ঐতিহ্য-সন্ধানী নিরলস সাধক-আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

রীতা দত্ত | বুধবার , ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জনপদ পটিয়ার সুচক্রদন্ডীর গৌরব বিশিষ্ট পুঁথি সংগ্রাহক আবদুল করিম পৃথিবীর আলো দেখেন ১৮৭১ এর ১০ অক্টোবর। অল্প বয়সে পিতৃহারা হন। মায়ের সান্নিধ্য খুব বেশি পান নি। সতের বছর বয়সে মাতৃহারা হন। শিক্ষাজীবনে ১৮৯৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিনাঞ্চলের প্রথম বাঙালি মুসলমান যিনি এন্ট্রান্স পাশ করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি সে সময়ের একমাত্র মুসলিম ছাত্র যিনি সংস্কৃত নিয়ে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ১৮৯৫ তে চট্টগ্রাম কলেজে এফ,এ ক্লাসে ভর্তি হন। তবে শারীরিক অসুস্থতার জন্য পরীক্ষা দিতে পারেন নি। চাকুরি জীবন শুরু করলেন। বর্ণাঢ্য জীবন তাঁর। পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা করেছেন, স্কুল পরিদর্শক ছিলেন, সরকারী অফিসে কারণিক এর কাজ করেছেন, পুঁথি সংগ্রহ করেছেন, সংরক্ষন করেছেন, বহু অস্পষ্ট পুঁথির মর্মোদ্ধার করেছেন, সস্পাদনার কাজ করেছেন এবং সমাজ সেবার কাজও করেছেন।

শৈশব থেকেই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে তাঁর জ্ঞানস্পৃহা ছিল। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের গ্রাহক ছিলেন, পড়তেন সহপাঠিদের সাহচর্যে। নিজ বাড়িতে সংগৃহীত কিছু পুঁথি পাঠের সুযোগ হয়েছিল। সেই থেকে পুঁথির প্রতি তাঁর আকর্ষণ হয়। এফ,এ পড়ার সময় থেকে তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত “পূর্ণিমা পত্রিকায়” “অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী” নাম এ দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। সে সময় চট্টগ্রামের কবি, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবীনচন্দ্র সেন এ প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং এ লেখকের প্রতি অনুরক্ত হন। পরবর্তিতে ১৯৩৫ এ চট্টল মনীষী ড. এনামুল হকের সাথে যৌথভাবে “আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য” গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। পরে “ইসলামাবাদ” নামে তাঁর আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি নিজের কাজের প্রচার চাইতেন না। তিনি নিজে লিখেছেন, “এ যুগে যাঁহারা বাংলা ভাষার সেবায় যেভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন তদ্মধ্যে আমি ছিলাম পাল হতে পলাতক। আমার সহকর্মীরা কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, প্রভৃতি রচনায় মন দিয়েছিলেন। আমার সাহিত্য সাধনা তাঁহাদের চাইতে স্বতন্ত্র। আমি ছিলাম বাংলা ভাষায় মুসলমানদের প্রাচীন অবদানের তথ্য উদ্‌ঘাটনে তৎপর।”

বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে গিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের অভাব লক্ষ্য করেন। এ অভাববোধ তাঁকে সাহিত্য সাধনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। চাকুরিরতকালিন বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার কাজ শেষ করে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে পুঁথি সংগ্রহের কাজে ব্রতী হন। পুঁথির সন্ধানে চট্টগ্রাম, নোয়াখালির বিভিন্ন পল্লীর হিন্দু, মুসলিম এবং বৌদ্ধ পরিবারে তিনি যেতেন, কখনো বৈরী পরিবেশের সম্মুখীন হতেন। তৎকালিন প্রথানুযায়ী হিন্দু পরিবারে যাওয়া নিষিদ্ধ, তিনি অনুরোধ করতেন পুঁথি বাড়ির বাইরে নিয়ে আসার জন্য এবং কিছু দূরত্ব বজায় রেখে তিনি পুঁথি পাঠ করে নিতেন। এভাবে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কবিদের লেখা আড়াই হাজার পুঁথি তিনি সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার মুসলিম পুঁথিকার। এই পুঁথিগুলোর কিছু তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু বরেন্দ্র মিউজিয়ামে দিয়ে দেন। এ সব পুঁথির মর্মোদ্ধার করেছেন তিনি অত্যন্ত কষ্টে।

পুঁথি সংগ্রহের কাজে তিনি আনোয়ারা স্কুলে তাঁর চাকুরিকালকে সুবর্ণ সময় উল্লেখ করেছেন। সে সময় তিনি প্রচুর পুঁথি সংগ্রহ করেছেন। আনোয়ারার এক দরিদ্র চাষীর বাড়ি থেকে তিনি মহাকবি আলাওলের মহাকাব্য “পদ্মাবতী”র পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। এতে তিনি এত আনন্দিত হয়েছিলেন যে প্রায় তিনি একথা উল্লেখ করতেন গৌরবের সাথে। পুঁথি পাঠে তিনি জেনেছেন মধ্যযুগে বাঙলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদানের কথা। তিনি বিস্মিত হয়েছেন। দীর্ঘ বছর বাঙালি মুসলমানরা এ বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন। মুসলিম সাহিত্যিকদের গৌরবগাথা তুলে ধরলেন তাঁর সাহিত্যে। দীর্ঘদিনের ভ্রান্তি অবসান হোল। বাঙালি মুসলিম তাঁদের স্বরূপের সন্ধান পেলেন। অগোচরে থাকা প্রায় দেড়শজন বিস্মৃত কবিকে তিনি আবিষ্কার করেন এবং জনসমক্ষে পরিচিত করান। এর পিছনে সাহিত্যবিশারদের একক অবদান অতুলনীয়। মুহম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, জয়নুদ্দিন, মুহাম্মদ কবির প্রমুখ কবির কথা তাঁর মাধ্যমে জানা গেছে। বাঙ্গালীর কীর্তির নিদর্শন লুপ্তপ্রায় সাহিত্য সম্পদ উদ্ধার করতে তিনি আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। সুদীর্ঘ ষাট বছর পুঁথি সংগ্রহে, সংরক্ষণে তিনি যে নিষ্ঠা, সাধনার পরিচয় দিয়েছেন তা বিরল। এ সাহিত্য সাধনায় তিনি তিরাশি বছর জীবন কাটিয়েছেন।

নিয়মিত চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জী তাঁকে প্রথমে প্রবেশিকা ও পরে স্নাতক বাংলার পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন। পরবর্তিতে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষার পরীক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৫১ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা অনার্সের একটি পত্রের প্রশ্ন প্রণেতা ও পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন।

তিনি মনে প্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি। তৎকালে এ দেশীয় কিছু মুসলমান বিশ্বাস করতেন তারা আরব বংশোদ্ভব, তাদের ভাষা বাঙলা না। সাহিত্যবিশারদ দেখিয়ে দিলেন মধ্যযুগের সাহিত্য সৃষ্টিতে বাঙ্গালী মুসলমানদের অবদান এবং তাঁদের সাহিত্য রচনার ভাষা বাঙলা ভাষা। তিনিই প্রথম জানিয়ে দিলেন, বাঙলা আমাদের দেশ, বাঙলা আমাদের ভাষা, আমরা বাঙালি মুসলমানদের বংশধর। তাঁর ভাষায়, “আমার এক বিশ্বাস আছে যে আমার দেশের মৃত্যু নাই, আমার দেশের আত্মা যে জনগণ তারও মৃত্যু নাই, তেমনি অমর আমার মাতৃভাষা।” আমাদের ভাষা আন্দোলনের অনেক আগেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, বাংলা ভাষাই হবে আমাদের জাতীয় ভাষা। বাংলা ভাষায় হবে আমাদের পড়ালেখার মাধ্যম। মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হউক এটা তিনি চাইতেন না। হাজার মাইলের ব্যবধান দুটি অঞ্চল নিয়ে কিভাবে একটি রাষ্ট্র হবে? “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” এ শ্লোগান শুনলে তিনি বলতেন, বুঝেছি, পাঞ্জাবীদের বুটজুতোর লাথি খাবার জন্য তোমাদের পিঠ চুলকাচ্ছে।

তিনি বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। সাহিত্য জগতে তাঁর খ্যাতির কারণে পত্রিকার মর্যাদা ও গুরুত্ব বৃদ্ধির জন্য চারটি পত্রিকায় তাঁকে অবৈতনিক সম্পাদক করা হয়েছিল।

নবনূর, কোহিনূর, সওগাত, পূজারী পত্রিকার তিনি প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সম্পাদনা কাজে তাঁর দক্ষতার খ্যাতি ছিল। বিভিন্ন সভা সমিতিতে তাঁর জ্ঞানগর্ভ, উদ্দীপনামূলক বক্তব্যে তৎকালিন সুধী সমাজ ঋদ্ধ হোত, নিজেদের স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন হতেন। তাঁর সাহিত্য প্রতিভাকে সম্মান জানাবার জন্য চট্টগ্রামের ধর্মমন্ডলি তাঁকে ১৯০৯ সালে “সাহিত্য বিশারদ উপাধি”তে ভূষিত করেছিলেন। ১৯২০ এ নদীয়া সাহিত্য সভা তাঁকে ‘সাহিত্য–সাগর’ উপাধি দিয়েছিলেন। তবে তাঁর পছন্দ ছিল ‘সাহিত্যবিশারদ’ এই উপাধি। তিনি তাঁর নামের সাথে এই উপাধি যুক্ত করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন নীতিবান মানুষ। নীতির প্রশ্নে আপোষ করেননি কখনো। নিদারুণ অর্থ সংকট জেনেও তিনি চাকুরি ছেড়ে দিয়েছেন অবলীলায়। পরিবারে আশ্রিতদের জন্য ছিল তাঁর পরম মমতা। তিনি সবার অগোচরে এদের পছন্দের জিনিস যোাগান দিতেন।

১৯০৭ এ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চট্টগ্রাম এসেছেন। সাহিত্যবিশারদের সাথে সাহিত্য নিয়ে আলাপ হয়। কবি কথা প্রসঙ্গে বলেন, “আপনি পুঁথি সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে জাতির বড় খেদমত করছেন, ভালো কথা। তবে এর সাথে লোকসাহিত্যের ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ সংগ্রহ করে বঙ্গ সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় পাঠান। তাতে লোকসাহিত্যচর্চার উন্নতি হবে।” কবির আহ্বানে তিনি সংগ্রহ করেছেন ২৫০টি ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদবাক্য। শান্তিনিকেতনের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। শান্তিনিকেতনের তরুণ পুঁথি গবেষক পঞ্চানন মন্ডলের সাথে পত্র যোগাযোগ ছিল। শান্তিনিকেতনে পুঁথি গবেষণা এবং পাঠোদ্ধারে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। এ মহান পুরুষ ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ তে জাতীয় গাথা কাহিনী রচনা করতে করতে পরপারে চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণে চট্টগ্রামের ড. এনামুল হক লিখলেন, সত্যি কি সব শেষ হয়ে গেল? মাস্টার আবদুল করিম মারা গেছেন, কেরানী আবদুল করিম দেহত্যাগ করেছেন। কিন্তু সাহিত্যবিশারদ মরেন নি। তিনি মরতে পারেন না। তিনি মৃত্যুঞ্জয়। সাহিত্যবিশারদের প্রয়াণবাষির্কীতে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ; সাবেক অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধবাগদাদে শায়িত বড় পীরের নীতি-নৈতিকতা