একটা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ভেতরে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ বেড়ে উঠছে। শুনলে মনে হয় কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার দৃশ্য। অথচ ব্যাপারটা সত্যি। একটি গবেষণায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সার্জিউ পাশকারের দল ঠিক এটাই করে দেখিয়েছে। তাঁরা দেখতে চেয়েছিলেন, মানুষের কোষ অন্য একটি প্রাণীর মাথায় বসানো হলে সেগুলো কীভাবে বাড়ে, কীভাবে টিকে থাকে, আর সেই প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে কতটা জুড়তে পারে।
আগেই একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। ইঁদুরকে মানুষের মতো করে তোলা এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল না। গবেষকেরা চেয়েছিলেন এমন একটা জীবন্ত মডেল, যেখানে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ একটা সত্যিকারের শরীরের ভেতরে কেমন আচরণ করে, তা কাছ থেকে দেখা যায়। তাহলে মস্তিষ্কের রোগগুলো বোঝা সহজ হবে।
পরীক্ষাটা সাজানো হয়েছিল এভাবে। বিজ্ঞানীরা বেছে নিলেন কিছু নবজাতক ইঁদুর, যাদের মস্তিষ্কের দুটি অংশ, সেরিব্রাল কর্টেক্স আর হিপোক্যাম্পাস, ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। মানুষের ক্ষেত্রেও এই দুটি অংশ খুব জরুরি। আমরা যে ভাবি, শিখি, কিছু মনে রাখি, তার অনেকটাই এদের ওপর নির্ভর করে। এরপর ল্যাবে তৈরি মানব মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র টিস্যু, যাকে বলে অর্গানয়েড, ইঁদুরের মস্তিষ্কে বসানো হলো। একবারে দেওয়া হলো প্রায় এক লাখ কোষ। কয়েক দফায় মোট প্রায় ৪০ লাখ মানব কোষ যুক্ত করা হয়েছিল। তারপর শুরু হলো অপেক্ষা।
তিন মাস পরে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখা গেল, মানব টিস্যু শুধু টিকে নেই, বেশ ভালোই বেড়েছে। ইঁদুরের রক্তনালির সঙ্গেও সেটা জুড়ে গেছে, অর্থাৎ অক্সিজেন আর পুষ্টি পাচ্ছে ইঁদুরের রক্ত থেকেই। একসময় ইঁদুরের মস্তিষ্কের প্রায় অর্ধেক জায়গা এই মানব টিস্যুর দখলে চলে গিয়েছিল।
জায়গা দখলই শেষ কথা ছিল না। কিছু মানব নিউরন ইঁদুরের নিজের মস্তিষ্ককোষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলেছে, এমনকি মেরুরজ্জুর কোষের সঙ্গেও। মানে, বাইরে থেকে আসা কোষগুলো আলাদা হয়ে পড়ে থাকেনি, নতুন জায়গায় নিজেদের মতো করে যোগাযোগের পথ খুঁজে নিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, ইঁদুরগুলো কি তাহলে মানুষের মতো বুদ্ধিমান হয়ে উঠল? উত্তর, না। ইঁদুরগুলো হঠাৎ মানুষের মতো আচরণ করেনি, বুদ্ধিও নাটকীয়ভাবে বাড়েনি। গবেষকেরা বরং দেখেছেন, কিছু ক্ষেত্রে তাদের টলমলে হাঁটা আর স্মৃতির সমস্যায় সামান্য উন্নতি হয়েছে। আর এই ফলটাই গবেষণাটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে, কারণ বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য কোনো ‘মানব–ইঁদুর’ বানানো ছিল না। তাঁরা জানতে চান, রোগ বা প্রতিকূল অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্কের কোষ কেমন আচরণ করে।
একটা পরীক্ষায় সেটা বেশ স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ইঁদুরগুলোকে কম অক্সিজেনের মধ্যে রাখা হলো। দেখা গেল, মানব স্নায়ুকোষগুলোও অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জন্মের সময় শিশুর মস্তিষ্কে যথেষ্ট অক্সিজেন না পৌঁছালে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সেরিব্রাল পালসির মতো নানা জটিলতার সঙ্গে এর যোগ আছে।
মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার একটা বড় বাধা হলো, সেটাকে তো সরাসরি পরীক্ষার কাজে লাগানো যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা অনেক সময় অর্গানয়েডের ওপর ভরসা করেন। কিন্তু অর্গানয়েড যত উন্নতই হোক, সেটা পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত শরীর নয়। সেখানে রক্তপ্রবাহ নেই, পুরো স্নায়ুতন্ত্র নেই, শরীরের অন্য অঙ্গের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগও নেই। জীবন্ত ইঁদুরের ভেতরে মানব টিস্যু বাড়তে দেখা গেলে এই সীমাবদ্ধতার কিছুটা কাটতে পারে।
আশা করা যায়, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিতে আলঝেইমারস, পারকিনসনস, স্ট্রোক বা মৃগীর মতো স্নায়বিক রোগ আরও ভালো করে বোঝা যাবে। কোনো ওষুধ মানুষের মস্তিষ্কের কোষে ঠিক কীভাবে কাজ করে, বা কোনো রোগে কোষগুলো কেন নষ্ট হয়, সেসব প্রশ্নের উত্তরও হয়তো আরও পরিষ্কার হবে।
তবে এর সঙ্গেই একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। মানুষের মস্তিষ্কের কোষ একটা প্রাণীর মাথায় কতটা পর্যন্ত ব্যবহার করা ঠিক? ভবিষ্যতে যদি আরও অনেক বেশি মানব কোষ বসানো হয়, তাহলে কি সেই প্রাণীর আচরণ বা অনুভূতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে? তার চেতনাও কি বদলে যেতে পারে?
এই গবেষণায় ইঁদুরগুলো মানুষের মতো চেতনা পেয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু গবেষণা যত এগোবে, প্রশ্নটা তত জরুরি হবে। মানুষের অসুখ সারানোর পথ খুঁজতে গেলে গবেষণা চালাতেই হবে, সেটা স্বাভাবিক। তবে সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে, প্রাণীর কষ্ট কতটা কমানো গেল, গবেষণাটা সত্যিই কতটা প্রয়োজনীয়, আর মানব মস্তিষ্কের টিস্যু ব্যবহারের সীমা কোথায় টানা হবে। তাই ইঁদুরের মাথায় মানুষের কোষ বেড়ে ওঠার এই খবরকে শুধু একটা চমকপ্রদ পরীক্ষার গল্প বলে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এর ভেতর ভবিষ্যৎ চিকিৎসার আশা আছে, আবার কিছু কঠিন প্রশ্নও আছে। মানুষের মস্তিষ্ক বুঝতে আমরা কতদূর যেতে পারি, সেটা হয়তো বিজ্ঞান একদিন বের করে ফেলবে। কিন্তু তার আগে ঠিক করতে হবে, জানার জন্য কতদূর যাওয়া উচিত।








