
‘ও ভাই আঁরা চাটগাইয়া নওজোয়ান/ দইজ্জার কূলত বসদ গড়ি/ শিনা–দি ঠেহাই ঝড় তোয়ান/ ফাহার ফরবত সাইগর নদী/ ফরানো দে দোলা…/ মিন্নত গড়ি ফসল ফলাই আঁরা / ভরাই সোনার দউলা / ফুরুত ফুরুত হাসি ফুঁডাই / গলাত তুলি গান…’
চাটগাঁ ভাষায় রচিত এ–লোকসংগীতে চাটগাঁইয়া ভাষা ও সংস্কৃতির একটা পেন্সিল–স্কেচ পাঠকের সামনে ফুটে ওঠে। চাটগাঁইয়া বলতে আপাতত আমরা বুঝবো ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব কাছিম আলী খাঁ এর নিকট থেকে ইংরেজরা ফেনি নদী থেকে নাফনদ পর্যন্ত যে–জনপদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশাসনিক জেলার মর্যাদা দেয় এবং বর্তমানে (১৯৮৪ থেকে) যে–জনপদ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা এবং চট্টগ্রাম উত্তর–দক্ষিণ ও কক্সবাজার নিয়ে ছয় জেলায় বিস্তৃত। কিছুটা বৈচিত্র্য থাকলেও বোধগম্যতার বিচারে এই ছয় জেলার ভাষাকেই আমরা চাটগাঁইয়া ভাষা বলতে পারি। সুনীতিকুমার বলেন, ‘কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে’। সুতরাং, সমাজবদ্ধ মানুষের মহৎ সৃষ্টি ভাষা। ভাষার শ্রেষ্ঠ ব্যবহার হয় সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ পর্যায়ে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট এম. ম্যাকাইভারের মতে, ‘আমরা যা, তাই হলো আমাদের সংস্কৃতি’। মোতাহের হোসেন বলেন, ‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত–মার্জিত লোকের ধর্ম’। কাজেই আধুনিক বাস্তু–ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রমতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাস্তু–পরিবেশের বৈশিষ্ট্য–প্রভাবে সৃষ্ট ভাষা–সংস্কৃতিই চাটগাঁইয়া ভাষা ও সংস্কৃতি।
বাংলা উপভাষাভাষা চর্চার প্রবাদপুরুষ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন ‘দ্যা লিংগুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ (১৯০৩) গ্রন্থে দক্ষিণ–প্রাচ্য বাংলা সম্পর্কে লিখেন: ‘বঙ্গোপসাগরের পূর্ব তীর বরাবর নোয়াখালি জেলা, চট্টগ্রাম জেলা এবং আকিয়াব জেলার উত্তরাংশ যা বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) রাজ্যের অন্তর্গত, অঞ্চলগুলোতে যে–স্বাতন্ত্র্যসূচক (পিকিউলিয়ার) বাংলা উপভাষা কথিত হয় তাকে আমি বলেছি দক্ষিণ–প্রাচ্য। এখানে বিশেষত চট্টগ্রামে এবং আকিয়াবে প্রচলিত অপভ্রংশের বিকাশ প্রাচ্যবঙ্গীয় ভাষার চূড়ান্ত সীমায় অগ্রসর হয়েছে। ভাষার দৃশ্যমান ব্যবধান এতো বেশি যে, বাংলার অন্য কোনো অঞ্চলের বাঙালি সচরাচর এভাষা বুঝতে পারেন না। চট্টগ্রামীর কাছে এই উপভাষা চাটগাঁইয়া নামে পরিচিত, … পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা একটি উপ–উপভাষায় কথা বলেন, …পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় দক্ষিণ–প্রাচ্য বাংলা ভাষাটি একটি সংযোগকারী ভাষা (লিঙ্গুয়াফ্রাংকা) রূপে ব্যবহৃত হয়, এছাড়াও অনেক তিব্বতি–বর্মি ভাষা স্রোত এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত’। গ্রিয়ার্সন দক্ষিণ–প্রাচ্য বাংলা ভাষার চারটি অঞ্চল: নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, আকিয়াব এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম (চাকমা) এর কথা বললেও আকিয়াবের ভাষার কোনো নমুনা সংকলন করেননি। চাকমা সাব–ডায়েলেক্ট–এর দুইটি নমুনা (৭৪ ও ৭৫) এবং নোয়াখালী অঞ্চলের পাঁচটি নমুনা সংকলন করেন। অথচ চট্টগ্রামের ভাষাকে তিনি সমগ্র দক্ষিণ–প্রাচ্য বাংলার লিঙ্গুয়া–ফ্রাংকা বলে স্বীকার করে নেবার পরও জে.ডি অ্যান্ডারসন দ্বারা সংগৃহীত মাত্র দুটো নমুনা (৬৭ ও ৬৮) সংকলন করেন। গ্রিয়ার্সন পূর্ববঙ্গীয়তে সন্দ্বীপের (৫৬, ৫৭ ও ৫৮) তিনটি নমুনা সংকলন করেন, কিন্তু দক্ষিণ–প্রাচ্য বাংলার কক্সবাজার–মহেশখালী–কুতুবদিয়ার ভাষার কোনোও নমুনা সংকলন করেননি। চাকমা ছাড়া আরও যে–ক’টি তিব্বতি–বর্মি নৃগোষ্ঠী–ভাষা এবং খোট্টা উপভাষা চট্টগ্রামে বিদ্যমান আছে, সে–কথা গ্রিয়ার্সনে নেই।
মাতৃভাষা প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ শতক জুড়ে চাটগাঁ ভাষা নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন বসন্তরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও কেউকেউ। তবে চট্টগ্রামী উপভাষা নিয়ে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের আগে কেউ বিস্তৃত আলোচনা করেননি। এরপর চট্টগ্রামের ভাষা নিয়ে দুটো বই প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। আবদুররশিদ ছিদ্দিকীর চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব আর ড. মুহম্মদ এনামুল হকের চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্য–ভেদ। এনামুল হকের গ্রন্থনামেই স্পষ্ট হয় তিনি বাংলার উপভাষা হিসেবে চট্টগ্রামের ভাষার রহস্য উদঘাটনে ব্রতী হন আর নমুনা হিসেবে গ্রিয়ার্সনের সংগৃহীত গল্পের সাথে একটি মুসলিম ভাষারীতির যে–গল্পটি সংকলন করেন তাও ফটিকছড়ি অঞ্চলের ভাষার নমুনা। তারপর দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে ড. মনিরুজ্জামান প্রকাশ করেন চট্টগ্রামের উপভাষা (২০১৩)। এবইয়েও বর্তমান চট্টগ্রাম জেলার ভাষা–বিশ্লেষণ করেছেন; তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজার জেলার ভাষা আলোচনায় অগ্রসর হননি। অথচ অন্যত্র ড. সলিমুল্লাহ খান লেখেন, ‘সিরাজুল হক সিরাজ যে ভাষায় লিখিয়াছেন তাহার চল দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার একটা বড় অংশ জুড়িয়া আছে। ইহার সামান্য নাম রোসাঞি ভাষা। চাটিগ্রাঞি ও রোসাঞি চট্টগ্রামীন বাংলার দুই রূপ। এই দুই রূপভাষীরা একে অপরের ভাষারূপ বুঝিতে পারেন’। আজপর্যন্ত সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের চাটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে মাঠকর্মভিত্তিক কোনো গবেষণা গ্রন্থ আমাদের চোখে পড়েনি। বিদেশে এনিয়ে পিএইচডি–অভিসন্ধর্ভ লেখেন নারিহিকো উচিদা (জার্মানীতে), রবীন্দ্র কুমার দত্ত (ত্রিপুরায়) এবং অলক চক্রবর্তী (ত্রিপুরায়)। ড. মাহবুবুল হক প্রণীত চাটগাঁইয়া সঅজ পন্না (২০২৩) মূলত অনুবাদ পদ্ধতিতে ভাষা শেখার সহায়ক বই। কোথাও চাটগাঁ ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ পাওয়া যায়নি।
আশার কথা চাটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে উনিশ শতক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশি ও বিদেশি অনেক ভাষাবিজ্ঞানী, অভিধানকার এবং গবেষক কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন: পার্জিটার, পূণ্যল্লোক রায়, মুহম্মদ আবদুল হাই, দীননাথ সেন, আবদুল হক চৌধুরী, ড. আহমদ শরীফ, ড. আহমেদ মাওলা, ড. শফিউল আজম ডালিম, ড. শ্যামল কান্তি দত্ত, ড. ফারজানা ইয়াছমিন, শিমুল বড়ুয়া, শামসুল আরেফীন প্রমুখ। সম্প্রতি প্রমিত বাংলার সাথে এর ধ্বনিগত ও ব্যাকরণগত ব্যাপক পার্থক্যের কারণে ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক, সরোয়ার কামাল এবং আরও অনেকে ‘চাটগাঁইয়া একটি স্বতন্ত্র ভাষা’ প্রমাণ করার জন্য বিক্ষিপ্তভাবে দুএকটা প্রবন্ধ লিখছেন। তবে বাস্তবে তা যতটা মাতৃভাষা প্রেমের সর্বগ্রাসী আবেগজাত, ততটা ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিজাত নয়। ইতোমধ্যে চাটগাঁ ভাষার চারটি অভিধানও প্রণীত হয়েছে; এগুলো হল আহমেদ আমিন চৌধুরী সংকলিত চট্টগ্রামী বাংলার শব্দসম্ভার (১৯৯৮), নূর মোহাম্মদ রফিক সম্পাদিত চট্টগ্রামের অঞ্চলিক ভাষার অভিধান (২০০১), আহমেদ আমিন চৌধুরী সংকলিত চট্টগ্রামী ভাষার অভিধান ও লোকাচার (২০০৯), মাহবুবুল হাসান সম্পাদিত চট্টগ্রামী বাংলার অভিধান (২০১০)। এসব অভিধান সংকলিত হওয়ার অনেক আগেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে (১৯৬৫) চাটগাঁ ভাষার অনেক অধিক শব্দ ব্যুৎপত্তি–ব্যবহারসহ সংকলিত হয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নয়নচারা (১৯৪৫) গল্পগ্রন্থের ‘জাহাজি’ গল্পে, আলাউদ্দিন আল আজাদের কর্ণফুলী (১৯৬২) উপন্যাসে, আবুল ফজলের ‘রহস্যময় প্রকৃতি’ (১৯৬৪) গল্পে, আহমদ ছফা তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭)-তে, সেলিনা হোসেনের পোকামাকড়ের ঘরবসতি (১৯৮৬), আজাদ বুলবুলের অগ্নিকোণ (২০১৮) মনওয়ার সাগরের ষোলশহর জংশন ও শাটল ট্রেন (২০১৮), হরিশংকর জলদাসের দহনকাল (২০১০) এবং আরও কয়েকটি উপন্যাসে চাটগাঁইয়া ভাষার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কাফি কামালের মেইট্টাল (২০১১) গল্পগ্রন্থ পুরোপুরি চাটগাঁইয়া ভাষায় লেখা প্রথম ও সফল একটি গ্রন্থ। আহমদ ছফার ওঙ্কার (১৯৯৫) উপন্যাসটিকে চাটগাঁইয়া ভাষায় রূপান্তর করে প্রকাশ করেছেন (২০২২) তাঁর–ই স্নেহধন্য ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার। সিরাজুল ইসলাম আজাদ, সন্জীব বড়ুয়া, উৎপল কান্তি বড়ুয়া, ওমর কায়সার, শফিউল্লাহ নান্নু, তালুকদার হালিম, রেদোয়ান মাহমুদ, কমরুদ্দিন আহমদ, নিতাই চন্দ্র রায়, বিকিরণ বড়ুয়া প্রমুখ কবিতা–ছড়া–গানে চাটগাঁইয়া ভাষার ব্যবহার করে চলছেন।
চাটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও থেমে নেই। লেডি সুজান ম্যালোন আন্তর্জাতিক ভাষা সংস্থা সিল (ঝওখ)-এর এই দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার ভাষা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের ভাষার ব্যাকরণগত মানোন্নয়ন এবং একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ড. মো: আবুল কাসেমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় চাটগাঁ ভাষা পরিষদ (২০০৭)। সংগঠনটি ২০১০ ও ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে দুটো সেমিনার করে এবং সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধ–আলোচনার সংকলন চাটগাঁ ভাষার রূপ–পরিচয় (২০১২) বইটি প্রকাশ করে। এর পরে দীর্ঘ একযুগে প্রতিষ্ঠানটির আর প্রামাণ্য কোনো কর্মকান্ড চোখে পড়ে না। সাম্প্রতি কথন প্রজেক্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের যুগে চাটগাঁইয়া ভাষাকে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের জন্য গবেষকেরা কাজ করছেন। নিভৃতে–নীরবে হয়তো আরও অনেক গবেষক নিষ্ঠার সাথে কাজ করছেন, যা আমাদের অজানা। আমরা জানি বাংলাদেশে পরিভাষা চর্চার প্রবাদপুরুষ: ড. মুহম্মদ এনামুল হক, মনসুর মুসা ও সুপ্রতীম বড়ুয়া; তিনজনই চট্টগ্রামের সন্তান। আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান বাংলাদেশি ভাষাবিজ্ঞানীদের অন্যতম ড.শিশির ভট্টাচার্য ও ড. মুহম্মদ তসলিম উদ্দীনও ‘চাটগাঁইয়া পুআ’। তবে চাটগাঁ ভাষায় প্রবাদ আছে: ঘরের গরু ঘাটার ঘাস খায় না। তাই হয়তো এতো বৈচিত্র্যময় (পিকিউলিয়ার) চাটগাঁ ভাষা নিয়ে এই চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগ্রন্থ (গবেষণা শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ: গরু খোঁজা) প্রণীত হচ্ছে না। তবে আশার কথা তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
প্রবাদ থেকেই প্রমাণ চাটগাঁ ভাষা নিয়ে এই উদাসীনতা এখানকার সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পাহাড়–নদী–সাগর এই তিন রকম ভূপ্রকৃতি মিলে এখানকার মানুষকে একটু আনন্দপ্রিয় উদাসী বাউলা করে তোলে। আতিথেয়তা, মেজ্জান আর আড্ডায় এঁদের জুড়ি মেলা ভার। এঁরা সংগ্রাম করে সাগর পেরিয়ে সীতা উদ্ধার করে বটে; ক্ষণিক পরেই সীতার সম্মান রাখবার কালে আড্ডায় বিভোর, কিংবা বলী খেলার মেলায় গিয়ে বীররসে উদ্দীপিত হয় আবার বৈশাখী মেলায় মাটির হাড়িপাতিল কিনে সংসারি হয়ে ঘরে ফেরেন। চাটগাঁইয়া সংস্কৃতিতে বিয়েতে গ্রামের পর গ্রাম–হাজার মানুষকে দাওয়াত করে খাওয়ানো হয়, আবার সুযোগমতো পুরো আপ্যায়ন খরচ কনে পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিতেও আমরা কসুর করি না। হিন্দু সংস্কৃতিতে মনসা পুজোয় পাঁঠা বলি দেওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক সময় বখরি–ঈদকেও হার মানায়, যেটা বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বাস এই চট্টগ্রামে। হিন্দু–মুসলিম–বৌদ্ধ–খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সহাবস্থানে চাটগাঁইয়া সংস্কৃতিতে চমৎকার এক সম্প্রীতির পরিবেশ বিরাজ করে। বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে বিয়ের অনুষ্ঠানে উভয়পক্ষের পরিচিতি অনুষ্ঠান এখানকার উন্নত সংস্কৃতির পরিচায়ক। প্রথমে বরপক্ষের একজন দাঁড়িয়ে বরের পরিচয়, ঠিকানা বলার পাশাপাশি বরের পরিবারের সুখ্যাতি, গ্রামের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের নাম–পরিচয় তুলে ধরেন। এভাবে কনেপক্ষের একজন বলেন এবং ধারাবাহিকভাবে উভয়পক্ষ বলতে থাকেন। এতে করে নতুন প্রজন্মের নওজোয়ানেরা তাদের পূর্বপুরুষগণের খ্যাতি–কৃতী জেনে অনুপ্রাণিত হয়। বৌদ্ধমন্দিরগুলোতে বিচিত্র বইয়ের লাইব্রেরি থাকে এবং প্রায়শই মন্দিরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংকলন প্রকাশিত হয়। জ্ঞানচর্চার এই বৈশিষ্ট্য অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে অনেটা অনুপস্থিত। অথচ সবাই জানি বিত্তে নয় চিত্তে বড় না হলে কোনো জাতির উন্নতি অসম্ভব। অন্যদিকে দুবাইয়ে কর্মসংস্থানের কারণে চট্টগ্রামের গ্রামীণ জীবনেও বিলাসিতা বেড়েছে। বাড়িতে সকালের নাস্তা না খেয়ে দোকানের চায়ে চুবিয়ে পরোটা খেয়ে সকাল শুরু করতে না পারলে নিজেকে যেনো চাটগাঁইয়া মনে হয় না। ভান্ডারি গান, মারিফতি গান, বাউল গান আর ডিজে পার্টি যাই হোক না কেন চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক গান দু’এক–খানা না হলে আসর জমে না। এর অন্যতম কারণ বাংলা ভাষা থেকে চাটগাঁ ভাষা দ্রুত লয়ের। ভাষা সুরেলা বা স্বরপ্রধান হওয়ার কারণে এখানকার মানুষের স্বভাব–চরিত্রও হিংসুটে বা ঝগড়াটে নয়। একখান চ–বর্গীয় গালি দিয়েই আমাদের রাগ নেমে যায়, মারামারি খুনোখুনির দিকে যাবার প্রয়োজন হয় না। বাংলা ভাষার শুটকী হয়ে যায় ‘ফু.উনি’ । এই দীর্ঘস্বরের প্রভাবে এখানকার মানুষও দিলদরিয়া। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ভাষা এমনকি উপভাষা নিয়েও পূর্বতন সকল ধারণারই পরিবর্তন ঘটেছে এবং আরও কত ঘটছে। তাই চাটগাঁ ভাষা ‘ভাষা না উপভাষা’ এই বিতর্কে বিভ্রান্ত না হয়ে চাটগাঁইয়া ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ–উন্নয়নে সচেষ্ট গবেষণায় নিষ্ঠার সাথে নিয়োজিত হতে চাটগাঁয়া নওজোনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: ভাষাবিজ্ঞানী ও কবি; সহকারী অধ্যাপক, সিইউএফ কলেজ, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম












