তরুণ প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে, নাকি স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী

সাইফ চৌধুরী | শনিবার , ১০ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ

স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলতে জানে তরুণেরা, কিন্তু সেই স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতে প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য, সুযোগ এবং বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কি কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে গড়ে ওঠে, নাকি তরুণদের স্বপ্নের গভীরে জন্ম নেয় আগামীর নতুন পৃথিবী। একটি প্রজন্মের চোখে দেখা স্বপ্নই একদিন সমাজের পরিবর্তনের ভাষা হয়ে ওঠে, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাহস রচনা করে জাতির আগামী দিনের ইতিহাস।

আজকের তরুণ প্রজন্ম দাঁড়িয়ে আছে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে। এক হাতে প্রযুক্তির বিস্ময়, অন্য হাতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, অথচ সামনে প্রতিযোগিতা, বেকারত্ব, দক্ষতার চ্যালেঞ্জ এবং নানা সীমাবদ্ধতা। তারা শুধু নিরাপদ জীবন নয়, নিজেদের পরিচয় নির্মাণ, নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন এবং প্রচলিত বাস্তবতাকে পরিবর্তনের আকাঙ্‌ক্ষায় উদ্দীপ্ত। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম কি শুধু স্বপ্ন দেখতেই বেশি অভ্যস্ত, নাকি সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যও সমানভাবে প্রস্তুত। স্বপ্ন বাস্তবায়নের দর্শন গুলো হলো–

স্বপ্নের পৃথিবীতে নতুন প্রজন্মের নতুন চিন্তা:

প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ও বৈশ্বিক যোগাযোগ তরুণদের সামনে এমন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা কয়েক দশক আগেও অনেকের কল্পনার বাইরে ছিল। একজন শিক্ষার্থী ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ নিতে পারে, নতুন ভাষা শিখতে পারে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কাজের সুযোগ খুঁজতে পারে।

ফলে তরুণদের স্বপ্নের পরিধিও বদলেছে। তারা শুধু চাকরি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা চায় না। অনেকে নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে, নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে, উদ্যোক্তা হতে কিংবা সমাজের কোনো সমস্যার সমাধান করতে চায়। কেউ পরিবেশ রক্ষার স্বপ্ন দেখে, কেউ প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবন সহজ করতে চায়, আবার কেউ অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা অর্জন করতে চায়।

আগে স্বপ্ন নির্ধারণে পরিবার, সমাজ ও প্রচলিত পেশার প্রভাব বেশি ছিল। এখন ব্যক্তিগত আগ্রহ, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও তথ্যের সহজলভ্যতা তরুণদের চিন্তাকে অনেক বেশি স্বাধীন করেছে। তবে এর সঙ্গে এসেছে তুলনার চাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে অনেকে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করে। তারা সাফল্যের ফলাফল দেখে, কিন্তু তার পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সংগ্রাম সব সময় দেখতে পায় না। তাই বড় স্বপ্ন দেখার অর্থ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা নয়, বরং বাস্তবতাকে পরিবর্তনের সাহস অর্জন করা।

স্বপ্ন থেকে কর্মে তরুণদের পরিবর্তিত যাত্রা:

বর্তমান প্রজন্মকে কেবল স্বপ্নবিলাসী বলা একটি সরলীকরণ। অনেক তরুণ দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করছে। ফ্রিল্যান্সিং, ই কমার্স, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল বিপণন, কনটেন্ট নির্মাণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম প্রচলিত কর্মসংস্থানের বাইরেও সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।

শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই কর্মজীবনে সফল হওয়া যায় না। বাস্তব সমস্যার সমাধান, যোগাযোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের রয়েছে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠী দেশের উন্নয়নের সম্ভাবনাময় শক্তি। কিন্তু যথাযথ কর্মসংস্থান ও দক্ষতার সুযোগ নিশ্চিত না হলে এই সম্ভাবনা সামাজিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হতে পারে। তাই শুধু তরুণদের আগ্রহের প্রশ্ন নয়, তাদের আগ্রহকে কাজে পরিণত করার মতো পরিবেশ আমরা কতটা তৈরি করতে পেরেছি, সেটিও ভাবতে হবে।

স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝখানে যে অদৃশ্য দেয়াল:

স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব সব সময় ব্যক্তিগত দুর্বলতার কারণে তৈরি হয় না। অনেক সময় সুযোগের অসমতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, মানসম্মত শিক্ষার অভাব ও কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা এই দূরত্ব তৈরি করে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী গবেষক হতে চায়, কিন্তু গবেষণার সুযোগ বা আর্থিক সহায়তা পায় না। কেউ উদ্যোক্তা হতে চায়, কিন্তু পুঁজি, প্রশিক্ষণ বা বাজার সম্পর্কে যথাযথ ধারণার অভাবে পিছিয়ে পড়ে। আবার কেউ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু পারিবারিক দায়িত্ব তাকে দ্রুত উপার্জনের পথে নিয়ে যায়।

এই বাস্তবতা বিবেচনা না করে তরুণদের অলস, অধৈর্য কিংবা স্বপ্নবিলাসী বলা ন্যায়সংগত নয়। তবে সুযোগের অভাবকে অজুহাত বানিয়ে প্রস্তুতি বন্ধ করাও সমাধান নয়। রাষ্ট্রকে কর্মমুখী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীদের সক্ষম করে তুলতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আগ্রহ ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর তরুণদের শিখতে হবে সীমিত সুযোগের মধ্যেও কীভাবে অগ্রগতির পথ তৈরি করা যায়।

ইচ্ছা নয়, প্রয়োজন কর্মপরিকল্পনা:

স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ভুল হলো ইচ্ছাকে প্রস্তুতির বিকল্প মনে করা। যত বড় স্বপ্নই দেখা হোক, শেখার আগ্রহ, নিয়মিত পরিশ্রম এবং ব্যর্থতা থেকে ফিরে আসার মানসিকতা না থাকলে তা কল্পনার জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

মানুষের উৎকর্ষ একদিনের অর্জন নয়, বরং অভ্যাসের ফল। সফলতার পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ধারাবাহিক অনুশীলন এবং নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা। তরুণদের তাই নিজের অবস্থান বুঝে আগ্রহ, যোগ্যতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। বড় লক্ষ্যকে ছোট ধাপে ভাগ করে প্রতিদিন কিছু শেখা, দক্ষতার অনুশীলন এবং নিজের অগ্রগতি মূল্যায়নের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ব্যর্থতাকেও নতুনভাবে দেখতে হবে। ব্যর্থতা মানেই অযোগ্যতা নয়, অনেক সময় এটি ভুল পদ্ধতি সংশোধনের সুযোগ। উদ্ভাবনের পেছনে থাকে দীর্ঘ পরীক্ষা, ভুল এবং পুনরায় চেষ্টা করার ইতিহাস। তাই ব্যর্থতাকে ভয় করে থেমে গেলে সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তরুণদের শুধু কর্মমুখী করলেই চলবে না, মানবিক ও নৈতিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন তা সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

প্রযুক্তির যুগে স্বপ্নের নতুন দায়িত্ব:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার তরুণদের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আজ যে দক্ষতা মূল্যবান, আগামী দিনে তার চাহিদা বদলে যেতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট যোগ্যতার ওপর নির্ভর না করে নতুন কিছু শেখার মানসিকতা জরুরি।

প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান অর্জন, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য যাচাই, স্বাধীনভাবে চিন্তা এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু বিবেক, বিচারবোধ ও দায়িত্বশীলতার বিকল্প হতে পারে না।

স্বপ্নবান প্রজন্ম থেকে কর্মনিষ্ঠ জাতি:

তাহলে তরুণ প্রজন্ম কি স্বপ্ন দেখতে বেশি অভ্যস্ত, নাকি স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী। প্রকৃতপক্ষে এই দুই প্রবণতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়, আর বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা সেই প্রেরণাকে অর্জনে রূপান্তরিত করে। বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বপ্নের উচ্চতা ও বাস্তব প্রস্তুতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

একটি সমাজের উচিত তরুণদের শুধু বড় স্বপ্ন দেখার পরামর্শ না দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের পরিবেশ তৈরি করা। সম্ভাবনাময় তরুণকে সুযোগ না দিলে তার মেধা অপচয় হয়, আবার সুযোগ পেয়েও নিজেকে প্রস্তুত না করলে সেই সুযোগও অর্থহীন। উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে।

তরুণদের পরিচয় তাদের স্বপ্নের আকারে নয়, বরং সেই স্বপ্নের জন্য তারা কতটা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে, তার মধ্যেই নিহিত। যে প্রজন্ম নিজের স্বপ্নের সঙ্গে সমাজের স্বপ্নকে যুক্ত করতে পারে, তারাই ইতিহাসে পরিবর্তনের স্বাক্ষর রাখে।

স্বপ্ন দেখা মানুষের সহজাত ক্ষমতা, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত। তরুণেরা যদি স্বপ্ন দেখার সাহসের সঙ্গে বাস্তবায়নের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, তবে তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ বদলাবে না, বদলে দিতে পারবে একটি জাতির আগামী দিনের গতিপথ। অতএব অপেক্ষা নয়, প্রস্তুতি হোক আমাদের পথচলা। স্বপ্ন শুধু চোখে নয়, তার বাস্তবায়ন ঘটুক আমাদের প্রতিটি কাজে। কারণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে না, ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হয়। আর সে ভবিষ্যৎ তৈরির সেরা সময় বর্তমান।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেবীপক্ষের শুভ সূচনায় মহালয়া তিথি
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ : জীবনের অভিজ্ঞতার বাস্তব কণ্ঠস্বর শুনি