মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে ভর্তুকির সার

আনোয়ারার নদীপথ নিয়ে অভিযোগ

সোহেল, আনোয়ারা প্রতিনিধি | শুক্রবার , ৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় ভর্তুকি মূল্যের ইউরিয়া সার মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এরই মধ্যে আনোয়ারা উপজেলার নদীসংযুক্ত কয়েকটি এলাকা ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সার পাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নদীপথে বিভিন্ন স্থান থেকে সার সংগ্রহ করে উপকূলীয় সমুদ্রপথে তা মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি ভর্তুকির কারণে তুলনামূলক কম দামে ইউরিয়া সার পাওয়া যায়। অন্যদিকে মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের কারণে সারের চাহিদা বেড়েছে। দুই দেশের বাজারমূল্যের এই ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফার আশায় চোরাকারবারিরা সার পাচারে জড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আনোয়ারার হাইলধর, পরৈকৌড়া, রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের নদীসংযুক্ত কয়েকটি এলাকা সার পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব এলাকা থেকে নৌপথে সার সংগ্রহ করে পরে উপকূলীয় পথ দিয়ে মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ব্যবসাসংশ্লিষ্টদের মতে, এক হাজার বস্তা সার মিয়ানমারে পাচার করা সম্ভব হলে ওই চালানের মূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

আনোয়ারা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের চাহিদা পূরণে উপজেলায় আটজন ডিলার রয়েছেন। কৃষি অফিসের চাহিদার ভিত্তিতে কারখানা থেকেও সার সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ সরকার বলেন, সার পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে। সমন্বিতভাবে নজরদারি করা হলে সার পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের এক বিএনপি নেতা বলেন, ইউনিয়নের তিনটি নদীঘাট ব্যবহার করে কয়েকটি চালান মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এসব চালানের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তবে আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জুনায়েত চৌধুরী বলেন, আনোয়ারার কোনো নদীঘাট ব্যবহার করে মিয়ানমারে সার পাচারের তথ্য পুলিশ পায়নি। তবে সার পাচার রোধে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় পরপর কয়েকটি সারের চালান আটকের ঘটনায় মিয়ানমারে সার পাচারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগে ৬০০ বস্তা বা ৩০ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। জব্দ করা সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ২১ লাখ টাকা।

এর পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাট এলাকায় চারটি ট্রাক থেকে মাছ ধরার নৌযানে সার তোলার সময় ৯৬০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। ৫০ কেজি ওজনের এসব বস্তায় মোট ৪৮ টন সার ছিল। জব্দ করা সারের আনুমানিক মূল্য ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ৪১০ বস্তা ইউরিয়া এবং হালিশহরের দাবিরখাল এলাকায় ১১ টন সার মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টার সময় জব্দ করা হয়। এছাড়া ১০ সেপ্টেম্বর বাঁশবাড়িয়া ঘাটে আরও ৩৫ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের জোনাল অফিসার ক্যাপ্টেন মো. মিনহাজুল আলম বলেন, সার পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের নির্দেশনায় ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ চালু করা হয়েছে। অভিযান চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

তিনি জানান, সন্দ্বীপ, মিরসরাই, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের কয়েকটি এলাকায় সার সংগ্রহ ও পাচারের সঙ্গে একটি চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ৯৫ জন চোরাকারবারিকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় ১৫টি মামলা করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, জব্দ করা আলামতের বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরে জব্দ করা সার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সার কারখানা—চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)—অবস্থিত।

এ কারণে আনোয়ারার নদীঘাট ও উপকূলীয় এলাকায় সার পাচারের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নদীপথে সার পরিবহন, ঘাটে ওঠানামা এবং উপকূলীয় নৌযানগুলোর চলাচলে নজরদারি জোরদার করা গেলে সরকারি ভর্তুকির সার পাচার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাউজানে প্রাণ গেল প্রবাসী স্বামীর, আহত স্ত্রী