স্ট্রোক : প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ, সময়মতো চিকিৎসাই বাঁচাতে পারে জীবন

ডা. নাঈমা মাসরুরা | বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

একটি ভুল ধারণা, কয়েকটি মূল্যবান মিনিট এবং একটি জীবন:

আজমল সাহেব মধ্যবয়সী একজন ভদ্রলোক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। চিকিৎসক তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ওষুধ খাওয়ার ব্যাপারে খুব একটা নিয়মিত ছিলেন না।

ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেলে ওষুধ খেতেন। কয়েক দিন পর প্রেশার স্বাভাবিক হয়ে গেলে ভাবতেন, “এখন তো ঠিক হয়ে গেছে, আর ওষুধ খাওয়ার কী দরকার!” ডায়াবেটিসের ওষুধও কখনো নিয়মিত, কখনো বাদ পড়ত।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আজমল সাহেব হঠাৎ বুঝতে পারলেন, কিছু একটা অস্বাভাবিক। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে। বাম হাতটি তুলতে গিয়ে দেখলেন, হাতটি ঠিকমতো উঠছে না। বাম পা–ও নাড়াতে পারছেন না।

ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। কী হয়েছে বুঝতে না পেরে পরিবারের সদস্যদের ডাকলেন। পরিবারের সবাই ছুটে এলেন। কেউ বললেন, “হয়তো প্রেশার বেড়েছে।” কেউ বললেন, “একটু অপেক্ষা করি, ঠিক হয়ে যেতে পারে।” কিন্তু এই মুহূর্তে অপেক্ষা করাটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় ভুল। এভাবেই অনেক সময় স্ট্রোকের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট হয়ে যায়।

চট্টগ্রামবাসীর জন্য কিছু জরুরি কথা:

আজমল সাহেবের মতো অনেক রোগীকে আমরা প্রতিদিন দেখি, যাঁরা মনে করেন, প্রেশার অথবা ডায়াবেটিস কমে গেলে ওষুধের আর প্রয়োজন নেই। স্ট্রোক এমন একটি রোগ, যেখানে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কের কোষগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। তাই স্ট্রোকের ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা জরুরি: “ঞরসব রং ইৎধরহ.”

স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা (ওঠ ঞযৎড়সনড়ষুংরং) এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগেও সম্ভব। কোনো রোগী স্ট্রোকের সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে, তাঁর ইস্কেমিক স্ট্রোক হয়ে থাকলে এবং রোগীর যদি একটি দামি ওষুধ (অষঃবঢ়ষধংব, ঞবহবপঃবঢ়ষধংব) কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য থাকে, তাহলে তিনি এই সুবিধা পেতে পারেন।

স্ট্রোক কীভাবে চিনব?

স্ট্রোকের লক্ষণ অনেক সময় হঠাৎ শুরু হয়। সহজে মনে রাখার জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল করুন:

মুখ: হাসতে বললে মুখের এক পাশ বেঁকে যাচ্ছে কি?

হাত: দুই হাত তুলতে বললে একটি হাত নিচে নেমে যাচ্ছে কি?

কথা: কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, অস্পষ্ট হচ্ছে বা রোগী কথাই বলতে পারছেন না কি?

এগুলোর সঙ্গে হঠাৎ এক চোখে কম দেখা, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য হারানো অথবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও হতে পারে। এসব লক্ষণের যেকোনো একটি হঠাৎ দেখা দিলেও স্ট্রোকের কথা মাথায় রাখতে হবে।

স্ট্রোক হলে প্রথম কাজ কী?

অপেক্ষা করবেন না। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর কমে গেলেও বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। এটি সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘটনা, অর্থাৎ ঞওঅ (ঞৎধহংরবহঃ ওংপযবসরপ অঃঃধপশ), হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে বড় স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে।

রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব এমন হাসপাতালে নিতে হবে, যেখানে জরুরি মস্তিষ্কের পরীক্ষা ও স্ট্রোকের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।

সম্ভব হলে রোগী কখন শেষবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন, সেই সময়টি মনে রাখুন। চিকিৎসকের জন্য এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাসপাতালে নেওয়ার আগে কী করবেন?:

রোগীকে নিরাপদে শুইয়ে বা বসিয়ে রাখুন এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

রোগী অচেতন হলে শ্বাস–প্রশ্বাস ঠিক আছে কি না খেয়াল করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি সহায়তা নিন।

রোগীকে জোর করে পানি, খাবার বা ওষুধ খাওয়াবেন না। স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর গিলতে সমস্যা হয়। মুখে খাবার বা পানি দিলে তা শ্বাসনালিতে ঢুকে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে।

নিজে থেকে অতিরিক্ত রক্তচাপের ওষুধ, অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনো ওষুধ দেওয়াও ঠিক নয়। কারণ সব স্ট্রোক একই ধরনের নয়। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে কিছু ওষুধ পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।

প্রথম কয়েক ঘণ্টা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

স্ট্রোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো রোগের শুরু থেকে প্রথম কয়েক ঘণ্টা।

ইস্কেমিক স্ট্রোকে, অর্থাৎ রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে, উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রহঃৎধাবহড়ঁং ঃযৎড়সনড়ষুংরং দিয়ে রক্তের জমাট গলানোর চেষ্টা করা যায়। নির্বাচিত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উন্নত ইমেজিং ও অন্যান্য মানদণ্ড অনুযায়ী আরও দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও চিকিৎসার সুযোগ থাকতে পারে।

আর বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে সবপযধহরপধষ ঃযৎড়সনবপঃড়সু, অর্থাৎ ক্যাথেটারের মাধ্যমে রক্তনালির জমাট বের করে দেওয়ার চিকিৎসা, জীবন ও কর্মক্ষমতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এসব চিকিৎসা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। মস্তিষ্কের ঈঞ বা গজও–সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

অন্যদিকে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। তাই স্ট্রোক সন্দেহ হলেই দ্রুত নৎধরহ রসধমরহম করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“স্ট্রোক হয়েছে, এখন আর কিছু করার নেই” এই ধারণা কি ঠিক?

একেবারেই নয়। স্ট্রোকের পর রোগীর কতটা সুস্থতা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করে স্ট্রোকের ধরন, মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে, কত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়েছে এবং পরবর্তী পুনর্বাসনের ওপর। নিউরোলজি বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সময়মতো হাসপাতালে এলে অনেক স্ট্রোক রোগীর জীবন ও কর্মক্ষমতা রক্ষা করা সম্ভব।

কথা বলা, হাঁটা, হাতের কাজ, গিলতে পারা বা দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য ঢ়যুংরড়ঃযবৎধঢ়ু, ড়পপঁঢ়ধঃরড়হধষ ঃযবৎধঢ়ু, ংঢ়ববপয ধহফ ংধিষষড়রিহম ঃযবৎধঢ়ু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনেক রোগী ধীরে ধীরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেন। তাই স্ট্রোকের পর হতাশ না হয়ে নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন চালিয়ে যেতে হবে।

একবার স্ট্রোক হলে কি আবার হতে পারে?

হ্যাঁ। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয়বার স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এর জন্য প্রথমেই খুঁজে বের করতে হবে, স্ট্রোকের কারণ কী ছিল।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, ধূমপান, স্থূলতা, অনিয়মিত জীবনযাপন, হৃদ্‌যন্ত্রের কিছু রোগ বিশেষ করে ধঃৎরধষ ভরনৎরষষধঃরড়হ্তএবং কিছু রক্তনালির সমস্যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজন অনুযায়ী পযড়ষবংঃবৎড়ষ কমানোর চিকিৎসা, ধূমপান বন্ধ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নির্ধারিত ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা:

স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এর ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করুন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ধূমপান বন্ধ করুন। অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার কমান। নিয়মিত হাঁটুন বা শারীরিক পরিশ্রম করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না।

আর যদি হঠাৎ মুখ বেঁকে যায়, হাত–পা দুর্বল হয়ে যায় বা কথা জড়িয়ে যায়, তাহলে ঘরে বসে অপেক্ষা করবেন না। মনে রাখুন,

মুখ বেঁকে যাওয়া + হাত দুর্বল হওয়া + কথা জড়িয়ে যাওয়া = স্ট্রোকের সম্ভাবনা। সময় নষ্ট নয়। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একটি পরিবারের সচেতনতা একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, সময়কে গুরুত্ব দিন এবং অন্যকেও সচেতন করুন।

ডা. নাঈমা মাসরুরা, এমডি (নিউরোলজি), সহযোগী অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাব্যিক প্রেম
পরবর্তী নিবন্ধদেশের একমাত্র থিম পার্ক : শহীদ জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স