দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া যত এগোচ্ছে, একটি প্রশ্ন তত সামনে আসছে, এটি কি শুধুই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত? নাকি এর সঙ্গে বাংলাদেশ–সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
প্রশ্নটি আলোচিত হওয়ার পেছনে জোরালো যুক্তি হচ্ছে, ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি বড় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে একটি সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আএসজিটিআই) এবং সংযুক্ত আবর আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড। এর মধ্যে সৌদি প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। আর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনায় ১৫ বছরের চুক্তির বিষয়টি ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। একই সময়ে ২৮ সেপ্টেম্বর চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনেকের মাঝে ভুল ধারণা রয়েছে, আরএসজিটিআই সৌদি আরবের রাজপরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিষয়টি সত্য নয়। আরএসজিটিআই সৌদি আরবের একটি বেসরকারি উদ্যোগ থেকে গড়ে ওঠা বন্দর অপারেটর। তবে এর সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ২০২১ সালে সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা পিআইএফ এই কোম্পানির ২০ শতাংশ শেয়ার নেয়। একই সময়ে কসকো শিপিং পোর্টসও ২০ শতাংশ শেয়ার নেয়। আরএসজিটিআইয়ের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের জন্য গঠিত কার্যক্রমে ৪০ শতাংশ অংশীদারিত্ব নেয় পিআইএফ। প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি রাজপরিবারের ব্যক্তিগত কোম্পানি না হলেও সৌদি রাষ্ট্রের ভালো অংশীদারত্ব রয়েছে। পিআইএফের চেয়ারম্যান সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। এতে করে আরএসজিটিআইকে নিছক একটি সাধারণ বেসরকারি বিদেশি কোম্পানি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আরএসজিটিআই ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২২ বছরের কনসেশন চুক্তি করে। চুক্তির আওতায় ১৭ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী খালিদ আল–ফালিহ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পিপিপি কর্তৃপক্ষ চুক্তিটিকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতে সৌদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
আরএসজিটিআইয়ের বাংলাদেশে প্রবেশ সৌদি আরবের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সৌদি আরব এখন শুধু তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে থাকতে চায় না। ভিশন ২০৩০–এর অধীনে দেশটি বন্দর, লজিস্টিকস, শিপিং, ট্রান্সশিপমেন্ট ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে। আরএসজিটিআইকে সৌদি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন কোম্পানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোম্পানিটির আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ সেই কৌশলেরই অংশ। বাংলাদেশে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল ছিল তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের পরিবহন ও লজিস্টিকস মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী রুমাইহ বিন মোহাম্মদ আল–রুমাইহের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। সেখানে বন্দর, পরিবহন ও লজিস্টিকস নিয়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়। ওই প্রতিনিধিদলে আরএসজিটিআইয়ের প্রধান নির্বাহীও ছিলেন। সৌদি পক্ষ বাংলাদেশে বন্দর ও অন্যান্য খাতে ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। একই সময়ে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
অপরদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ড দুবাইভিত্তিক একটি বৈশ্বিক বন্দর ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার আলোচনা শুরু হয় ২০১৯ সাল থেকে। এটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের মধ্যে সরকারি পর্যায়ের অংশীদারত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনাটি চলে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক প্রস্তাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, এটি বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৃহত্তর অংশীদারত্বের অংশ।
তবে দুটি বিদেশি দেশের প্রস্তাবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান দুটি সব জায়গায় পরস্পরের সহযোগী নয়। চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনালের ক্ষেত্রে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী। ডিপি ওয়ার্ল্ড ৮ এপ্রিল এবং রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ২২ এপ্রিল টার্মিনালটি পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়ে পৃথক প্রস্তাব দাখিল করে। বাংলাদেশের এমজিএইচ গ্রুপও তাদের প্রস্তাব দাখিল করে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট, সৌদি ও আমিরাতি প্রতিষ্ঠান দুটি বাস্তব ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তবে ব্যবসায়িক এই প্রস্তাবে কূটনীতির প্রশ্নটি এত জোরালোভাবে আসার কারণ রয়েছে জনশক্তি রপ্তানিকে কেন্দ্র করে। সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জন কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। বছরের শেষে সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। বেসরকারি হিসেবে এবং বৈধ–অবৈধ মিলে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ৫৩ লাখ ৩৩ হাজার ২২৩ জন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ২১ লাখ ৯২ হাজার ৯৫৬ জন বাংলাদেশি কর্মী। দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি এবং শ্রমবাজারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক, বিপুল রেমিট্যান্স, হজ, ব্যবসা–বাণিজ্য এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি বিশেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই কারণে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো এই দুই দেশের অপারেটরকে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সমুদ্রপথের বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সামলায়। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল একাই বন্দরের মোট কন্টেনার পরিবহনের ৪০ শতাংশের বেশি হ্যান্ডলিং করেছে। ফলে বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হলে এই টার্মিনালের পরিচালনার ধরন পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্বাভাবিকভাবে বড় আকারে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহের পেছনে কি শুধু ব্যবসা? ব্যবসায়িক কারণ অবশ্যই রয়েছে। বিদেশি অপারেটরদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার পরিবহন ক্রমে বাড়ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, জাহাজের অবস্থানকাল কমিয়ে আনা, বার্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, আধুনিকায়ন এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সন্নিবেশ, দক্ষতার সাথে পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে সমন্বয় করে টার্মিনালের সক্ষমতা অনেক বাড়ানো সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে পুঁজি করে বিদেশি অপারেটররা এখানে বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড সদস্য মোহাম্মদ জাফর আলম বলেন, টার্মিনাল পরিচালনা বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ কি বাস্তবসম্মত? টার্মিনাল অপারেটর মূলত কন্টেনার ওঠানো–নামানো, ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ও ডেলিভারির সেবা দেয়। যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ তারাই করে। আর আয়ের একটি অংশ বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেয়। কিন্তু কাস্টমস, নিরাপত্তা ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তৃত্ব সরকারের হাতেই থাকে। জাহাজ কোন বার্থে ভিড়বে এবং আমদানি–রপ্তানির আইনি সিদ্ধান্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার নেয়। জমি, জলসীমা ও বন্দরের মালিকানা রাষ্ট্রের। মেয়াদ শেষে টার্মিনাল রাষ্ট্রের কাছে ফেরত আসে। ভারতের জওহরলাল নেহেরু পোর্টে টার্মিনালগুলো চালায় পিএসএ, এপিএম টার্মিনালস ও ডিপি ওয়ার্ল্ড। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সেখানকার প্রায় ৮৯% কন্টেনার এসব আন্তর্জাতিক অপারেটরের টার্মিনালে হ্যান্ডল হয়েছে। চেন্নাইয়ের দুটি টার্মিনালও চালায় ডিপি ওয়ার্ল্ড ও পিএসএ। সিঙ্গাপুর, রটারডাম ও জেবেল আলীতেও আন্তর্জাতিক অপারেটররা কাজ করে। তবে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন না উঠলেও চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। দরপত্র প্রক্রিয়া কি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ছিল? কেন জিটুজি চুক্তির অধীনে নির্দিষ্ট অপারেটরের সাথে এই চুক্তি করা হলো? বন্দরের বিশাল বিনিয়োগ কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়? রাজস্ব ভাগাভাগি ও ট্যারিফ কাঠামো কি দেশের জন্য ন্যায্য? ১৫ বছরের মেয়াদ শেষে নবায়নের শর্ত কী? একটি কোম্পানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি কীভাবে সামলানো হবে? স্থানীয় শ্রমিক–কর্মচারীদের চাকরি ও অধিকার কতটা সুরক্ষিত? কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে চুক্তি বাতিল বা জরিমানার ব্যবস্থা আছে কি?
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপারেটর আনা মানেই সার্বভৌমত্ব হারানো–এই বক্তব্য সঠিক নয়। কিন্তু ‘সব ঠিক আছে’ বলে প্রশ্ন থামিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সরকারের উচিত চুক্তির মূল শর্তগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা আর নাগরিকদের উচিত অপতথ্যের বদলে সেই তথ্য ধরে প্রশ্ন করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানেই বন্দর বা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মালিকানা দিয়ে দেওয়া নয়। সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টার্মিনাল পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিয়োগের অধিকার দেওয়া হয়। পতেঙ্গা টার্মিনালের ক্ষেত্রে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের সঙ্গে ২২ বছরের চুক্তি হয়েছে এবং প্রায় ১৭ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। তবে এটাও ঠিক যে, একটি টার্মিনালের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণকে শুধুমাত্র একটি সাধারণ ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ বন্দর কোনো সাধারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি দেশের আমদানি–রপ্তানি, সরবরাহব্যবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কূটনীতি আর শুধু রাষ্ট্রদূত, বৈঠক ও রাজনৈতিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বন্দর, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, রেল, বিমানবন্দর, ডেটা সেন্টার, ফাইবার অপটিক, খনিজ সম্পদসহ নানা বিষয় এখন ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি দেশ যখন অন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে, তখন সেটি শুধু মুনাফা অর্জনের বিষয় থাকে না। একই সঙ্গে বাজার, সরবরাহব্যবস্থা, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি করে।
সৌদি আরবের জন্য বাংলাদেশ শুধু ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বঙ্গোপসাগরের অবস্থান, ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সম্ভাব্য সংযোগ, দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথ এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি–রপ্তানি মিলিয়ে বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়ছে। সৌদি আরব নিজেও লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে একটি বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাব গড়ে তুলছে। চট্টগ্রামে উপস্থিতি সেই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ।
একইভাবে দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মডেলের কেন্দ্রে রয়েছে বন্দর, লজিস্টিকস, ফ্রি জোন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সমন্বিত ব্যবস্থা। ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক ব্যবসা কেবল কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্দর থেকে ইনল্যান্ড লজিস্টিকস, ফ্রি জোন, সাপ্লাই চেইনসহ পুরো ইকোসিস্টেমকে যুক্ত করা তাদের ব্যবসায়িক কৌশল। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বা সিসিটিতে প্রবেশকে কয়েকটি জেটি পরিচালনার ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক শক্তিকে কৌশলগত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা আধুনিক ভূরাজনীতির অন্যতম মাধ্যম বলে বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রেও ভূরাজনীতির এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই মন্তব্য করে সংশ্লিষ্টরা বলেন, এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে, বাংলাদেশ কি নিজের বন্দর পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিদেশি অভিজ্ঞতা ও পুঁজি ব্যবহার করছে? নাকি ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোর পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলছে? এতে বাংলাদেশের নিজস্ব অপারেশনাল সক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে? জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ কীভাবে থাকবে? বিদেশি অপারেটরের তথ্য ব্যবস্থাপনা কোন আইনের অধীনে চলবে? বিদ্যমান বন্দর কোটি কোটি ডলারের অবকাঠামোসহ বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি না? দিলে কোন শর্তে দেওয়া হচ্ছে? চুক্তির মেয়াদ কত? বিদেশি প্রতিষ্ঠান কত টাকা বিনিয়োগ করবে? বন্দরের আয় কীভাবে ভাগ হবে? টার্মিনালের রাজস্ব আগের তুলনায় কত বাড়বে? জাহাজের অবস্থানকাল কতটা কমবে? কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের উৎপাদনশীলতা কত বাড়বে? স্থানীয় কর্মীদের চাকরি ও দক্ষতা উন্নয়নের নিশ্চয়তা কী? বন্দর, তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? কোনো বিরোধ হলে বাংলাদেশের আইন কতটা কার্যকর থাকবে? নির্ধারিত কর্মদক্ষতা না হলে চুক্তি বাতিলের সুযোগ কতটা থাকবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, চুক্তির মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ কী অবস্থায় টার্মিনালটি ফিরে পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে, সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক নাকি ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই শুধু কূটনৈতিক নাকি বাণিজ্যিক স্বার্থ তা বিবেচনা না করে আসলে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে বা কতটুকু লাভবান হচ্ছে সেটি নির্মোহভাবে খতিয়ে দেখলেই দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ হবে। কোনো পক্ষের প্রতি অন্ধ সমর্থন বা বিরোধিতা না করে বাংলাদেশের স্বার্থের জায়গাটি যাতে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে সেটি দেখা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সৌদি আরব হোক কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত দুটি দেশই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ও অর্থনৈতিক অংশীদার। তাদের বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হতে পারে। অন্যদিকে আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে তার সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বন্ধুত্ব বা কূটনীতি কোনোটিতেই দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।









