
‘উল্টো থেকে,’ ‘উলটো থেকে সোজা‘। দুটি বইয়ের নাম। প্রথমটির প্রথম প্রকাশ ১৪ এপ্রিল ১৯৮৯ সালে, আজ থেকে ৩৭ বছর আগে। এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়েছে গেল বছর (২০২৫) ফেব্রুয়ারি মাসে। দ্বিতীয় গ্রন্থটি বের হয়েছে এই বছরের (২০২৬) জুন মাসে। গ্রন্থের নাম দেখেই পাঠক সহজে অনুমান করতে পারেন যে, উভয় গ্রন্থের লেখক একজনই। তিনি এম এ মালেক, একুশে পদক প্রাপ্ত বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং দৈনিক আজাদী সম্পাদক। দুটি গ্রন্থই আমার দখলে আছে। আমার সৌভাগ্য যে সে ‘দখলদারিত্ব‘ পেয়েছি খোদ লেখকের কাছ থেকে। কেবল দখলদারিত্ব এবং পাঠাধিকারিত্ব। স্বত্ব বা স্বত্বধারিত্ব নয়। প্রথমটি পেয়েছিলাম গেল বছর তার বাসভবনে। দ্বিতীয়টিও সেখানে, সপ্তাহ কয়েক আগে। দেশে কাজে কিংবা বেড়াতে গেলে শহরের মাঝে গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে ওঠা তার দৃষ্টিনন্দন বাড়িটিতে নিদেনপক্ষে একবার যাওয়া হয়। গেইট পেরিয়ে গাড়ি বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে পিছু ফেলে যায় দু–পাশে সারিবদ্ধ নাম জানা–অজানা গাছ–গাছালি, হাতের ডানদিকে পুকুর, তার পাশে গ্যারাজ, তাতে চার–পাঁচটি গাড়ি, সেদিকটায় রয়েছে নারকেল থেকে শুরু করে নানা জাতের ফলের চাষাবাদ, কাঁচা মরিচ পর্যন্ত। বাড়ির একেবারে প্রবেশমুখে দেয়ালে কাচের ফ্রেমে টাঙানো একটি লেখা: ‘এই ঘর যদি কথা বলতে পারতো তাহলে আপনাকে বলতো আইয়ুনযে স্বাগতম। তার নিচে ইংরেজিতে লেখা ‘ওয়েলকাম‘। ছোট্ট কথা, কিন্তু কী গভীর ও অর্থবহ। ঘর তো নয়, স্বাগতম জানাচ্ছেন ঘরের কর্তা। গৃহ প্রবেশের মুখে, গাড়ি বারান্দায় টাঙিয়ে রাখা এই শব্দগুলি গৃহকর্তার অতিথিপরায়ণতার কথাই বুঝি মনে করিয়ে দেয়। যারা এম এ মালেকের এই গৃহে প্রবেশ করেছেন কেবল তারাই জানেন, সেখানে প্রবেশ–করা মানে জম্পেশ আড্ডার সাথে আক্ষরিক অর্থে টেবিল–ভর্তি নানা পদের খাবার– আচার থেকে শুরু করে নানা ধরনের ‘ডেজার্ট‘। কয়েক ধরনের মাছ মাংস, গলদা চিংড়ি ইত্যাদির কথা বাদই দিলাম। এমন খাবার অন্য কোথায়ও যে জোটে না তা নয়। কিন্তু পার্থক্য– এই বাড়ির টেবিলে যা দেখবেন তার সবটাই এই বাড়ির। একেবারে নির্ভেজাল। পুকুরের মাছ থেকে শুরু করে নিজ গাছের নানা ফলের আঁচার, জুস্ ইত্যাদি। খাওয়া শেষে ফেরার পথে গৃহকর্ত্রীর (কামরুন মালেক ভাবি) দেয়া আচার ভর্তি বোতল ফি–বছর আসে সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে হল্যান্ডের ডাইনিং টেবিলে। গাড়ির হর্নের শব্দে গৃহকর্তার সদর–দরোজা আগামীতে আর কতদিন খোলা হবে জানিনে, তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে কপাট এখনো বন্ধ হয়নি। আর নেহায়েত তেমনটি যদি কখনো হয়, তবে বাইরে দাঁড়িয়ে গেয়ে উঠতে হবে– ‘খোল খোল দ্বার, রাখিয়ো না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে ..”। তাতে যদি গৃহকর্তার মন গলে।
লেখা শুরু করেছিলাম বইয়ের কথা দিয়ে। গেল বছর লেখকের হাত থেকে গ্রহণ করেছিলাম, ‘উল্টো থেকে‘ বইটি। এবার পেলাম ‘উল্টো থেকে সোজা‘। খোদ লেখকের হাত থেকে অটোগ্রাফ সহ বই পাবার আলাদা আনন্দ, আলাদা ভালো লাগা থাকে। একথা ও–কথার ফাঁকে মালেক ভাই বললেন, ‘আপনাকে আমার বইটা কি দিয়েছি?’ বললাম, গেলবার ‘উল্টা থেকে‘ পেয়েছি। না, এবারেরটা ‘উল্টো থেকে সোজা‘, তাঁর উত্তর। শুনে ভাবলাম উনি দুষ্টুুমি করছেন। কেননা উনি এমনতর দুষ্টুুমি প্রায় সময় করে থাকেন। তার স্বাভাবিক কথাবার্তায়ও সুযোগ পেলে তিনি ‘উইটি‘ মন্তব্য করেন। উঠে ঘরের ভেতর গেলেন। ক্ষণিক বাদে হাতে দুটি বই নিয়ে এলেন। আমাকে একটি গছিয়ে দিতে চাইলে বলি, ‘এভাবে তো নিতে পারিনে।‘ লেখকের কিছু লেখা চাই‘। কলম বাড়িয়ে দেই। বইটি হাতে নিয়ে মুহূর্ত ভাবলেন, তারপর মাথা নিচু করে লিখে বইটি আমায় দিলেন। খুলে দেখি তাতে লেখক এম এ মালেক লিখেছেন, ”বিকাশ– সব চাইতে সহজ হল বিকাশে (আন্ডারলাইন করেছেন তিনি) টাকা পাঠানো। হল্যান্ড থেকে কিছু টাকা পাঠালে খুশি হবো। জীবন উপভোগ করুন। তারপর তার সই ও তারিখ ২৮/৯/২৬”। এখানেও তার রসবোধের প্রকাশ।
দেশে গেলে প্রেস ক্লাবের নিচে ‘বাতিঘর‘ যাওয়া চাই। দুটো কারণে। এক, কিছু পছন্দের বই কেনা, নুতন কোন বই এসেছে কিনা তা দেখা; দুই, পরিবেশটা ভালো লাগে। মোবাইল যখন আমাদের সবাইকে নেশাগ্রস্ত করে তুলেছে সে সময় যে কিছু শিক্ষার্থী বাতিঘরে যায়, মোবাইল পাশে রেখে বই ঘাঁটাঘাঁটি করে তা দেখে ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের কয়েকটা বই কেনা হয়। যাই হোক– হল্যান্ড ফিরে এসে দেশ থেকে আনা সব বইগুলির মধ্যে ‘উল্টো থেকে সোজা‘ আমায় টানলো প্রথমে। এক মাস পর দেশ থেকে ফিরেছি। অনেক কাজ জমা হয়ে আছে। তারই ফাঁক–ফোঁকরে পড়া শুরু করলাম ‘উল্টো থেকে সোজা‘। লেখক ভূমিকা ‘সামান্য কথা‘-য় সোজাসাপ্টা বলেছেন– ‘আমি চেষ্টা করি সহজ কথায় নিজের ভাবনাকে তুলে ধরতে‘। আমরা জানি সহজ কথায় লেখা কিংবা নিজের ভাবনাকে তুলে ধরা অনেক কঠিন। এই সহজ করে লেখা প্রসঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের ৩ ভাদ্রে, শান্তিনিকেতনে (খাপছাড়া গ্রন্থে) লিখেছিলেন– ”সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে,/ সহজ কথা যায় না লেখা সহজে / লেখার কথা মাথায় যদি জোটে/ তখন আমি লিখতে পারি হয়তো। / কঠিন লেখা নয়কো কঠিন মোটে,/ যা–তা লেখা তেমন সহজ নয় তো।” এম এ মালেকের ‘উল্টো থেকে সোজা‘ বইটিতে সাহিত্যের কচকচানি নেই। আছে অতি সহজ ভাষায় মনের ভাবের প্রকাশ। তাতে পাঠকের সাথে লেখকের একটি অতি সহজ মেলবন্ধন তৈরি হয়। লেখকের সার্থকতা তখনই যখন তিনি তার পাঠকের সাথে একটি যোগসূত্র তৈরি করতে সক্ষম হন। যখন তার লেখা পাঠককে ধরে রাখতে পারে। যখন পাঠক মনে মনে বলে উঠেন, আরে, এ যে আমার কথা। যেমনটি আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। বইটি (উল্টো থেকে সোজা) পড়তে গিয়ে আমার অনেক স্থানে মনে হয়েছে, এতো আমার মনের কথা। এই কথা তো আমিও মনে মনে ধারণ করি। যেমন এম এ মালেক ‘মানুষ তার প্রত্যাশার সমান গরিব” প্রবন্ধে লিখেছেন– ”মানুষ এমন এক প্রাণী– তার যত হয়, চাওয়া তত বাড়ে। বাড়তেই থাকে। যে মুহূর্ত থেকে আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে প্রত্যাশার পাল্লা ভারী হতে শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আমরা মানসিকভাবে গরিব হতে শুরু করি। যতটুকু প্রত্যাশা, ততটুকু গরিব– প্রত্যাশার সমান গরিব।” কত সত্য কথা। আমরা সবাই হয়তো তা জানি। কিন্তু তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করিনা। লেখক যথার্থই বলেছেন– ”আমি বিশ্বাস করি, সুখ মানে আমি যা পছন্দ করি তা পাওয়া নয়, বরং আমি যা পেয়েছি তা পছন্দ করা।”
এম এ মালেকের লেখার বড় গুণ হলো, পাঠককে ধরে রাখার সক্ষমতা, সে কথা ইতিমধ্যে বলেছি। তার আর একটি লেখা, ‘ডিসি ওবায়দুল্লাহ খান ও আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স‘। তার গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া প্রসঙ্গে যে ঘটনার উল্লেখ আছে এই প্রবন্ধে, তার সাথে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবার ঘটনা অনেকটা হুবহু মিলে গেছে। তিনি লিখেছেন চট্টগ্রামের ডিসি ওবায়দুল্লাহ খান একদিন তার (ডিসি) অফিসে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইলেন, তিনি ড্রাইভিং জানেন কিনা। উত্তরে তিনি বললেন, ‘না, এখনো ড্রাইভিং শিখিনি।‘ একথা শুনে ডিসি সাহেব মোটর ভেহিকেল বিভাগের প্রধানকে ডেকে তার পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘মালেক সাহেবকে একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে দিন।‘ ভদ্রলোক অবাক। একটু বাদে ফিরে এলেন ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে। এরপর উনি ড্রাইভিং শিখলেন এবং ৫০ বছরেরও বেশি সময় গাড়ি চালালেও কোন দুর্ঘটনা ঘটাননি বলে লিখলেন। এবার আসি আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ঘটনায়। ১৯৯০ সালের প্রথম দিককার কথা। তখন ঢাকায় বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে কাজ করছি। চট্টগ্রাম ছেড়েছি তার বছর সাতেক আগে। থাকি সবুজবাগ। মতিঝিলে থাকতেন আমার এক বন্ধু, জাদুকর উলফাৎ কবির। তার স্ত্রী রুখসানা কবির। দুজনেই জাদু দেখাতেন। তারা বাংলাদেশের প্রথম জাদুকর দম্পতি হিসাবে বেশ পরিচিত ও খ্যাত। বন্ধু উলফাৎ কবির ‘ভেপসা‘ চালাতেন। মাঝে মধ্যে আমি তার পেছনে সওয়ার হয়েছি। আমার একমাত্র বাহন রিক্সা, টেক্সি কিংবা দূরের পথে মিনিবাস। এর বাইরে অফিসের গাড়ি। ইতিমধ্যে, আমার হল্যান্ড চলে আসার সব ঠিকঠাক। হল্যান্ড থেকে শ্বশুর পরামর্শ দিলেন আসার আগে যেন অবশ্যই ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে নিয়ে আসি। উলফাৎ কবির সহ এক সকালে ভর্তি হলাম নটরডাম কলেজের সামনে ঠিক রাস্তার পাশে এক ড্রাইভিং স্কুলে। এরই ফাঁকে তুই–তোকারি পুলিশ বন্ধু হাসানকে ফোন করি। বলি, দোস্ত আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স দরকার। হাসান তখন ঢাকায় এসিস্টেন্ট কমিশনার ট্রাফিক। তার সাথে পরিচয় চাটগাঁ সাংবাদিকতা করার সময় থেকে। সে বলে, অফিসে চলে আয়। এক সকালে তার উত্তরা অফিসে পৌঁছুলাম। চা খেতে খেতে আসার উদ্দেশ্য জানালে, সে টেবিলের উপর রাখা কলিং বেলে চাপ দেয়। পিয়ন গোছের একজন আসতেই হাসান বলে, ড্রাইভিং লাইসেন্স যিনি দেখেন তাকে আসতে বলো। উর্দি পড়া এক অধস্তন কর্মকর্তা এলে আমাকে দেখিয়ে হাসান তাকে বলে, ওনার ডাইভিং লাইসেন্স দরকার, বানিয়ে দিন। ভদ্রলোক আমার কাছে ড্রাইভিং স্কুলের সার্টিফিকেট চাইলে হাসান নির্লিপ্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে বলে, ওসব আমি দেখবো, আপনি ওনার লাইসেন্সটা রেডি করে নিয়ে আসেন। ভদ্রলোক একবার হাসানের দিকে আর একবার আমার দিকে তাকিয়ে আমার হাতে ধরা আমার পাসপোর্ট সাইজের ফটো এবং বাংলাদেশ সরকার থেকে দেয়া সাংবাদিক হিসাবে এক্রেডিশন কার্ড নিয়ে চলে গেলেন। ফিরে এলেন মিনিট বিশেকের মধ্যে, হাতে আমার জন্যে দুটো লাইসেন্স। একটি দেশের জন্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স, আর একটি ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স। হল্যান্ড আসার ঠিক এক বছরের মাথায় গাড়ি কিনলাম। সেই থেকে গত ৩৫ বছর ধরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি, হল্যান্ড এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। মালেক ভাই, কামরুন ভাবি সহ আমার গাড়িতে বেড়িয়েছি হল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের বিভিন্ন স্থানে। এখনো কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। ঠিক মালেক ভাইয়ের মতো। মালেক ভাই এই জীবনে ৫০ বছর গাড়ি চালিয়েছেন। কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনি অনেক গাড়ি পরিবর্তন করেছেন। এখানে তার সাথে আমার অমিল। আমি গাড়ি পরিবর্তন করেছি ৬টি। তবে তার সাথে একটা জায়গায় বেশ মিল। বউ আমাদের দুজনের এখনো একটাই রয়ে গেছে। তাতে ধারণা করি, উভয়ের কোনো খেদ নেই। (০৭–১০–২০২৬)।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।











