃষ্টি। এ্যানিমেশন জগতের পথিকৃৎ পুরুষ ওয়াল্ট ডিজনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় ১৬০ একজর জমির উপর ১৯৫৪ সালে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার ব্যয়ে গড়ে তুলেন ‘ডিজনী ওয়ার্ল্ড’ যাতে রয়েছে ৪টি ‘থিম পার্ক’ ও ২টি ‘ওয়াটার পার্ক। তাছাড়া রয়েছে ‘হন্টেড ম্যানশন’ ও ‘পাইরেট্‌্‌স অব দি ক্যারিবিয়ান ক্লাসিক রাইড’। পার্কের ‘অ্যাভাটার ফ্লাইট অব প্যাসেজ’ এবং ‘স্টার ওয়ার্স– রাউজ অব দি রেজিস্ট্যান্স রাউড’ দর্শনার্থীদের অধিক আকর্ষণ করে। এটি শিশুদের রাজ্য শুধু নয়, সকল বয়সের মানুষের আনন্দ আশ্রয়। বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের ৩০০ কোটি ডলার খরচের স্থান এটি।

আমেরিকার ফ্লোরিডায় গড়ে তোলা পৃথিবী বিখ্যাত দ্বিতীয় জনপ্রিয় থিম পার্ক “ইউনিভার্সেল স্টুডিও। হলিউড স্টাইলে গড়ে তোলা একটি স্টুডিও ছাড়াও এই পার্কের জনপ্রিয় রাইডগুলোর মধ্যে হ্যারী পটারের “ইউজ্যডিং ওয়ার্ল্ড রাইড অন্যতম।

“টোকিও ডিজনী রিসোর্ট” জাপানী শৈলির অনন্য প্রকাশ। এতে রয়েছে দুটি থিম পার্ক ও একটি ওয়াটার পার্ক। আর জনপ্রিয় রাইড ‘হন্টেট ম্যানশন’, ‘পাইরেট্‌স অব দি ক্যারিবিয়ান’, ‘বিগ থান্ডার মাউন্টেন’ ও ‘মনস্টারস’। ডেন মার্কের “টিভোলি গার্ডেন” বিশ্বের বিনোদন পার্কগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। কোপেন হেগেনের প্রাণ কেন্দ্রে ১৭২ বছর পূর্বে গড়ে উঠা এ থিম পার্কে ‘দ্য ফেরিস হুইল’, ‘দ্য এ্যাস্টোনমার’, ‘দ্য গোল্ডেন টাউয়ার’, ‘দ্য ফ্লায়িং ট্রাঙ্ক’, ‘দ্য ড্রাগন বোটস’, ‘দ্য লিটন ড্রাগন’, হাসির ফল্গুধারায় আনন্দ উপভোগের যথার্থ সহায়ক থিয়েটার, রাইডস ও রেস্তোরাঁর পরিবেশেনায় অবকাশ যাপনকারীদের পছন্দের যায়গা।

“এফেলিং নেদারল্যান্ডস্‌্‌” ইউরোপের বিনোদন পার্কগুলোর অন্যান্যের মধ্যে জনপ্রিয় ও দেশটির সর্ববৃহৎ পার্ক। পার্কটির নিমগ্ন রাইড, প্রশস্ত উদ্যান, রূপকথার কল্পকাহিনী ও ডার্চ লোককাহিনীর আলোকে গড়ে তোলা থিমসমূহে ঠাসা ১৫ একর জমির বিশাল যাদুকরী জগতে হারিয়ে নিজেকে আনন্দ পাওয়ার পাশাপাশি রেস্তোরার রকমারী খাওয়ার ও পানিয়ে তৃপ্তির স্বাদ পেতে পেতে ঘরে ফেরা যায়।

পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয়, অতিপরিচিত থিম পার্কগুলোর সাথে তুলনায় আমরা দেখি আমাদের এ পার্কিটি জনমানুষ ও শিশুদের আনন্দ দানের পাশাপাশি নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, দেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সম্প্রীতির নিগূঢ় বন্ধন, সকল ধর্মের উপাসনালয়, জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল, লোকাচারের পাশাপাশি আনন্দ আয়োজনের ফল্গুধারায় ভাসার, দেশজ শিক্ষা সংস্কৃতি আমাদের লোকাচারকে দেখতে দেখতে আনন্দের অতিশয্যে নিজেকে হারাবার অঢেল আয়োজন– অপ্রতুল বিনোদনের বিশাল এ শহরে আনন্দের রূপবৈচিত্র্যের শান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের এ থিম পার্ক “জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স” উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট। ৫৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠা এ পার্ক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কনকর্ড’ তৈরি করেন। অবশ্য পরবর্তী সরকার পার্কটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন “স্বাধীনতা কমপ্লেক্স”।

পত্রিকার খবরে প্রকাশিত মতে ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এ পার্ক পরিচালনা করেন “চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। পরে মন্ত্রণালয় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিলে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় এটি। চসিকের তথ্য মতে ২০১৫–২০২৬ অর্থ বছরের ১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চসিক টিকেট বিক্রি করে আয় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, টিকেটের মূল্য কমানোর পরও।

আর এখন এটি প্রায় সকল স্থাপনা ধ্বংসের পথে। শিশুতোষ স্থাপনাসমূহ প্রায় উধাও। এমনকি সীমানা প্রাচীরের কাটা তারগুলোও উধাও। যে যারভাবে ঢুকে যা ইচ্ছা করে। অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা চট্টগ্রামের সন্তান ফারুক ই আযম (বীর প্রতীক) পার্কটি পরিদর্শন করেন। নির্বাচিত সরকারও প্রায় আট মাস দেশ চালাচ্ছেন– যদি তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় দেশের অনন্যসাধারণ; ব্যতিক্রমধর্মী দূরদর্শী এ স্থাপনা যদি ফিরে পায় তার যৌবন– অবহেলিত চট্টগ্রাম ফিরে পাবে এ আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন কেন্দ্র– দেশ পাবে অনন্য সাধারণ সেই থিম পার্ক ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স বা স্বাধীনতা কমপ্লেক্স তথা মিনি বাংলাদেশ’।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্ট্রোক : প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ, সময়মতো চিকিৎসাই বাঁচাতে পারে জীবন
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের কৃষির অগ্রগতি ও করণীয়