উপহার

মানিক দেবনাথ | বুধবার , ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

বাড়িতে একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটে গেল! ঘটে যাওয়া বিষয়টি জানাতে বাবা–মাকে ডাকলো জুজুলী। তারা দেখে হতবাগ! এটা কি করে সম্ভব! ঘরের সব দরজা–জানালা বন্ধ। তবে তারা কি ভাবে ঘরে মধ্যে প্রবেশ করলো? কোন প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পাওয়া গেল না। তবুও ফিরে পাবার আনন্দে মেয়েকে জড়িয়ে অনন্দে কাঁদলেন বাবা। কিন্তু মেয়েটি ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে মহাখুশি! যারা ঘটিয়েছে তাদের মনে মনে ধন্যবাদ ও দেয় জুজুলী ।

জানালার বাহিরে চোখ ফেলতেই ফুলের বাগান। এখানে প্রতিদিন রঙ–বেরঙের ফুল ফুটে। রোজ নানা বর্ণের প্রজাপতিও ফুল থেকে মধু খেতে আসে । প্রজাপতির দল তিড়িং–বিড়িং নেচে নেচে এ ফুল থেকে ও ফুলে যায় । জুজুলী তখন জানালার বাহিরে হাত বের করে প্রজাপতিদের ছুঁতে চায়। প্রকৃতির এমন রূপ দেখে খুশিতে খিল খিল করে আপন মনে হাঁসে মেয়েটি। মাঝে–মধ্যে দুই একটা দলছুট প্রজাপতি জুজুলী’র রুমে প্রবেশ করে এখানে–ওখানে বসে। সে তখনি তাদের একটু ধরতে যায়। উমাঃ জুজুলী কে দেখে ফুঁড়ুৎ করে উড়ে যায়! মা যখন বকুনি দেয় বা জুজুলী’র খুব মন খারাপ হয় তখন সে প্রজাপতিদের সাথে আপন মনে কথা বলে। কিন্তু প্রজাপতির দল তার কথার উত্তর না দিয়ে কেবল মধু খেয়ে যায়! এতেই জুজুলী’র খুব দুঃখ হয়। রাগ হয়। জেদ হয়। কারন জুজুলী প্রজাপতিদের বন্ধু ভাবে। বন্ধু যদি বন্ধুর কথার উত্তর না দেয় তাহলে মন খারাপ হবার–ই কথা। জুজুলী এদিন রেগে গিয়ে একটা সিদ্ধার্থ নেয়। বাগান থেকে সব প্রজাপতি তাড়াতে হবে। কারণ তারা জুজুলীর কথা শুনে না।

একদিন জুজুলী ঘুম থেকে জেগে দেখে কোন এক ভিন দেশে চলে এসেছে! ফুলে সজ্জিত পালংকে শুয়ে আছে। তড়িগড়ি উঠে দাঁড়ালো সে। দেখলো কত সুন্দর দেশ ! ফুলে–ফলে ভরা দেশ। যে দিকে চোখ যায় শুধু রঙির আর রঙিন। তবে কখন কিভাবে এখানে এলো বুঝতে পারলোনা জুজুলী। বুঝবে বা কি করে? সে যে ঘুমে ছিল। এদিকে বাগানের সেই প্রজাপতি গুলো তার পিছু পিছু এখান অব্দি এসে হাজির! তারা ঝাঁক বেঁধে জুজুলীর সামনে সামনে উড়ছে। এ প্রথম ওরা যেন কিছু একটা বলতে চায় জুজুলীকে। মেয়েটি অবাক! বলতে চাওয়া কথাগুলো কান অবদী ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে ভেসে আসছে । তবে পরিস্কার বুঝা যায় না। ভয়ে–আতঙ্কে ভেঙ্গে পড়লো জুজুলী। এমন সময় বাবা–মা’র কথা খুব মনে পড়ে যায়। দেখতে না দেখতে প্রজাপ্রতি গুলো একসাথে মিলিত হয়ে সাদা ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে ফেলে। তারপর সেই কুন্ডলী থেকে এক এক করে বেরিয়ে এলো লাল পরী, নীল পরী, সাদা পরী।

সাদা পরী এসে তার হাতের চকচকে জাদুর কাঠি জুজুলীর মাথায় ছুঁয়ে দেয় । সাথে সাথে জুজুলী বাবা–মা’র ও ভয় পাওয়ার কথা ভুলে যায়। এ যেন এক ম্যাজিক! এখন মনে হয় কতদিন জুজুলী পরীদের সাথে পরীর দেশে ছিল।

পরীর রানী অতিথিকে তার রাজপ্রসাদে নিয়ে যায়। ততক্ষনে জুজুলীর জন্য চলছে মহা আয়োজন! পরীরা প্রথমে তাকে ফুল ছিটিয়ে বরন করলো। তারপর নানান পদের খাওয়ার খেতে দিল। আবার কেউ কেউ নাচ গান করে জুজুলী কে আনন্দ দিতে থাকলো। এমন সব আয়োজন দেখে মেয়েটির মন ভরে যায়। অল্পকিছুক্ষনের মধ্যে পরীগুলো তার আপন হলে যায় । জুজুলী যেমনি দেখেছে তার বইয়ের পাতায় পরীর গল্পে । পরী গুলো ঠিক তেমনি দেখতে। না হলে জুজুলী বুঝতে পারতো না এগুলো পরী না অন্য কিছ ু। এদের মধ্যে ধব ধবে সাদা পরীটা হলো পরীর দেশের রাণী। পরীর রানী উপস্থিত গন্যমান্য পরীদের সামনে এবার গড় গড় করে জুজুলীর মনের সব কথা বলতে লাগলো। পরীর রাণী বললো আমরা তোমার বলা কথা শুনতাম । আমরা পরিকল্পনা করি এবং মনুষ্যলোক থেকে আমাদের দেশে নিয়ে এসেছি। যাতে তুমি বিশ্বাস করতে পারো আমরা তোমার বন্ধু। তাই আজ তোমার মনের চাওয়া আমরা বন্ধু হয়ে পূরণ করে দিবো। পরীর কথা শুনে জুজুলী খুব খুশি হয়। এবার তার প্রশ্ন হলো এত ফুলে–ফলে ভরা কত সুন্দর পরীর দেশ রেখে পরীরা কেন তাদের বাগানে মধু খেতে আসে? তখন বৃদ্ধ এক পরী বলো উঠলো মধু পরীদের প্রিয় খাবার। পরীরদেশে ফুলে মধু হয় না তাই পরীরা মনুষ্য বাগানে মধু খেতে যায়। এরপর সাদা পরী এক সময় বলে উঠলো,এবার চোখ বন্ধ করো দেখি জুজুলী? ফের যখন বলবো তখনি কেবল চোখ খুলবে। কিন্তু এর মাঝে যদি চোখ খোলো তাহলে তোমার বিপদ ঘটবে। জুজুলী ও কিছু না বুঝে চোখ বন্ধ করলো। এ সময় কানের পাশ দিয়ে শো শো বাতাস বয়ে যাওয়া টের পেল। অনেক ক্ষন পর পরীর রানী চোখ খুলতে বলল। জুজুলী চোখ খুলতেই অবাক! সে কি? দেখে তার বিছনায় শুয়ে আছে! তবে এতক্ষন যা হলো তা কেবল কি স্বপ্ন ছিল? উমাঃ ওপাশ ফিরে দেখে ভিরমি খাওয়ার অবস্থা! বিছানায় বড় একটা গিফ্‌ট বক্স। সেই উপহার সামগ্রীর সাথে একটা চিরকুট পাওয়া গেল। তাতে লেখা– জুজুলীর বন্ধুদের জন্য পরী রানীর দুর্গাপূজার উপহার! চিরকুট পড়া শেষ হতে–ই লেখা গুলো নিজ থেকে মুছে যায়!

এবার বুঝলো যা ঘটেছে সব সত্যি! জুজুলী উপহার সামগ্রী দেখে মহাখুশি! এখন সে বন্ধুদের নতুন জামা–জুতো দিতে পারবে। বাগানে তাকিয়ে দেখে আজ একটি প্রজাপতিও নেই! জুজুলী যখন রোজ আপন মনে প্রজাপতির সাথে কথা বলতো তখন তাদের থেকে কিছু জিনিস চাইতো। প্রজাপতিদের বলতো– প্রজাপতি ও প্রজাপতি আমাকে কয়টা নতুন জামা–নতুন জুতো দিবে ? আমার বন্ধু অগ্নি,রঙ,পূজা শ্রেয়াস–কে এবার উপহার দিবো । আমার বন্ধুরা ঐ বস্তিতে থাকে। তারা কোনদিন পূজায় নতুন জামা–জুতো পড়তে পারেনি! তাই বন্ধুদের মনে অনেক দুঃখ! তবে আমার জন্য নয় বন্ধুর জন্য উপহার দাও প্রজাপ্রতি। বাবাকে বলেছি, বাবা বলেছে বস্তির ছেলেদের সাথে মিশবে না। তোমাকে ওদের কথা ভাবতে হবে না। কিন্তু আমিতো তাদের সাথে স্কুলে পড়ি? খেলাধুলা করি। একসাথে গল্প করি। ওরা যে আমার বন্ধু! ওদের দুঃখ গুলো আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমার কষ্ট দুর করে দাও প্রজাপ্রতি। বন্ধুদের মুখে হাঁসি ফুটিয়ে দাও প্লিজ!

প্রজাপ্রতি বা পরীরা জুজুলীর কথা শুনেছে। তার চাওয়া পুরন করেছে। এ খবরে জুজুলীর বন্ধুদের মাঝে আনন্দের বন্য বয়ে গেল। পাড়া প্রতিবেশীরা পরীর দেয়া উপহার সামগ্রী দেখতে ভীড় করতে থাকলো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচোখ জুড়িয়ে যায়
পরবর্তী নিবন্ধইঁদুরের মস্তিষ্কে মানব কোষ