সদরুল পাশা: স্বাধীনতা-উত্তর চট্টগ্রামে নাট্যচর্চার পথিকৃৎ

রোকন উদ্দীন আহমদ | সোমবার , ৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের নব নাট্যান্দোলনে চট্টগ্রামের বিশেষ স্থান রয়েছে। সেসময় চট্টগ্রামের নাট্যচর্চা দেশের নাট্যান্দোলন সমৃদ্ধ করেছে। চট্টগ্রামের প্রথম নাটকের দল ‘থিয়েটার ৭৩’ এর মাধ্যমে চট্টগ্রামে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন সূচনা হয়। দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন নাট্যকর্মী সদরুল পাশা। চট্টগ্রামে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন সূচনার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। সূচনা পর্বেই চট্টগ্রামের নাট্যচর্চা দেশে ঝলক দিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে সদরুল পাশার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়’। অরিন্দমের মাধ্যমে সদরুল পাশা অভিনয় করে চট্টগ্রামের নাট্যচর্চাকে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। বাংলাদেশের নাট্যান্দোলন সমৃদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী চট্টগ্রামের নাট্যান্দোলনের পথিকৃৎ সদরুল পাশা এক সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন।

পিতা বঙ্গবন্ধু সংসদের সদস্য ছিলেন। হাইস্কুল জীবনেই সদরুল পাশার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় কলেজের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এসময় তিনি আবৃত্তি করতেন, তার্কিক ছিলেন, চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী ছিলেন। গল্প লিখতেন, ক্রিকেট খেলতেন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময়ই আবির্ভূত হন অভিনেতা হিসেবে। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাসায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘থিয়েটার ৭৩’। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর। কলেজ জীবনেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র অবস্থায় জহির রায়হানের ‘ম্যাসাকার’ গল্পের নাট্যরূপ করেছেন। নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদের পরিচালনায় নাট্যকার জিয়া হায়দারের নির্দেশনায় ‘থিয়েটার ৭৩’ সেটি মঞ্চস্থ করে। ‘থিয়েটার ৭৩’ এর প্রায় নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতেন। চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনে তখন অভিনেতা সদরুল পাশার জয় জয়কার। এমনি সময় তাঁর উদ্যোগে ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়’। তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। এসময় অরিন্দমের আন্তন চেখভ রচিত মমতাজ উদ্দীন আহমদ রূপান্তরিত ‘যামিনীর শেষ সংলাপ’, মমতাজ উদ্দীন আহমদের ‘ফলাফল নিম্নচাপ’, শিশির দত্তের ‘মল্লিকার চোখে জল’, বাদল সরকারের ‘শনিবার’, খসরুল কবিরের ‘ভোলা ময়নার বায়োস্কোপ’ বের্টোল্ট ব্রেখট রচিত অমিত চন্দের রূপান্তরিত ‘রাইফেল’ ইত্যাদি সফল নাটক মঞ্চায়ন চট্টগ্রামে শুধু নয় জাতীয়ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নাটকগুলোর কোন কোনটিতে সদরুল পাশা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং কোন কোনটিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায় ৪৫ পেরিয়ে’ গ্রন্থে প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার লিখেছেন, “স্বাধীন বাংলাদেশে যেসব নাটকের দলের হাত ধরে নাট্যচর্চা পল্লবিত হয়ে উঠেছিল অরিন্দমের অবস্থান তাদের প্রথম সারিতে। সত্তুরের দশকের শুরুর দিকে ঢাকার সাথে পাল্লা দিয়ে চট্টগ্রামে নাট্যচর্চা হয়েছে। সেসময় চট্টগ্রামের প্রধান দুটি নাট্যদল থিয়েটার ৭৩ এবং অরিন্দমের আমন্ত্রণে আমরা চট্টগ্রামে আমাদের দল থিয়েটারের নাটক নিয়ে গেছি। চট্টগ্রামে অভিনয় করে প্রতিবারই তৃপ্ত হয়ে ফিরে এসেছি। চট্টগ্রামের নাট্যকর্মীরা একটি উর্বরা জমি তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন।” চট্টগ্রামে ঢাকার সমান্তরাল নাট্যচর্চা–নাটকের উর্বর জমি তৈরি এইসব অন্যতমভাবে সদরুল পাশার প্রতিভা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং অভিনয়ের ফসল। তখনকার সময়ের অভিনেতা চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রাক্তন সচিব অভিক ওসমান, সদরুল পাশাকে সেই সময়ে তাঁর জীবনের দেখা শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। সংস্কৃতিকর্মী ও এক সময়ের অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের কলাকুশলী আবসার হাবিবের ১৯৭৬ সালের জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির নাট্যোৎসব নিয়ে স্মৃতিচারণ শুনি, “ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পর অরিন্দমের নাম সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ল। সাথে অভিনেতা সদরুল পাশার নামও। ‘ফলাফল নিম্নচাপ’ ও ‘যামিনীর শেষ সংলাপ’ নাটকে অভিনয়ের জন্য। নাটক দুটির সফল মঞ্চায়নে নাট্যাকার মমতাজ উদ্দীন আহমদের কথা উল্লেখ করতে হয়। তিনি ফলাফল নিম্নচাপ এর নাট্যকার ও পরিচালক এবং যামিনীর শেষ সংলাপ নাটকের রূপান্তরকারী ছিলেন। সদরুল পাশা অভিনীত এই নাটক দুটি ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ হওয়ার পর ঢাকার প্রখ্যাত নাট্যকর্মীরা তাঁকে মঞ্চে এসে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। পরদিন ঢাকার পত্রিকায় অরিন্দম এবং অভিনেতা সদরুল পাশার গুণকীর্তন করে নাটকের ছবিসহ বেশ বড় করে সংবাদ ছাপা হয়। সেদিনের ভালোবাসা এখনো আমাদের মাঝে ছড়িয়ে আছে। মনে পড়ছে, যামিনীর শেষ সংলাপ ও ফলাফল নিম্নচাপ নাটকে সদরুল পাশার অসাধারণ অভিনয়ের কথা।” উল্লেখ্য যামিনীর শেষ সংলাপের নির্দেশক ছিলেন সদরুল পাশা এবং শিশির দত্ত। ফলাফল নিম্নচাপের নির্দেশক ছিলেন কমল সেনগুপ্ত এবং খালিদ আহসান।

মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় সদরুল পাশা ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে পুনে ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে পড়তে যান। অভিনয়ের টানে এমবিবিএস পড়া বাদ দিয়ে পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে টেলিভিশনে অভিনয় করে জাতীয়ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম আকর্ষক অভিনেতা ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর শিল্পকলায় মঞ্চ নাটক বিকশিত হয় বেশি। কিছু তরুণ ভারত থেকে নাটকের উপর ডিগ্রি নিয়ে আসলে বাংলাদেশে নাটক মঞ্চায়নে আমূল পরিবর্তন ঘটে। তারা নাটকের সেট, আলো, কস্টিউম, মিউজিক সবকিছুতেই মেধার স্বাক্ষর রাখলেন। এ ধারাটির শুরুতে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা এবং পুনে ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে ডিগ্রি অর্জনকারীদের মধ্যে আছেন সৈয়দ জামিল আহমদ, তারিক আনাম খান, কামাল উদ্দিন নিলু, সদরুল পাশা, খ.ম হারুন প্রমুখ। সদরুল পাশা পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পড়ে এসে ঢাকায় বিজ্ঞাপনী সংস্থা গড়ে তোলেন। বিজ্ঞাপনচিত্র, তথ্যচিত্র, নাটক ইত্যাদি নির্মাণ শুরু করেন। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে তিনি বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। বিজ্ঞাপন শিল্পে তাঁর হাতে নতুনত্ব আসে। বাংলাদেশে রঙিন বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণে তিনি অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তরুণ সদরুল পাশা স্বাধীনতা–উত্তর নাটকের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে স্বপ্নচারী হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে অরিন্দম মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী অভিনয়ে বদলে দিতে চেয়েছিলেন সমাজচিত্র। তাই নাটক ও অভিনয়ের উপর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনে ভারতের পুনে গিয়েছিলেন। এমবিবিএস পড়া বাদ দিয়ে নাটক নিয়ে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্তে শুভানুধ্যায়ীরা পাগলামি বলেছিল। তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে অভিনয়ে পাগল করে তুলেছিল। সদরুল পাশার জীবন জুড়ে ছিল নাটক, নাট্যচিন্তা। অভিনয়কেই তিনি জীবন মনে করতেন। তাই বলেছিলেন, ‘নাটক আমাদের শিল্প, শিল্পই আমাদের ঈশ্বর’। তিনি অভিনয়শিল্পে যেন ঈশ্বরকে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন শিল্পীদের কমিটেড হতে হবে। এই দর্শন তিনি নিজে ধারণ করতেন বলেই তারুণ্যেই জয় করেছিলেন চট্টগ্রাম, জয় করেছিলেন বাংলাদেশ। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নাট্যোৎসবে ঢাকার বাইরের একমাত্র চট্টগ্রামের অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায় নাটক করেছিল। নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদ রচিত প্রধান চরিত্রে সদরুল পাশা অভিনীত ‘ফলাফল নিম্নচাপ’ সেই নাট্যোৎসবের অন্যতম সফল নাটক বিবেচিত হয়। (সূত্র: ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায় ৪৫ পেরিয়ে’ গ্রন্থ)। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্যাকাশে আপন প্রতিভাতেই সদরুল পাশা ছিলেন নক্ষত্র। ‘যামিনীর শেষ সংলাপ’ নাটকে সমাজে অবহেলা আর অবজ্ঞার শিকার নাট্যকর্মীর ভূমিকায় এবং ‘ফলাফল নিম্নচাপ’ নাটকে স্বাধীনতা পরবর্তী বিপথগামী তরুণের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয়ে সদরুল পাশা বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসের অংশ।

সদরুল পাশা এক অসামান্য নাট্যপ্রতিভা। তারুণ্যেই অসাধারণ অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন। জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেন। অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রামের ডেইলী পিপলস্‌ ভিউ পত্রিকার সম্পাদক ওসমান গণি মনসুরের সদরুল পাশাকে নিয়ে মূল্যায়ন এরকম, ‘অরিন্দমের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদরুল পাশা তখন ছাত্র। অথচ সে তখন নাট্যাঙ্গনে মহাকাশভেদী অপ্রতিরোধ্য উল্কাপিন্ড হিসেবে আপন অবস্থান করে তুলেছিল।’ নাটকের এই উল্কাপিন্ড ১৯৯৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপৃথিবীকে যারা বলেছিল গান গাইতে
পরবর্তী নিবন্ধবাঁশখালীতে সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার