আজ ১০ই আক্টোবর। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ দিবসটি প্রথম উদযাপিত হয় ১৯৯২ সালে। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন প্রথম এ দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেয় এবং ঐ সংস্থা বিশ্বের ১৫০টি দেশের সাথে যোগাযোগ করে। মূলত সচেতনতার উদ্দেশ্যেই এবং সকলকে একত্রে আনার লক্ষ্যেই ১৯৯২ সালের ১০ই অক্টোবর এ দিবস পালন করা হয়। তবে প্রথম প্রতিপাদ্য বিষয় শুরু হয় ১৯৯৪ সাল থেকে। প্রথম প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল– “Improving the Quality of mental Health services throughout the world”– সারাবিশ্বের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার উন্নতিকরণ। ২০২৬ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে: “Lived Experiences heard: Real voices, real changes”- অর্থাৎ জীবনের অভিজ্ঞতার কণ্ঠস্বর শুনি প্রকৃত পরিবর্তনের মাধ্যমে। এ দিবসে এমন একটি সার্থক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে যেখানে মানসিক রোগে আক্রান্ত সকল বয়সের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা, তাদের জীবনধারণ, সুখ–দুঃখ প্রকাশ করবে এবং নীতি নির্ধারকরা এ সমস্ত অনুভূতিগুলো অনুধাবন করবে এবং যে কোন জাতীয় পদক্ষেপ রোগীদের অনুকূলে যাবে। যে কোন সেবা বা চিকিৎসা রোগীর কল্যাণমুখী হবে।
জীবনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে– মানসিক রোগে আক্রান্ত শিশু থেকে কিশোর কিংবা বয়স্ক লোকেরা, লিঙ্গ ভেদে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা, কুসংস্কার সম্পর্কে সাধারণ জনগণ অনুধাবণ করবে। সহমর্মিতা প্রকাশ করবে প্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করবে। মানসিক রোগীদেরও অনেক গল্প থাকতে পারে যা সমাজের অনেক রীতিনীতি আচরণে উঠে আসতে পারে পরবর্তীতে যা নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে এবং সকল রোগীর উন্নতিকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা কেবল কয়েকটি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক যা বাংলাদেশের বড় বড় শহরে অবস্থিত। এ সমস্ত হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র দেখলে বুঝতে পারবেন যে কি বিপুল পরিমাণ রোগী ঐ সমস্ত হাসপাতালে ভিড় করে এবং অনেক অর্থ ও সময় ব্যয় করে চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। হাসপাতালে রয়েছে প্রয়োজনীয় ঔষধের অপ্রতুলতা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা মনোবিজ্ঞানীর অভাব। তাই বাংলাদেশের সকল স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক মানসিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে হলে এ সেবা গুটি কয়েক হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান থেকে বিকেন্দ্রীকরণ করে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এ সেবা বিস্তৃত করতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা সেবা খুবই দুর্বল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, যন্ত্রপাতির ঘাটতি ও সর্বোপরি ঔষধের অপ্রতুলতা এ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বড়ই নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় এবং এনজিও’র মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটি যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নতিকল্পে বিভিন্ন ধরনের থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। যেমন সাইকোলজিস্ট, স্পীচ থেরাপিষ্ট, অকুপেশনাল থেরাপিষ্ট। এ সমস্ত থেরাপিষ্টের সমন্বয়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন সম্ভব। এসমস্ত সেবা বাংলাদেশে কোন সরকারী বা বেসরকারী হাসপাতালে নেই বললেই চলে। কাজেই মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রয়োজন চতুরমুখী পদক্ষেপ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে কেবল একই দিনে পাঁচতারকা হোটেলে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জটিল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে নীতি নির্ধারকরা তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। যার ফলশ্রুতিতে মাঠ পর্যায়ে পড়ে থাকা বিপুল সংখ্যক মানসিক রোগী প্রকৃত সেবা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পরিশেষে সকলের প্রতি আহবান মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করে তাদেরকে একটি সুন্দর ও সার্থক জীবন উপহার দিতে পারি।
লেখক : পরিচালক, শিশু বিকাশ ইন্সটিটিউট, চট্টগ্রাম মা–শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল।











