
বাংলা গানের ইতিহাসে চট্টগ্রাম এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভূখণ্ড। পাহাড়, সমুদ্র, নদী এবং লোকজ জীবনের বৈচিত্র্যে ভরপুর এই অঞ্চল শুধু বাণিজ্য ও ইতিহাসেই নয়, সংগীত ও গীতিকবিতার জগতেও রেখে চলেছে উজ্জ্বল স্বাক্ষর। চট্টগ্রাম কেবল বন্দর আর পাহাড়ের শহর নয়, এটি সুরেরও শহর। আরব বণিকদের আগমন, বৌদ্ধ– হিন্দু– মুসলিম– রাখাইন– পাহাড়ি সংস্কৃতির দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাস মিলে এখানকার গীতিকবিতায় তৈরি হয়েছে এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সুরধারা, যাকে অনেক গবেষক ‘সামুদ্রিক নন্দনতত্ত্ব’ বলে অভিহিত করেন। এখানকার গীতিকবিরা তাদের মাটি, মানুষ, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা এবং সংগ্রামের গল্পকে শব্দ ও সুরে রূপ দিয়েছেন। ফলে চট্টগ্রামের গীতিকবিতা চর্চা বাংলা সংগীত সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামের গানের ঐতিহ্য মূলত লোকসংগীতের ভেতর থেকেই বিকশিত হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের আনন্দ–বেদনা, কৃষকের শ্রম, সমুদ্রতীরের জীবনযাপন এবং ধর্মীয় অনুভূতি এসব বিষয় লোকগানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। এই লোকধারার ভেতর থেকেই পরে গড়ে ওঠে আধুনিক গীতিকবিতার রূপ। গীতিকবিতা মূলত সুরে গাঁথা শব্দ যে শব্দ কখনো কান্নার মতো বাজে, কখনো আবার ঢেউয়ের মতো দোল খায়। চট্টগ্রামের এই চর্চা লোকায়ত ধারা থেকে শুরু করে রেডিওর স্বর্ণযুগ পেরিয়ে আজকের ব্যান্ড সংগীত ও ডিজিটাল সংগীত পর্যন্ত বিস্তৃত।
গানের কথা যিনি লিখে থাকেন তাকে আমরা গীতিকার বলি। একটি গান সৃষ্টির পেছনে প্রথমেই যার ভূমিকা আসে তিনি গীতিকার। গানের কথায় সুরকার সুরারোপ করে তা শিল্পীর কণ্ঠে তুলে দেন। গান হচ্ছে তিন ত্রয়ীর একটি সম্মিলিত প্রয়াস। গীতিকারের গানটা সুরকারের হাত ধরে শিল্পীর কণ্ঠে স্থান পায়। গীতিকারকে আমরা গীতিকবিও বলে থাকি। কারণ গীতিকার এক অর্থে কবি। তার লেখনীতে থাকে এক ধরনের কাব্যিক ভাবের প্রকাশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা কবি জসীম উদ্দীন সকলেই কবি পরিচিতির বাইরে একেকজন আবার গীতিকবিও। আমাদের দেশের গাজী মাজহারুল আনোয়ার, রফিকউজজামান কিংবা ওপার বাংলার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সকলেই জানি। দুই বাংলার এরকম আরো অনেক বিখ্যাত গীতিকারের নাম বলা যাবে যারা বাংলা গানকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। গানের বহুমাত্রিক চরিত্র রয়েছে। একজন গীতিকার গান লেখালেখিতে বিশেষ কোনো গান লেখার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেই পারেন। তবে অনেকেই আছেন আধুনিক গান ছাড়াও গানের আরো নানা শাখায় চমৎকারভাবে বিচরণ করেছেন। একজন গীতিকার সমাজের নানা অসংগতি, সংস্কৃতি, রোমান্টিকতা কিংবা দেশপ্রেমের নানা অনুষঙ্গকে তুলে আনেন নিজের কথামালায়। একজন গীতিকার শব্দের নিপুণ কারিগর। তাকে গান উপযোগী শব্দ চয়ন করে গান রচনায় মনযোগী হতে হয়।
চট্টগ্রাম শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম চারণভূমি। এখানে সংস্কৃতির চর্চা হয়ে আসছে সেই সুদীর্ঘকাল থেকে। চট্টগ্রামের সংগীতচর্চারও রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। চট্টগ্রাম থেকে জন্ম নিয়েছেন অনেক খ্যাতিমান গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। সংগীতের এই নানামুখী ক্ষেত্র থেকে আলাদা করে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের গীতিকবিদের আলোচনায় নিয়ে আসা সত্যি কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের গীতিকারের সংখ্যা হাতে গোণা। এখানে আবার অনেকেই আছেন শিল্পী নিজেই গীতিকার এবং সুরকারও। আবার অনেকেই আছেন গীতিকার যিনি তিনি আবার সুরকারও। আলাদা শুধু গীতিকার হিসেবেই আছেন অনেকেই। চট্টগ্রামে আছে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্র। এই দুটি প্রতিষ্ঠানকেই কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আবর্তিত হয়। চট্টগ্রামে অনেকেই গান লেখালেখির চর্চা করছেন। তাদের অনেকেই আবার চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে গান লেখালেখিতে নিবেদিত আছেন। চট্টগ্রামের গীতিকারদের লেখা অনেক গান দেশ বিদেশে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
চট্টগ্রামের কিছু স্বনামধন্য গীতিকারের নাম এখানে উল্লেখ করতে পারি যারা গান রচনার কুশলী গীতিকার। এখানে নামের সিরিয়াল ঠিক রাখা যায়নি বলে প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। যেমন– রমেশ শীল, আস্কর আলী পণ্ডিত, মলয় ঘোষ দস্তিদার, মোহনলাল দাশ, আবদুল গফুর হালী, এম এন আকতার, সৈয়দ মহিউদ্দিন, মোহাম্মদ নাসির, চৌধুরী জহুরুল হক, ময়ুখ চৌধুরী, সেলিম আহমেদ, আবদুল লতিফ ওয়াসেকপুরী, জামাল রাজা, মুলকুতের রহমান, এস এম ফয়জুল হক, এম শামসুল আলম, শামসুল হক দিশারী, সুখময় চক্রবর্তী, আবুল কালাম ভোলা, অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী, আবদুস সালাম, ড. দিলওয়ার হোসেন, ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, মো: আবুল কাশেম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম মুফতী, সরওয়ার হোসেন নবাব, ফাহমিদা আমিন, মোহাম্মদ বাকের, শাহাদাত আলী চৌধুরী, চৌধুরী গোলাম রব্বানী, গোলাম মুর্তাজা, বেলাল মোহাম্মদ, আলতাফ হাসান মিন্টু, অমিতাভ বড়ুয়া, লক্ষ্মীপদ আচার্য, এয়াকুব সৈয়দ, মুহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, সালমা চৌধুরী, লিয়াকত হোসেন খোকন, জি কে দত্ত, ডা. গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, মোমিনুল হক চিশতী, শাহীন আনোয়ার, শেখ খুরশীদ আনোয়ার, এস এম খুরশিদ, খোদেজা খুরশিদ অপরাজিতা, শান্তনু বিশ্বাস, শামসুল আরেফীন, পংকজ দেব অপু, এস আনিস আহমেদ বাচ্চু, ইকবাল হায়দার, স্বপন কুমার দাশ, মানস পাল চৌধুরী, শাক্ষ্য মিত্র বড়ুয়া, ফারুক হাসান, দীপক আচার্য, সুদীপ দেওয়ানজী, মো: শাহ বাঙালী, কুতুব উদ্দিন খন্দকার, সুজিত কুমার দাশ, ড. আবুল কালাম আযাদ, ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ, অপু বড়ুয়া, ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, অধ্যক্ষ আবুল হাসান, শামছুল আহসান খোকন, শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, বাসুদেব খাস্তগীর, জসিম উদ্দিন খান, কাসেম আলী রানা, গাজী মওদুদুর রহমান, মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ, রুশমী চৌধুরী, ইসমাইল মানিক, শফি সুমন, সুমন চৌধুরী বিকু, এস এম ফরিদুল হক, ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, আইয়ুব বাচ্চু, আবছার উদ্দিন অলি, সুলতানা নুরজাহান রোজী, সুরজিত রাহা দাসু, দুদু চৌধুরী, মোহাম্মদ হুমায়ুন চৌধুরী, শাহীন আকতার, নুরুন্নবী রাজু, মোহাম্মদ শাহাবউদ্দীন, ড. আহমেদ মাওলা, খোরশেদুল আনোয়ার, রাহগীর মাহমুদ, জহুরুল ইসলাম, কোহিনূর শাকী, অনামিকা তালুকদার, তসলিমউদ্দিন আহমেদ, সুজন কুমার মজুমদার, ফরিদ বঙ্গবাসী, ইফতেখার সাদী, আবছার আহমেদ চৌধুরী, মাহাবুবুল আলম বাবলু, মহসিন ভূঁইয়া, রেখা নাজনীন, মো: মাহফুজুল হক, মো: লোকমান হাকিম, নুর জাহান হোসেন, আশা কিরণ বড়ুয়া, ইকবাল গনি সিদ্দিকী, খোরশেদ আলম মানিক, তিন্নী দে, এস এম নুর উল আলম, আফসার উদ্দিন আহমেদ, মাওলানা শামসুল ইসলাম, মরিয়ম রহমান,দীন মাহমুদ আখন্দ, কমরে আলম, মো: মাহবুব উল আলম, হায়দার আলী চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, সনজীব বড়ুয়া, ইমতিয়াজ ইকরাম, সনজিত আচার্য, কল্পতরু ভট্টচার্য, এম এ হাশেম, চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম, মৌসুমী সেন, অরূপ কুমার বড়ুয়া, সিরাজুল ইসলাম আজাদ, রফিক রহমান ভূঁইয়া, এ কে এম জয়নাল আবেদীন, উত্তম কুমার আচার্য, দিলীপ ভারতী, চমৎকার মোহন দেবদত্ত, শিমুল শীল, রুমি চৌধুরী, অভিষেক দাশ, তাপস আচার্য, মৃণালিনী চক্রবর্তী, আকলিমা আক্তার মুক্তা, রূপক কুমার রক্ষিত, রত্না বণিক প্রমুখসহ আরো অনেক। চট্টগ্রাম বেতারেই তালিকাভুক্ত গীতিকার প্রায় আড়াই শতাধিক। যাদের অনেকেই নিয়মিতভাবে গীতিকবিতা চর্চা করেন না নানাবিধ কারণে।
চট্টগ্রামে যারা নিয়মিতভাবে গীতিকবিতা চর্চা করেছেন বা করছেন এদের কয়েকজনের সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা তুলে ধরা যেতে পারে। যেমন–
আস্কর আলী পণ্ডিত : চট্টগ্রামের লোকগানের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ‘ডালেতে লড়িচড়ি বইয়ো চাতকী ময়না রে’ এর মতো লেখা গান বহুল গীত হয়েছে। উনিশ শতকে লোককবি আস্কর আলী পণ্ডিত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। সুফি ভাবধারা ও প্রেমময় ভাষায় রচিত তাঁর অনেক গান লোকসমাজে জনপ্রিয় ছিল। তাঁর একটি জনপ্রিয় গানের পঙক্তি-‘না রাখি মাটিতে, না রাখি পাটিতে, সিঁথির সিঁদুরে রাখিব বন্ধুরে।’
রমেশ শীল : লোককবি এবং মাইজভাণ্ডারী গানের কিংবদন্তি গীতিকার। কবিয়াল নামে তিনি সমধিক পরিচিত। ‘স্কুল খুইলাছেরে মওলা স্কুল খুইলাছে’– এর মতো রয়েছে তাঁর লেখা জনপ্রিয় মাইজভাণ্ডারী গান। তিনি কবিগান, আঞ্চলিক গান এবং মাইজভাণ্ডারী গানের মাধ্যমে বিশাল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর গানে দেশপ্রেম ও মানবতার সুর ধ্বনিত হয়েছে। চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক সংগীতধারায় মাইজভান্ডারি তরিকা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। মওলানা গোলামুর রহমান বাবা ভাণ্ডারী’র অনুসারী সাধক–কবিদের গানে দেহতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব এবং মানবতার বাণী সুরে বাঁধা হয়েছে।
মলয় ঘোষ দস্তিদার : ‘ছোড ছোড ঢেউ তুলি, লুসাই পাহাড়র তুন নামিয়ারে যারগই কর্ণফুলী’ – এই জনপ্রিয় গানটির কথা কে না শুনে থাকবেন? মলয় ঘোষ দস্তিদার এই জনপ্রিয় গানটির গীতিকার। চট্টগ্রামের গানের ইতিহাসে এটি অসাধারণ জনপ্রিয় একটি গান। তাঁর রচিত ‘ চাটগাঁইয়া নওজোয়ান আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান, দইজ্জার কুলত বসত গরি, আঁরা ঠেকাই ঝড় তুয়ান‘ গানটিও জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
মোহনলাল দাশ : ‘ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দেওয়ানা’ এই গানটির গীতিকার চট্টগ্রামের বরেণ্য সংগীতজ্ঞ মোহনলাল দাশ। গানটি দেশের চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। মঞ্চসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গানটি এখনো সমান জনপ্রিয়। গানটি চট্টগ্রামকে দেশে বিদেশে নানাভাবে পরিচিত করেছে। চট্টগ্রামের গানের ইতিহাসে গানটির ভূমিকা অনন্য ও অসাধারণ।
আবদুল গফুর হালী : আবদুল গফুর হালী চট্টগ্রামের একজন কিংবদন্তি গীতিকার। তিনি আবার সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীও। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক, মাইজভাণ্ডারী ও লোকগানের এই গীতিকারের রয়েছে অনেক জনপ্রিয় গান। তিনি প্রায় দুই হাজারের বেশি গান রচনা করেন। তাঁর গানে চাটগাঁইয়া ভাষা ও প্রমিত বাংলার সৃজনশীল মিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর একটি জনপ্রিয় গানের পঙক্তি ‘সোনাবন্ধু তুই আমারে করলিরে দিওয়ানা।
এম. এন. আখতার : জনপ্রিয় আঞ্চলিক গানের গীতিকার ও শিল্পী। তাঁর জনপ্রিয় গান ‘কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যেম তোঁয়ারে’। এছাড়াও শেফালী ঘোষের গাওয়া ‘তুমি যে আমার জীবনের উপহার কী করে তোমায় আমি ভুলবো’ আরেকটি জনপ্রিয় গান। তিনি অনেক মাইজভাণ্ডারী আঞ্চলিক গান লিখেছেন।
সৈয়দ মহিউদ্দিন : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের গীতিকার হিসেবে তার খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বী। ‘অ জেডা ফইরার বাপ’, ‘মন কাচারা মাঝিরে তোর সাম্পানত উঠ্যাম নঅ’– এমন গানের মতো কালজয়ী গানের রচয়িতা সৈয়দ মহিউদ্দিন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে অসাধারণ এক আমেজে তিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর লেখা সব আঞ্চলিক গানই ভীষণ জনপ্রিয়। তিনি অনেক জনপ্রিয় মাইজভাণ্ডারী গানও লিখেছেন।
জি কে দত্ত : তাঁর আসল নাম গোপাল কৃষ্ণ দত্ত। তিনি গীতি কবিতার জগতে জি কে দত্ত নামেই সমধিক পরিচিত। প্রচুর গান লিখেছেন তিনি। বেশির ভাগই আধুনিক গান। শাম্মী আকতার, রওশন আরা মোস্তাফিজসহ অনেকেই তাঁর লেখা আধুনিক গান গেয়েছেন। ‘আমায় ডেকে দিও মাগো কোকিল ডাকা ভোরে, আমি পলাশ ফুলের মালা দেবো শহীদ মিনারে’– এমন কথার দেশের গান রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। গীতিকার জিকে দত্তের ‘শতাব্দীকে বলে দিও‘ নামে গানের বই আছে।
শেখ খুরশীদ আনোয়ার : চট্টগ্রামের খ্যাতিমান কবি ও গীতিকার শেখ খুরশীদ আনোয়ার স্বাধীনতা–উত্তর চট্টগ্রামের সাহিত্য–সংস্কৃতির এক পরিচিত নাম। তাঁর গীতিকবিতায় চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের কথা উঠে আসে, এবং তিনি নগরীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নিভৃতচারী কবি ও গীতিকার হিসেবেই সমাদৃত। ‘তুমি কি কথার কথাই বলেছিলে ভালোবাসি, আমি যে তারে বুকে বেঁধে কাঁদি হাসি’ – এরকম অসাধারণ, অতুলনীয়, অপূর্ব সুন্দর আটচল্লিশটি গান মহামাণিক্যরূপে বন্দি করেছেন গীতিকার কবি লেখক খুরশীদ আনোয়ার তাঁর প্রকাশিত গানের সংকলন ‘গানের সিন্দুক’ এ।
স্বপন কুমার দাশ : স্বপন কুমার দাশ একজন গীতিকার সুরকার কণ্ঠশিল্পী ও যন্ত্রশিল্পী। সংগীতের বহুমাত্রিক শাখায় তাঁর বিচরণ। তাঁর লেখা অনেক গানে দেশের বরেণ্য কণ্ঠশিল্পীরা কণ্ঠ দিয়েছেন। সুবীর নন্দী, সৈয়দ আবদুল হাদীসহ অনেকেই তাঁর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। ‘গীতি মাধুরী’ ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের বই ‘সাম্পানওয়ালা’ নামে স্বপন কুমার দাশের দুটো সঙ্গীতের বই রয়েছে।
সনজিত আচার্য: তিনি একজন সুরকার কণ্ঠশিল্পীও। তিনি চট্টগ্রামের বহু আঞ্চলিক গানের গীতিকার এবং আঞ্চলিক গানের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। ‘বাঁশখালী মইশখালী, পাল উড়াইয়া দিলে সাম্পান গুড়গুড়াই টানে’ জনপ্রিয় এ আঞ্চলিক গানের গীতিকার সনজিত আচার্য। তাঁর লেখা এ রকম আরো কিছু বেশ জনপ্রিয় গান রয়েছে।
মোহাম্মদ নাসির : মরমী ও আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি। তাঁর লেখা অনেক জনপ্রিয় পল্লীগান রয়েছে। তাঁর লেখা জনপ্রিয় কয়েকটি গান: ‘চাঁদমুখে মধুর হাসি, দেবাইল্ল্যা বানাইল মোরে সাম্পানর মাঝি‘। ‘রসিক ভাণ্ডারী তোরে চিনব কেমনে’।
ড. আবদুল্লাহ আল মামুন : ‘তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে’ কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে এ গানটির কথা অনেকের মনে থাকবে। গানটির রচয়িতা ছিলেন চট্টগ্রামের ড. আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী। এই গীতিকবি লেখালেখির জগতে পা রাখেন কবিতা লেখার মাধ্যমে। আশির দশকে তাঁর লেখা কালজয়ী এই গানটি বা ‘এই মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে’ তুমুল শ্রোতাপ্রিয় হয়। বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণযুগে তাঁর গান কণ্ঠে নিয়েছিলেন নকিব খান, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিতের মতো শিল্পীরা।
ডা. গোলাম মোস্তফা : ‘যেখানেই যাও ভালো থেকে’ এই জনপ্রিয় গানটির গীতিকার ডা. গোলাম মোস্তফা। আবদুল মান্নান রানার কণ্ঠে গানটির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী।
শাহীন আনোয়ার : বহু গুণে গুণান্বিত শাহীন আনোয়ার একজন গীতিকার ছাড়াও ইংরেজি সংবাদ পাঠক, কবি, উপস্থাপকও। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী শাহীন আনোয়ার এখন সুদূর আমেরিকায় বসবাস করলেও দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামেই কাটিয়েছেন। ‘আমার দুঃখ বারোমাস’, ‘আমি কালরাতে আকাশকে প্রশ্ন করেছি’ – এরকম কথার গান রয়েছে তাঁর লেখনীতে। সুবীর নন্দী ও প্রবাল চৌধুরীর মত শিল্পী তাঁর লেখা এসব গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
খোরশেদুল আনোয়ার: নৌবাহিনী কলেজের রসায়নের অধ্যাপক খোরশেদুল আনোয়ার বাংলাদেশ বেতার–টিভির একজন নিয়মিত গীতিকার। তিনি আবার বেতার–টিভিতে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাও করে থাকেন। তাঁর দুটি আধুনিক গানের বই ‘এতদিন পরে হলো এভাবে দেখা‘,ও ‘সীমাহীন সীমানায়‘ রয়েছে।
পংকজ দেব অপু : চট্টগ্রামের একজন খ্যাতিমান গীতিকার। তিনি কলেজে অধ্যাপনা করেন। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক। সুবীর নন্দী, প্রবাল চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান শিল্পীরা তাঁর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সত্য সাহার মতো খ্যাতিমান সুরকারও তাঁর লেখা গানে সুরারোপ করেছেন। গীতিকার পংকজ দেব অপুর ‘আমার এ গানগুলো স্বরলিপি করে রেখো‘ নামে গানের বই রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম বেতারে ১৯৯১ সাল থেকে আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত কণ্ঠশিল্পীও।
ইকবাল হায়দার : ইকবাল হায়দার মূলত একজন ফোক ও পল্লী গানের খ্যাতিমান শিল্পী। শিল্পী হলেও তিনি যে গান করেন সে ঘরানার গান লিখেন প্রতিনিয়ত। আধুনিক গানও তিনি লিখেছেন। শিল্পী ইকবাল হায়দারের লেখা ‘আমার রচিত গান যত’ এবং ‘দরদীয়ারে বন্ধু’ নামে গানের বই রয়েছে।
মানস পাল চৌধুরী: মানস পাল চৌধুরী একজন নিবিষ্ট লোক–বাউলশিল্পী। তাঁর ‘গানে মিলে প্রাণ‘ নামে সমপ্রতি একটি গানের বই বেরিয়েছে।
লিয়াকত হোসেন খোকন: গীতিকার লিয়াকত হোসেন খোকন দীর্ঘদিন ধরে গীতিকবিতা চর্চার পাশাপাশি বর্তমানে গীতিকবিদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদ চট্টগ্রাম’ এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
এস আনিস আহমেদ বাচ্চু: এস আনিস আহমেদ বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে গীতিকবিতা চর্চা করছেন। তাঁর লেখা গান ‘আসি আসি বলে তোমার আজও আসা হলো না’ খ্যাতিমান শিল্পী সুবীর নন্দীর কণ্ঠে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি ‘বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদ চট্টগ্রাম’ এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ : তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছেন। তিনি সময়ের একজন খ্যাতিমান গীতিকার। প্রচুর গান তিনি লিখেছেন।
সিরাজুল ইসলাম আজাদ : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ‘হেডমাস্টরে তোঁয়ারে তোয়ার’– গানটির কথা আসলেই সিরাজুল ইসলাম আজাদের কথা আসে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের কথাকে জীবনমুখী কথার গাঁথুনিতে তিনি ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন।
শহীদ মাহমুদ জঙ্গী: তিনি চট্টগ্রামে জন্মেছেন এবং তাঁর জীবনের বড় একটা সময় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ব্যান্ড ও আধুনিক গানের ইতিহাসে শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর লেখা অনেক কালজয়ী গান আছে। তাঁর ঘুম ভাঙা শহরে (এলআরবি), আজ যে শিশু (রেনেসাঁ), হৃদয় কাদামাটি (রেনেসাঁ) ইত্যাদি গানগুলো খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বাসুদেব খাস্তগীর : বাসুদেব খাস্তগীর একজন প্রাবন্ধিক ও শিশুসাহিত্যিক হলেও তাঁর লেখালেখি কিন্তু গান দিয়েই শুরু। বিভিন্ন ধরনের গান রচনায় তাঁর পারঙ্গমতা আছে। বেতার টিভিতে তাঁর লেখা অনেক গান প্রচার হয়েছে। ‘অনেক কথাইতো বলা হলো তবু কিছু কথা যেন থেকেই গেলো’, ‘নদী হয়ে যদি আসো কাছে, দেবো সাগরের ভালোবাসা তোমাকে’– এরকম কথার তাঁর লেখা বেশকিছু জনপ্রিয় গান রয়েছে। আধুনিক গান ও শিশুদের জন্য ছড়াগান নিয়ে তাঁর লেখা বইও রয়েছে। বইগুলো হচ্ছে: স্বরলিপিসহ আধুনিক গানের বই ‘স্মৃতিময় গীতিময়’(সুর ও স্বরলিপি–দিলীপ দাশ) ও স্বরলিপি সহ শিশুতোষ ছড়াগানের বই ‘ছড়ায় ছড়ায় সারেগামা’ ( সুর ও স্বর স্বরলিপি– নির্মল বৈদ্য)।
ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী : গীতিকার ডা. প্রণব কুমার চৌধুরীর ‘প্রেমের গান’এবং ‘গান’ শিরোনামে দুটি গানের বই রয়েছে।
আবছার উদ্দিন অলি : তিনি একজন গীতিকার। পাশাপাশি বিনোদন জগতের নানা বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আবছার উদ্দিন অলির লেখা গানে অনেক খ্যাতিমান শিল্পীরা কণ্ঠ দিয়েছেন।
এই প্রবন্ধের লেখক আমিও (জসিম উদ্দিন খান) চট্টগ্রামে গীতিকবিতা চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টায় আছি। আবদুল মান্নান রানার কণ্ঠে আমার লেখা আধুনিক গান ‘কী করে তোমায় ভুলে থাকি/ চাইলে কি ভুলে থাকা যায়’ কিংবা সুজিত রায়ের সুরে ও কণ্ঠে দেশের গান ‘তুমি ফিয়ে আসবে বলে এখনো আমার/ প্রতিটি রাত ভোর হয়’– গানগুলো শ্রোতামহলে সমাদৃত হয়ে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
চট্টগ্রামে কণ্ঠশিল্পীর তুলনায় গীতিকারের সংখ্যা অনেক কম। সুরকারেরও অপ্রতুলতা আছে। এখানে বেতার টিভির তালিকাভুক্ত গীতিকারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গীতিকারদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আর অনেকেরই শুধু গীতিকার হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরো অনেকেই হয়তো অজান্তে অগোচরে থাকতে পারেন। তালিকাভুক্ত গীতিকারের বাইরেও অনেকেই গান লেখালেখির চর্চা করেন। তাঁদের গানও অনেক শিল্পীরা হয়তো সরকারি প্রচার মাধ্যম ছাড়া অন্য মাধ্যমে পরিবেশন করে থাকেন। শিল্প সাহিত্য চর্চার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো গান লেখালেখির চর্চা এখানে অনেক কম। সে কারণে চট্টগ্রামে গীতিকারের অপ্রতুলতা আছে। তবে যারা লিখে যাচ্ছেন তারা বেশ সফল। চট্টগ্রামের গীতিকবিতা চর্চায় অনেক গীতিকার অবদান রেখেছেন, যাঁদের গানে লোকজ সুর ও আধুনিক ভাবনার সমন্বয় দেখা যায়।
চট্টগ্রামের গীতিকবিতা চর্চার শক্তি প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে–১. আঞ্চলিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য ২. লোকজ ও বহুসাংস্কৃতিক সুরভিত্তি ৩. সমুদ্র–পাহাড়–বন্দরকেন্দ্রিক অনন্য ইমেজারি। তবে এই ঐতিহ্যের একটি বড় দুর্বলতা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণের অভাব। অনেক মূল্যবান লোকগান ও গীতিকবিতা এখনো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে এবং সেগুলোর যথাযথ আর্কাইভ তৈরি হয়নি। সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি, গীতিকবিতা উৎসব আয়োজন এবং তরুণ গীতিকারদের জন্য লিরিক কর্মশালার আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ‘বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদ চট্টগ্রাম’ এসব কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসতে পারে। চট্টগ্রামের গীতিকবিতা আসলে এই জনপদের সাংস্কৃতিক ডায়েরি। সাম্পানের দাঁড়ের ছন্দ থেকে শুরু করে আধুনিক নগর জীবনের শব্দ সবই এখানে সুর হয়ে ধরা দেয়।
অগোচরে অনিচ্ছায় যদি কোনো উল্লেখযোগ্য গীতিকবির নাম এই লেখায় বাদ পড়ে যায়, সেজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। তবে আগামীতে বৃহৎ কলেবরে প্রকাশের সময় নামগুলো যুক্ত করার আশা রাখি। এ ছাড়াও নানা বিষয়কে অনুষঙ্গ করে প্রতিনিয়ত গান রচনায় আত্মনিয়োজিত আছেন অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নবীন গীতিকবি। হয়তো তাদের অনেকের হাত ধরে রচিত হবে আগামী চট্টগ্রামে আরো এক সমৃদ্ধ গীতিকবিতা সম্ভার। ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করে এবং অতীতের নস্টালজিয়ায় আবদ্ধ না থেকে যদি নতুন প্রজন্মের গীতিকাররা তাদের সময়কে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করতে পারেন, তবে চট্টগ্রামের গানের ধারা ভবিষ্যতেও বাংলা সংগীত সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ সমুদ্রের শহরের মানুষ জানে ঢেউ যেমন থামে না, তেমনি গানও থামে না।
তথ্যসূত্র : ১. প্রবন্ধ–সংগীতে চট্টগ্রাম– বাসুদেব খাস্তগীর, ২. আবদুল গফুর হালী, গানের সংকলন (বিভিন্ন প্রকাশনা), ৩. রমেশ শীল, রমেশ শীলের গান, চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংকলন, বাংলাদেশ বেতার, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সংগীত আর্কাইভ; বিভিন্ন অনলাইন উৎস: ইউটিউব, ফেসবুক ও ডিজিটাল সংগীত প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত চাটগাঁইয়া গান ও সমকালীন ব্যান্ড সংগীত।
লেখক : কবি ও গীতিকার












