আজ জাতীয় সমবায় দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : ‘করবো সমবায়, গড়বো দেশ সবার জন্য বাংলাদেশ’। সমবায় হলো এমন সংগঠন, যা সমমনা মানুষের স্বেচ্ছাসেবামূলক একটি স্বশাসিত সংস্থা, যা নিজেদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে। এ লক্ষ্যে অংশীদারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা পরিচালনা করে। একটি সমবায় প্রতিষ্ঠান এমনও হতে পারে, যেখানে ব্যবসাটি এর সুবিধাভোগী সবাই সমভাবে নিয়ন্ত্রণ করে অথবা তারাই এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও শক্তিকে সংঘবদ্ধ করে যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আর্থসামাজিক মুক্তি এনে দেওয়াই সমবায়ের লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামের মানুষকে সুসংগঠিত করা এবং তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে সমবায়। প্রান্তিক মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি একত্র করে তা তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির কাজে ব্যবহার করতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা আমূল পাল্টে যাবে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরো শক্তিশালীকরণের সুযোগ আমাদের দেশেও তৈরি হয়েছে। সমবায়ের মাধ্যমে সে সুযোগ এখন আমাদের নিতে হবে। শুধু শহরের উন্নয়ন করে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। একসঙ্গে গ্রামীণ পটভূমিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। সমবায় গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হতে পারে। তাই গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সচেষ্ট হতে হবে।
ড. ফোরকান উদ্দিন আহমদ এক লেখায় লিখেছেন, সমবায় সমিতি এমন একটি জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক আর্থসামাজিক প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে থাকে গণতন্ত্র, সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টা, ব্যাপক উৎপাদন কর্মযজ্ঞ এবং সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির প্রয়াস। আধুনিক কৃষির জন্য যে পুঁজি, ঝুঁকি এবং যৌথ মেধার দরকার এর জন্য প্রয়োজন গণমুখী কৃষিভিত্তিক সমবায়ব্যবস্থা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে হলে কৃষি সমবায়ের কোনো বিকল্প নেই। যথাযথ নীতি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক সহযোগিতা পেলে কৃষি সমবায় খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বিপর্যয় প্রতিরোধ এবং খাদ্য নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টিতে অন্যতম এবং উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হলো সমবায়ী উদ্যোগ। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমে দেশ ও নিজের জন্য সমবায় প্রতিষ্ঠা। এই মর্মবাণী ধারণ করে সমবায় আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব সবার।
তবে এ কথা সত্যি যে, সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা, আয়–ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে সমবায় খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি আজ অবধি দৃশ্যমান হয়নি। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে গঠিত সমবায় সমিতিগুলো হয় বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো নিষ্ক্রিয় রয়েছে। কেবল কিছু সমিতির কার্যক্রম চলমান আছে। নতুন সমিতি খুব একটা গঠিত হয় না। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের নিষ্ক্রিয় ও মৃতপ্রায় সমবায় সমিতিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে একজন সমবায় বিশেষজ্ঞকে প্রধান করে এবং আরও দুইজন অভিজ্ঞ সমবায় গবেষককে সদস্য করে কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশনটি দেশের সমবায় সমিতির বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সমস্যা ও সম্ভাবনা নির্ণয় করে সরকারের কাছে করণীয় প্রস্তাবনা পেশ করবে। আর যেসব সমিতি আর পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়, সেগুলোর বিলুপ্তি ঘোষণা এবং যেসব সমিতি পুনরায় চালু করা সম্ভব সেগুলো কোন প্রক্রিয়ায় চালু হবে সেসব বিষয় নিয়ে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যে সমিতিগুলো বন্ধ আছে এর কারণ অনুসন্ধানপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করা যেতে পারে। পাশাপাশি সমবায়ের বেহাত ও বেদখল হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সমবায় অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা–কর্মচারীর বিরুদ্ধে সমবায়ীদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা কমিশনে পেশ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কমিশন দায়ী কর্মকর্তা–কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি দেশের বিদ্যমান সমবায় আইন বিধিমালা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের জন্য সরকারের নিকট প্রস্তাব পেশ করতে পারবে। দেশের সমবায় খাতের পুনরুজ্জীবন এবং এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে সমবায় কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। বিশেষ করে আর্থিক ও সেবা খাতে নতুন কার্যক্রম গ্রহণ ও বিদ্যমান কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নে সমবায় অধিদপ্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আমরা আশা করছি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনয়ন, প্রশিক্ষণ ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনমান এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন; বিশেষত নারী উন্নয়নে সমবায় ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।






