বর্জ্য থেকে কীভাবে বাঁচবে কর্ণফুলী

বিপুল অর্থের ড্রেজিং, তবুও প্রতিদিন নতুন বর্জ্যে ভরাট নদী ও বন্দর রক্ষা করতে যা করতে হবে

হাসান আকবর | সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং, নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং, খালনালা পরিষ্কার করা হলেও কোনো কিছুতেই যেন রক্ষা করা যাচ্ছে না কর্ণফুলী নদীকে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে বছরের পর বছর ধরে চলছে বিপুল অর্থের ড্রেজিং। পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীর নালানর্দমা ও খাল দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য গিয়ে আবার জমা হচ্ছে নদীর তলদেশে।

নগরবাসীর অসচেতনতা, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ কর্ণফুলী খনন করার পর প্রতিদিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে দেশের লাইফলাইনখ্যাত এই নদী, বন্দর চ্যানেল এবং চট্টগ্রাম বন্দর।

সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও সিটি কর্পোরেশন সংগ্রহ করতে পারছে প্রায় ২ হাজার ২০০ টন। প্রায় ১ হাজার টন বর্জ্য প্রতিদিন ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বর্জ্যের একটি অংশ রাস্তা, নালা, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। সেখান থেকে বর্জ্যের বড় একটি অংশ গিয়ে পড়ে কর্ণফুলীতে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অ্যামোনিয়াম ও ফসফেটের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে টিএসপি ও সিইউএফএল সংলগ্ন এলাকায় পানির মান অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এতে জলজ প্রাণী, মাছের প্রজনন এবং নদীর সামগ্রিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত নাব্যতা বৃদ্ধির প্রকল্পে নদীর প্রায় ৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৫০ মিটার প্রশস্ত অংশ ড্রেজিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ৪২ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ও মাটি অপসারণের হিসাব করা হলেও পরে নদীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্যের স্তর পাওয়ায় সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫১ লাখ ঘনমিটারে। প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে প্রায় ৩২১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের বছর ঘোরার আগেই চাক্তাই এলাকায় যে চিত্র দেখা দিয়েছে তা ভয়াবহ।

ড্রেজিং করে নদীর তলদেশ থেকে বর্জ্য ও পলি তুলে ফেলার পরও নগরীর খালনালা দিয়ে সেই নদীতেই প্রতিদিন আবার বর্জ্য প্রবেশ করছে। ফলে একদিকে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর তলদেশ পরিষ্কার করা হচ্ছে, অন্যদিকে একই নদীর তলদেশে নতুন করে বর্জ্য জমছে।

নদী রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিং করা হয়। বিশেষ করে বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে চালানো হয় মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে প্রতি বছর।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, নগরীর বর্জ্য, পাহাড়ি মাটি ও পলি নদীতে জমে নাব্যতা সংকট তৈরি করায় বন্দরের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ড্রেজিংয়ে ব্যয় করতে হয়। এই ব্যয় ১০০ কোটি টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নগরের খালনালা দিয়ে পলি ও বর্জ্য নদীতে যাওয়ার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ড্রেজিংয়ের ব্যয় কমানো কঠিন।

কর্ণফুলীর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যও। নগরীতে দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন এলাকার সেপটিক ট্যাংক ও অন্যান্য উৎসের বর্র্জ্য খালনালার মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার চলমান স্যুয়ারেজ প্রকল্পের লক্ষ্যই হচ্ছে এই অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য নদীতে যাওয়া বন্ধ করা। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পটির প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছিল ওয়াসা এবং বাকি কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছিল ২০২৭ সালের জুনে।

নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও প্রায় ১ হাজার টন সংগ্রহের বাইরে থাকছে। এসব বর্জ্যের একটি অংশ নালা ও খালে পড়ে শেষ পর্যন্ত কর্ণফুলীতে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবেলায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সিটি কর্পোরেশন প্রায় ২৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

শিল্পবর্জ্য কর্ণফুলীর পানি ও তলদেশের জন্য বড় হুমকি বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্ণফুলীকে বাঁচাতে শুধু ড্রেজিং দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। নদীতে বর্জ্য প্রবেশের উৎসগুলো বন্ধ করা, নগরীর সব খালনালাকে বর্জ্যমুক্ত রাখা, পয়োবর্জ্যের পূর্ণাঙ্গ শোধন ব্যবস্থা চালু করা, শিল্পবর্জ্যের ইটিপি কার্যকর রাখা এবং নদীর দুই পারে কঠোর নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদের মধ্যেও পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলার ব্যাপারে কার্যকর সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআর স্কুলে যাবে না অনুশ্রী
পরবর্তী নিবন্ধপ্রধানমন্ত্রী আজ নিউইয়র্ক যাচ্ছেন, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ