দুর্ভোগ ও দুর্গতি থেকে পরিত্রাণ চায় নগরবাসী

| শনিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এখন চট্টগ্রামবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নগরবাসীর সুবিধা–অসুবিধা বিবেচনায় না নিয়ে এবং সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে এসব প্রকল্প ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজাদীতে ‘নগরবাসীর ওপর কয়েকটি বড় প্রকল্পের চাপ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্প নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প এবং ওয়াসার স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চট্টগ্রাম মহানগরীতে কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। কোথাও দোকানপাট ভেঙে তৈরি করা হচ্ছে র‌্যাম্প, কোথাও সড়কের উপর গর্ত করে সরানো হচ্ছে ইউটিলিটি লাইন, কোথাও সড়ক কেটে বসানো হচ্ছে স্যুয়ারেজের পাইপ, কোথাও খাল সংস্কার ও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের জন্য সড়কের একটি অংশে যান চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও পুরনো স্থাপনা ভেঙে জায়গা তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু কাজগুলোর গতি এবং যথাযথ সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। একইসাথে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একাংশ বন্ধ রেখে দিনের পর দিন কাজ চলায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পয়েন্টগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। কোনো কোনো স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে একদিকে নগরবাসী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুফল, জলাবদ্ধতা ও স্যুয়ারেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস পাচ্ছেন, অন্যদিকে চলমান কাজের কারণে প্রতিদিন অসহনীয় যানজট ও ভোগান্তি মোকাবিলা করছেন।

লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্প নির্মাণ নিয়ে অনেকদিন ধরে ভুগছেন নগরবাসী। বর্তমানে ইপিজেড, আগ্রাবাদ ও জিইসি মোড় থেকে ওয়াসা এলাকায় র‌্যাম্প নির্মাণের কাজ চলছে। আগ্রাবাদ ও ইপিজেড এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। জিইসি মোড়ের র‌্যাম্পে সিটি কর্পোরেশন লাইটপোস্ট না সরানোর ফলে এটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ওয়াসা মোড় পর্যন্ত সারাদিন যানজট লেগে থাকে। নগরীর লাভলেইন ও জুবিলি রোডে অনেকদিন ধরে চলছে ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ। একাধিক পয়েন্টে রাস্তার একটি বড় অংশ টিনের ঘেরা দিয়ে বন্ধ করে রাখায় যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যস্ত এই সড়কে স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। নগরীর আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একই সময়ে রাস্তায় এই প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে। কাজের গতি প্রত্যাশা স্পর্শ করতে পারেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলেছেন, লাভলেইন থেকে তিন পুলের মাথাসহ সন্নিহিত এলাকার যানজট এখন ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নয়ন কখনোই নাগরিকদের জীবনকে জিম্মি করে কিংবা জনভোগান্তিকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়ে হতে পারে না। এই বারবার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে কেবল জনগণের করের টাকার অপচয় হচ্ছে না, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সড়কের স্থায়িত্বও ধ্বংস হচ্ছে। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল কাগজে–কলমে সমঝোতা স্মারক সই হলেই হবে না, বাস্তব ক্ষেত্রে এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি, বিশেষজ্ঞরা একটি সমন্বিত ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করবেন, যাতে এভাবে দুর্গতি পোহাতে না হয় সাধারণ মানুষকে। সরকারি সংস্থাগুলোর এই খামখেয়ালি ও সমন্বয়হীনতার দায় কেন সাধারণ নগরবাসী নেবে– সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময় এসেছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের অভাব নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ নগর পরিকল্পনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ব্যর্থতা, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে বারবার আপস, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় চট্টগ্রাম নগরী দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয়ের পরও পরিকল্পনার ব্যর্থতার কারণেই নগরের জীবনমানের উন্নতি হয়নি।

ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে নগর পরিকল্পনায় ধারাবাহিক আপোষ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা, আইন প্রয়োগে অনীহা এবং জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে বিপুল বিনিয়োগের পরও চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। বড় বড় প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই কংক্রিটনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল, পরিবেশগত ভারসাম্য, সামাজিক বৈষম্য কমানো কিংবা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রত্যাশিত দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে যানজট, বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সবুজ এলাকা সংকুচিত হওয়া এবং নাগরিক দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ চায় নগরবাসী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে