জৈব সার : মাটির প্রাণ ফেরানোর পথ, তবে বিজ্ঞানের হাত ধরেই

ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান | শুক্রবার , ৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ

মাটির জৈব পদার্থ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ও অসম সার ব্যবহার এবং কৃষিজ বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব–বাংলাদেশের টেকসই কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, পচা পাতা, খড়, তুষ, খৈল, হাড় ও অন্যান্য জৈব উপাদান থেকে কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরি করে মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার ধারণাটি যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশসম্মত।

তবে এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা দরকার–জৈব মানেই নিরাপদ নয়, আবার রাসায়নিক মানেই বিষাক্ত নয়। মাটির জন্য কোন উপাদান কতটা উপকারী বা ক্ষতিকর, তা নির্ভর করে তার উৎস, রাসায়নিক গঠন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রয়োগের মাত্রা এবং মাটির নিজস্ব অবস্থার ওপর।

জৈব সার কেন গুরুত্বপূর্ণ

মাটির স্বাস্থ্য শুধু উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশের ওপর নির্ভর করে না; মাটির জৈব পদার্থ, অণুজীব, গঠন, পানি ধারণক্ষমতা এবং পুষ্টি ধরে রাখার ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জৈব সার ও ফসলের অবশিষ্টাংশ এসব বৈশিষ্ট্য উন্নত করতে পারে।

বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের গবেষণায় এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, গোবর, হাঁস–মুরগির বিষ্ঠা বা ফসলের অবশিষ্টাংশের সঙ্গে খনিজ সার সমন্বিতভাবে ব্যবহার করলে মাটির জৈব পদার্থ ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির অবস্থা উন্নত হয় এবং ফসলের ফলনও ভালো থাকে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণাতেও মাটির পরীক্ষাভিত্তিক খনিজ সার এবং জৈব উপাদানের সমন্বিত ব্যবহারে ধানের ফলন ও পুষ্টি গ্রহণের উন্নতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, জৈব পদার্থ মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ–এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী। কিন্তু জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়াই আসল, জৈব বর্জ্য মাটিতে দিলেই তা ভালো সার হয়ে যায় না। কাঁচা গোবর, রান্নাঘরের বর্জ্য বা অন্যান্য জৈব পদার্থ যথাযথভাবে পচন ও পরিপক্ব না হলে রোগজীবাণু, দুর্গন্ধ, গাছের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ কিংবা অতিরিক্ত দ্রবণীয় পুষ্টির সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই একটি ভালো কম্পোস্টের ক্ষেত্রে কাঁচামালের গুণমান, কার্বন–নাইট্রোজেন অনুপাত, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল এবং পরিপক্বতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শুকিয়ে নেওয়া এবং বৈজ্ঞানিকভাবে কম্পোস্ট করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একইভাবে, বিভিন্ন ধরনের জৈব উপাদান মেশালেই যে উৎকৃষ্ট সার তৈরি হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র নেই। প্রতিটি উপাদানের পুষ্টিমান আলাদা। ফলে মিশ্রণের অনুপাত এবং চূড়ান্ত সারের পুষ্টিমান পরীক্ষাগারে নির্ণয় করা জরুরি।

রাসায়নিক সার কি মাটির শত্রু?

এ ধারণাটিও সংশোধন করা প্রয়োজন। ইউরিয়া, ফসফেট বা পটাশ উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির উৎস। সমস্যা সারটির ‘রাসায়নিক’ পরিচয়ে নয়; সমস্যা হতে পারে অতিরিক্ত বা অসম প্রয়োগে। বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দেখিয়েছে, শুধু রাসায়নিক সার অথবা শুধু জৈব সার–দুটির পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী উভয়ের সমন্বিত ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। একটি বাংলাদেশি গবেষণায় ৭০ শতাংশ নির্ধারিত খনিজ সার ও নির্দিষ্ট পরিমাণ জৈব সার ব্যবহারে ১০০ শতাংশ খনিজ সার ব্যবহারের কাছাকাছি ধানের ফলন পাওয়া গেছে এবং মাটির স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়েছে। অন্য একটি মাঠগবেষণায় সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা কৃষকের প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় ধানের মোট ফলন প্রায় ১৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্য যুক্তিসংগত পথ হলো ‘জৈব সার বনাম রাসায়নিক সার’ নয়; বরং মাটির পরীক্ষাভিত্তিক সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা।

জৈব সারও কি দূষণ ঘটাতে পারে?

হ্যাঁ। এটিই জৈব সার নিয়ে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত বিষয়। অতিরিক্ত জৈব সার প্রয়োগে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। এগুলো বৃষ্টির পানি বা সেচের পানির সঙ্গে জলাশয়ে পৌঁছালে পানির অতিপুষ্টি ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে দূষিত কাঁচামাল ব্যবহার করলে ভারী ধাতু বা অন্যান্য দূষকও মাটিতে জমতে পারে। এমনকি কম্পোস্ট তৈরির সময়ও পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক একটি বিশদ পর্যালোচনায় ৪৬টি গবেষণার ৩৮৮টি নির্গমন–তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে কম্পোস্ট তৈরির সময় মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, অ্যামোনিয়া ও উদ্বায়ী জৈব যৌগ নির্গত হতে পারে। এসব নির্গমন কম্পোস্টের উপাদান ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে।

অতএব, কম্পোস্টিং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলেও এটি নিজে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত প্রক্রিয়া নয়। সরবরাহ ব্যবস্থারও পরিবেশগত মূল্য আছে। জৈব সারকে সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব করতে হলে তার পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হবে। স্থানীয়ভাবে কৃষিজ অবশিষ্টাংশ, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য ও পশুর বর্জ্য সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হলে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে পুষ্টি আবার মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

কিন্তু এসব উপাদান যদি দীর্ঘ দূরত্বে ট্রাকে পরিবহন করতে হয়, তাহলে জ্বালানি ব্যবহার, বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ বাড়বে। ফলে একটি জৈব সারের পরিবেশগত মূল্যায়নে শুধু তার উপাদান নয়, কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে উৎপাদন, পরিবহন এবং জমিতে প্রয়োগ–পুরো জীবনচক্র বিবেচনা করা উচিত।

তাহলে কী করা উচিত?

বাংলাদেশে জৈব সার ও জৈব পদার্থ ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো অবশ্যই যুক্তিসংগত। কিন্তু এটিকে রাসায়নিক সার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার আন্দোলনে পরিণত করা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োজনীয় নয়। বরং প্রয়োজন– মাটির নিয়মিত পরীক্ষা, মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, স্থানীয় জৈব বর্জ্যের নিরাপদ পুনর্ব্যবহার, পরিপক্ব ও মানসম্মত কম্পোস্ট তৈরি, জৈব ও খনিজ সারের সুষম ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ, এবং সার তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত মান নিয়ন্ত্রণ। সাম্প্রতিক বাংলাদেশি গবেষণাতেও দেখা গেছে, খড়, গোবর বা হাঁস–মুরগির বিষ্ঠার মতো জৈব উপাদানকে খনিজ সারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা ও ধানের ফলন বাড়তে পারে।

জৈব সার মাটির জৈব পদার্থ পুনর্গঠন, মাটির গঠন ও পানি ধারণক্ষমতা উন্নয়ন এবং কৃষিজ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ‘প্রাকৃতিক’ শব্দটি কোনো সারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ করে না। একইভাবে, রাসায়নিক সারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাটির বিষ নয়। আসল বিষয় হলো উৎস, মাত্রা, সময়, পদ্ধতি এবং মাটির প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষির জন্য তাই সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক পথ হলো–জৈব পদার্থের ব্যবহার বাড়ানো, মানসম্মত কম্পোস্ট তৈরি করা এবং মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় খনিজ পুষ্টির সঙ্গে তার সমন্বিত ব্যবহার। এ পদ্ধতিই একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরির সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

লেখক: প্রফেসর, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতায়েফ-সবচেয়ে মজলুম যেখানে আমাদের বিশ্বনবী (সা.)
পরবর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা