অতিপর্যটনের চাপে কক্সবাজার : সৈকত বাঁচাতে এখনই সচেতন হতে হবে

মো. জাফর আলম | বুধবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

পর্যটন আধুনিক অর্থনীতির একটি বহুমাত্রিক খাত। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও কৃষিপণ্যের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংযোগ রয়েছে। কোনো পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের আগমন বাড়লে শুধু আবাসন ব্যবসা নয়, মাছ, সবজি, যানবাহন, গাইড, নির্মাণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও বাজার তৈরি হয়। তরুণদের কর্মসংস্থান, নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আদায়ের সুযোগও বাড়ে। তাই উন্নয়নশীল দেশে পর্যটনকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে গণ্য করা হয়। জাতিসংঘ ও বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের সামপ্রতিক হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক দশমাংশের সমপরিমাণ অবদান রেখেছে এবং বিশ্বব্যাপী প্রতি দশটি কর্মসংস্থানের প্রায় একটি এ খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে পর্যটনের সুফল পর্যটকের সংখ্যার সঙ্গে সরলরেখায় বাড়ে না। নির্দিষ্ট সময়ে এত বেশি মানুষ জড়ো হতে পারে যে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক, নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সেই চাপ সইতে পারে না। স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, বাড়িভাড়া ও জমির দাম বাড়ে, যানজট ও শব্দদূষণ তীব্র হয়, আর আয় কেন্দ্রীভূত হয় অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে। এই অবস্থাই অতি–পর্যটন বা ওভারট্যুরিজম। এটি পর্যটনবিরোধিতা নয়; বরং অর্থনৈতিক লাভের সঙ্গে সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয়ের অসামঞ্জস্যের প্রকাশ।

কক্সবাজার শুধু একটি পর্যটন শহর নয়; এটি পাহাড়, বন, নদী, খাল, বালিয়াড়ি, মোহনা, ম্যানগ্রোভ, লবণাক্ত জলাভূমি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং দীর্ঘ বালুকাময় সৈকতের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংবেদনশীল উপকূলীয় ভূদৃশ্য। ১৯৯৯ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিধান বলে গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কক্সবাজার–টেকনাফ সমুদ্রসৈকতকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা Ecologically Critical Area (ECA) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। এ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল এলাকার প্রাকৃতিক ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং এমন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা, যা বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।

সরকার ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে আরও ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করছে। যোগাযোগ সহজ হলে পর্যটকের ঢল আরও বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এই সমুদ্রসৈকত কি আরও চাপ নেওয়ার অবস্থায় আছে? সৎভাবে বললে, কক্সবাজার এখনই ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাই আরও পর্যটক আনার আগে অতি–পর্যটন নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। বিশ্বের বহু জনপ্রিয় গন্তব্য একই বাস্তবতার মুখোমুখি। ভেনিসে ব্যস্ত দিনে দিনের পর্যটকদের জন্য প্রবেশ ফি চালু হয়েছে। আমস্টারডামে পর্যটন কর, ক্রুজযাত্রীদের আলাদা কর এবং কেন্দ্রীয় এলাকায় ভারী পর্যটকবাহী যান নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইউরোপের নানা নগরে স্বল্পমেয়াদি আবাসন নিয়ন্ত্রণ, দৈনিক প্রবেশসীমা, অগ্রিম নিবন্ধন এবং ব্যস্ত মৌসুমের বাইরে ভ্রমণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য পর্যটন বন্ধ করা নয়; আকস্মিক চাপ কমানো, স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষা এবং পর্যটন–আয়ের একাংশ অবকাঠামো ও পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবহার করা।

পর্যটনের পরিবেশগত ব্যয়ের বড় অংশ পানি, জ্বালানি ও বর্জ্যের সঙ্গে জড়িত। বড় হোটেল, সুইমিংপুল, লন্ড্রি ও রেস্তোরাঁয় স্থানীয় পরিবারের চেয়ে মাথাপিছু পানি ব্যবহার অনেক বেশি হতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে পর্যটক হঠাৎ বাড়লে পানীয় জল ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ পড়ে। অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য নদী, খাল বা সাগরে গেলে পানির গুণমান নষ্ট হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, বোতল, ক্যান ও খাবারের প্যাকেট দ্রুত জমে ওঠে। সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির সক্ষমতা না বাড়ালে পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য নিজের বর্জ্যের নিচেই চাপা পড়ে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে সমপ্রসারণ চললে পানি, জ্বালানি, কার্বন নিঃসরণ ও কঠিন বর্জ্য ব্যাপকভাবে বাড়বে।

বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণও পর্যটনের অদৃশ্য ব্যয়। বিমান, ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ডিজেল জেনারেটর ও জাহাজের দূষক স্থানীয় বাতাসের মান নষ্ট করে। ক্রুজ পর্যটন নিয়ে কিছু বন্দরের অনাগ্রহের কারণ এই দূষণ ও সীমিত স্থানীয় সুবিধা। হাজারো যাত্রী কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরে নামলেও তাঁদের আবাসন, খাদ্য ও বিনোদনের বড় অংশ জাহাজেই সারা হয়। ফলে স্থানীয় আয় কম হয়, অথচ যানজট, দূষণ, বর্জ্য ও বন্দর অবকাঠামোর ব্যয় বহন করতে হয় স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে।

কক্সবাজারে পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দেশের বৃহত্তম সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতি এখানেই গড়ে উঠেছে। হোটেল–মোটেল, খাবার ব্যবসা, পরিবহন, শুঁটকি, মাছ, ক্ষুদ্র দোকান, ফটোগ্রাফি ও নির্মাণ খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্ভরশীল। সড়ক উন্নয়ন ও ঢাকা–কক্সবাজার সরাসরি রেল চালু হওয়ায় ভ্রমণ সহজ ও সাশ্রয়ী হয়েছে। রেল ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়ে পরিবেশবান্ধব হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে অল্প সময়ে আরও বেশি পর্যটক পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি করেছে। যোগাযোগের এই উন্নতি গন্তব্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার সঙ্গে তাল মেলায়নি। ঈদ, পূজা, নববর্ষ বা দীর্ঘ ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটক অল্প দিনে সৈকত, শহরের সড়ক ও হোটেল এলাকায় ভিড় করেন। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের পর তিন দিনে আনুমানিক সাড়ে তিন লাখ পর্যটকের আগমনের পর বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ১৭৩ ব্যাগ বা ১ দশমিক ১ টনের বেশি বর্জ্য অপসারণ করা হয়। এমন অভিযান দরকারি হলেও স্থায়ী সমাধান নয়। উৎসবের পর পরিষ্কার করা প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা; টেকসই ব্যবস্থাপনা মানে বর্জ্য কমানো, উৎসে পৃথকীকরণ, নিয়মিত সংগ্রহ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায় নিশ্চিত করা।

সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানে জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অবশিষ্ট বর্জ্যের আলাদা পাত্র বাধ্যতামূলক করা দরকার। সৈকতের প্রবেশপথে পর্যাপ্ত বিন, নির্ধারিত সময়সূচিতে সংগ্রহ এবং ওজন ও তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বোতল ও ক্যানে ফেরতযোগ্য জামানত, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সীমিতকরণ এবং পুনর্ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংযোগ গড়া যেতে পারে। জৈব বর্জ্য কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাসে এবং পরিচ্ছন্ন শুকনো বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্রে পাঠানো গেলে ল্যান্ডফিলের চাপ কমবে। পর্যটনের সর্বোচ্চ মৌসুমে কক্সবাজার পৌর এলাকার দৈনিক বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, ফলে বিদ্যমান জনবল ও সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

পর্যটনের সাফল্য মাপতে শুধু মোট পর্যটক নয়, প্রতিজনের অবদান, অবস্থানের দৈর্ঘ্য, পরিবেশগত পদচিহ্ন এবং স্থানীয়দের প্রাপ্ত সুবিধা বিবেচনা করা দরকার। স্বল্প সময়ের বিপুল ভিড়ের বদলে দীর্ঘ সময় থাকা, স্থানীয় পণ্য ব্যবহার করা ও দায়িত্বশীল পর্যটক বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করেন। কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন, স্থানীয় গাইড, হোমস্টে, হস্তশিল্প ও গ্রামীণ–সাংস্কৃতিক গন্তব্য যুক্ত করলে আয় বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়াবে এবং চাপ কেবল লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলীতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না। এই ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় ধারণা পর্যটন ধারণক্ষমতা বা ক্যারিং ক্যাপাসিটি। প্রতিদিন ও প্রতি মৌসুমে কতজন এলে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, সড়ক, হাসপাতাল, উদ্ধারব্যবস্থা, সৈকত ও স্থানীয় জনজীবনে অসহনীয় চাপ পড়বে না, তার বৈজ্ঞানিক হিসাবই ধারণক্ষমতা। কক্সবাজার শহর, সৈকতের বিভিন্ন অংশ, হিমছড়ি, ইনানি, মেরিন ড্রাইভ ও দ্বীপাঞ্চলের জন্য আলাদা ধারণক্ষমতা নিরূপণ করতে হবে। স্বাভাবিক দিন, সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসবকাল ও দুর্যোগ মৌসুমের জন্য পৃথক সীমা ও পরিকল্পনা থাকা উচিত। ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে ব্যস্ত দিনে অনলাইন নিবন্ধন, হোটেল বুকিংয়ের সঙ্গে পরিবেশ ফি, নির্দিষ্ট সৈকত অংশে দৈনিক প্রবেশসীমা এবং নিয়ন্ত্রিত পার্কিং চালু করা যেতে পারে। সংগৃহীত অর্থ সাধারণ রাজস্বে হারিয়ে না গিয়ে সৈকত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, উদ্ধারসেবা, বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার ও স্থানীয়দের কল্যাণে ব্যয় হওয়া চাই। একই সঙ্গে হোটেল–রেস্তোরাঁর পানি ব্যবহার, পয়োবর্জ্য শোধন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মিত নিরীক্ষা জরুরি।

স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পর্যটননীতি টেকসই হয় না। জেলে, দোকানি, পরিবহনকর্মী, হোটেল ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা, পরিবেশবিদ, পৌরসভা, জেলা প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজকে সিদ্ধান্তে যুক্ত রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধির সুফল দৃশ্যমান হলে এবং পরিবেশগত ব্যয় ন্যায্যভাবে নিয়ন্ত্রিত হলে পর্যটনের প্রতি সামাজিক সমর্থনও স্থায়ী হবে। কক্সবাজারের লক্ষ্য তাই সীমাহীন জনসমাগম নয়, কাম্য পর্যটন। এমন ভারসাম্য, যেখানে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাড়ে, কিন্তু সৈকত বর্জ্যের স্তূপ হয় না; যোগাযোগ সহজ হয়, কিন্তু শহর অচল হয় না; হোটেল বাড়ে, কিন্তু স্থানীয়রা পানীয় জল হারায় না। পর্যটনের অর্থনৈতিক শক্তি টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সেই অর্থনীতির ভিত্তি–পরিচ্ছন্ন সৈকত, নিরাপদ পানি, সুস্থ পরিবেশ ও আতিথেয় স্থানীয় সমাজ–সংরক্ষণ করা।

লেখক: অতিরিক্ত সচিব (অব.)

পূর্ববর্তী নিবন্ধনিরাপদ সড়কের আন্দোলন দীর্ঘদিনের
পরবর্তী নিবন্ধহাওলা দরবার জিয়ারতে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী কাফেলা