নিরাপদ সড়কের আন্দোলন দীর্ঘদিনের

নাসের রহমান | বুধবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ

নিরাপদ সড়কের আন্দোলন শুরু হয় অনেক আগে। ২০১৮ সালে এ আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। আন্দোলনে ছাত্ররা যুক্ত হয়, সাধারণ মানুষ সমর্থন জোগায়। একসময় আন্দোলন বেশ জোরদার হয়। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে। সড়ক অবরোধ করে। যান চলাচলে বাধা দেয়। আন্দোলন আরও বেগবান হয়। চালক ও মালিক সমিতি এক হয়ে যায়। মালিকদের কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে হাত মেলায়। আন্দোলন বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে গতি হারায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জিত হয় না। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন সফল হয় না। যদিও নিরাপদ সড়ক চায় না, এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। মালিকপক্ষ, সরকার, এমনকি চালক সমিতিও চায় নিরাপদ সড়ক। সড়কে অব্যবস্থাপনা কেউ চায় না, বিশৃঙ্খলাও কেউ চায় না। চালকও চায় নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাতে, নিরাপদে যাত্রীদের পৌঁছে দিতে। গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ুক, এটা কেউ চায় না। তারপরও গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে যায়। প্রাণহানি ঘটে।

গত এক বছরে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তার চেয়ে বেশি মানুষ পঙ্গু হয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি আর কোথাও ঘটেনি। সেইফ সড়কের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিগত সাড়ে ছয় বছরে আট হাজারের অধিক শিশু সড়কে প্রাণ হারিয়েছে। যে হারে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া যায় না, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেনি, মানুষের মৃত্যু হয়নি। এতগুলো শিশুর প্রাণ যে অকালে ঝরে গেল, তার দায় কে নেবে? কেউ নিতে চায় না। দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যায়, পাশ কাটিয়ে যায়। সামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে পার পেয়ে যায়। এ জন্য সড়ক দুর্ঘটনা রোধ হয় না, কমে না, বরং বাড়তে থাকে। কীভাবে দুর্ঘটনা রোধ করা যায়, তার পরিকল্পনা কোথায়? পরিকল্পনা থাকলে বাস্তবায়ন নেই, প্রয়োগ নেই। যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা না থাকলে পরিকল্পনার সুফল পাওয়া যায় না। অব্যবস্থাপনায় দুর্ভোগ বাড়ে, দুর্ঘটনাও বেড়ে যায়। যা আর সহজে রোধ করা যায় না। অহরহ ঘটতে থাকে।

অনেক দিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর শুনতে শুনতে কান যেন সয়ে গিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এখন স্বাভাবিক ঘটনা। এসব মৃত্যুতে অনেকেই মর্মাহত হলেও কেউ আর বিচলিত হন না। পরিবার–পরিজনের ওপর আকস্মিক বজ্রপাতের মতো নেমে আসে এসব ঘটনা। এ মৃত্যুর শোক আর ক্ষতি আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। শোক একসময় কেটে গেলেও ক্ষতির বোঝা টানতে হয়। অনেক পরিবার ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দুর্দশা কোনোভাবে কাটিয়ে উঠতে পারে না। আয়–উপার্জনকারী মানুষটি যখন হারিয়ে যায়, তখন আর কিছুই ঠিক থাকে না। পরিবারের ভরণপোষণ ও ছেলে–মেয়ের লেখাপড়ার খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। কোনো কোনো পরিবারে ছেলে–মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তাদের আয়–রোজগারে নামতে হয়। কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে হয়। এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ থাকে না। আগে খেয়ে–দেয়ে বেঁচে থাকা, তারপর লেখাপড়া। অপরের সাহায্য–সহযোগিতায় বেশিদিন বেঁচে থাকা যায় না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত না হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যায় না। সড়ক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি–বিচ্যুতি থাকলে দুর্ঘটনা বাড়ে। সড়ক–মহাসড়ক, উড়ালসড়ক, হাইওয়ে, ফোর লেন, এলিভেটেড ওয়ে, এক্সপ্রেসওয়ে আরও অনেক নামের সড়ক রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফ্লাইওভার, উড়ালসেতু, লিংক রোড, অ্যাকসেস রোড, আরও কত কিছু। কিন্তু সড়কের ব্যাপকতা বাড়লেও সড়ক ব্যবস্থাপনা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। কেউ কেউ সড়ক ম্যানেজমেন্ট বলে থাকেন। আবার সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের অন্যতম মাধ্যম ট্রাফিক সিস্টেমও সেভাবে উন্নত হয়নি। ট্রাফিক সিস্টেম আধুনিক ও উন্নত না হলে সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরে আসে না। যান চলাচলে শৃঙ্খলা না থাকলে দুর্ঘটনা এড়ানো কখনো সম্ভব নয়। সড়কে বিশৃঙ্খলা থাকলে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা, আইন অমান্য করা, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, চালকের বেপরোয়া মনোভাব, ওভারটেক করার প্রবণতা, অন্য গাড়িকে সাইড না দেওয়া এবং চালকের অসাবধানতা। এ ছাড়া রাতে ঘুমঘুম চোখে বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো চালক দিনেও তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকেন। আবার গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ব্রেক ফেল করে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে যায়। চালক পুরোপুরি সচেতন হলে এসব দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটে বেশি। আবার যানবাহন রাস্তা থেকে খাদে পড়ে গেলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় শুধু যাত্রী নয়, গাড়ির চালক ও হেলপারও মারা যান। আহত অনেক যাত্রী চিকিৎসার অভাবে মারা যান। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া গেলে এত প্রাণহানি ঘটত না। আশপাশের হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকে না। দূরের হাসপাতালে নিতে নিতে অনেকেই মারা যান।

আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের প্রাপ্তি অনেক। অপ্রাপ্তিও কম নয়। বিভিন্ন দাবিদাওয়ার জন্য আন্দোলন হয়। সংস্কারের জন্য আন্দোলন হয়। পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন হয়। দাবিদাওয়ার কিছু পূরণ হলেও সংস্কার বা পরিবর্তন তেমন হয়নি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন বারবার বেগবান হলেও গণতান্ত্রিক ধারা প্রবর্তিত হয়নি। ন্যায্য কোনো কিছু আদায়ের জন্য মানুষকে আন্দোলনে নামতে হয়। নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করতে হয়। সড়কে–মহাসড়কে নিরাপত্তা নেই। শহরে–বন্দরে, গ্রামে–গঞ্জে কোথাও নিরাপত্তা নেই। সবখানে মানুষ নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। রাস্তাঘাট মোটেই নিরাপদ নয়। আর সড়ক দুর্ঘটনা তো লেগেই আছে। দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এর কোনো প্রতিকার নেই। তীব্র আন্দোলনও রোধ করতে পারছে না। কোথায় যেন শুভঙ্করের ফাঁকির মতো আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়েও দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। ব্যর্থতার দায়ভার কেউ নিতে চায় না। সড়ক আর নিরাপদ হয় না। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন থেমে থেমে এগিয়ে চলে।

২২ শে অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হয়েছে। এই দিনেও সড়ক নিরাপদ থাকেনি। সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে, প্রাণহানি হয়েছে। সরকারিভাবে এ দিবস পালিত হয়। বেসরকারিভাবেও অনেক উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। মূলত সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য এ দিবসটি পালন করা হয়। সড়কে দুর্ঘটনা এড়ানো এর মূল লক্ষ্য। এ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় অতিরিক্ত গতি পরিহার করুন, ট্রাফিক আইন মেনে চলুন, সড়ক নিরাপত্তায় সচেতন হোন।’ চালকরা প্রতিপাদ্যের এসব নির্দেশনা মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পায়। প্রতিপাদ্যের প্রথম দুটি বাক্য গাড়ির চালকের জন্য প্রযোজ্য। পরের বাক্যটিড ‘সড়ক নিরাপত্তায় সচেতন হোন’–ড্রাইভার ও সাধারণ মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সড়কের নিরাপত্তা সবাই চায়। এ জন্য সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তবে এ সচেতনতার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষেরও, যারা সড়ক ব্যবস্থাপনায় জড়িত। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং ট্রাফিক বিভাগ। ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প’–এর কাজ শুধু প্রচার করা নয়, সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও পালন করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ। তাহলে জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসামাজিক সমপ্রীতি প্রয়োজন
পরবর্তী নিবন্ধঅতিপর্যটনের চাপে কক্সবাজার : সৈকত বাঁচাতে এখনই সচেতন হতে হবে