
আমার শিল্পচর্চার আরাধ্য বিষয় আবৃত্তি। কাব্যসমুদ্রে ডুবে থাকা, আবৃত্তি করা, আবৃত্তির প্রশিক্ষণ দেয়া, আবৃত্তি নিয়ে লেখালেখি করা এবং আবৃত্তির কবিতা–সংকলন সম্পাদনা করাও একটা উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে গেছে।আবৃত্তির জন্য কবিতা বাছাই করতে গিয়ে বারবার যার কাব্যগ্রন্থগুলো হাতে উঠে এসেছে তিনি হলেন আল মাহমুদ। দারুণ মুগ্ধতার সাথে এই কবির পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি আবৃত্তি করেছি। কী ছিল না সেসব কবিতায়। দেশপ্রেম, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন, একুশ, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, চিরায়ত গ্রাম, আবহমান বাংলা, নিসর্গ, নারী, প্রেম, দ্রোহ, ইসলামী ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ, মৃত্যু–চেতনা, সমকালীনতা ইত্যাদি বিষয়–আশয়কে স্বতন্ত্র কাব্য–ভাষায় ছন্দে–গন্ধে–বর্ণে পরিপূর্ণ কাব্যরসে পাঠককে উপহার দিয়েছেন তিনি। নাগরিক যন্ত্রণা থেকে মায়ের কাছে, গ্রামে তথা প্রকৃত দেশের কাছে প্রত্যাবর্তনের জন্য তাঁর যে কাব্যিক আকুতি তা আমাদের বোধের চেতনার তারে ঝংকৃত হয়েছে, গ্রামে থাকা মায়ের জন্য তাঁর স্মৃতির আবেগের কাব্যভাষা আমাদের হৃদয়ে দ্রবীভূত হয়ে চোখ বেয়ে অশ্রু হয়ে ঝরেছে। আল মাহমুদের শুধু কবিতা নয়, প্রবল কৌতূহল ও আগ্রহ নিয়ে গল্প–উপন্যাসের মত তার জীবনও পাঠ করেছি। আর জেনেছি তিতাস পাড়ের যুবকের ভাগ্য কীভাবে এসে আছড়ে পড়েছে কর্ণফুলী নদীর তীরে। দারিদ্র্য আর রুটিরুজিকে সঙ্গী করে চট্টগ্রামে বেশ কয়েক বছরের অবস্থান ছিল কবি আল মাহমুদের। এই শহরেই তিনি আর্ট প্রেসে এবং সিগনেট প্রেসে প্রুফ রিডারের চাকরি করতেন। ফিরিঙ্গিবাজার, কর্ণফুলি নদী, পাথরঘাটা, সাধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বোস ব্রাদার্স, লালদীঘী, আন্দরকিল্লা এসব ছিল তার বিচরণক্ষেত্র। ‘সোনালী কাবিন’ আর ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবির অন্যতম সেরা এই দুটি কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা চট্টগ্রামেই লেখা হয়। তার ‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থটিও প্রকাশ করে চট্টগ্রামের ‘বইঘর’। চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ–অনুষঙ্গ নানাভাবে এসেছে তার কবিতায়। যেমন তিনি লিখেছেন –
কোথায় পাবো লঙ্কাবাটা
কোথায় আতপ চাল
কর্ণফুলীর ব্যাঙ ডাকছে
হাঁড়িতে আজকাল। (ঝালের পিঠা)
অথবা,
সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্ণফুলীর কূলটায়
দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি
ফেরেস্তারা উল্টায়। (পাখির মতো)
অথবা,
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থরথর।
মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ,
পাথরঘাটার গীর্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ?
—————————————
পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লালদিঘিটার পার
এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার। (পাখির কাছে ফুলের কাছে)
এভাবে বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ কবি আল মাহমুদের কবিতায় চট্টগ্রামের সমুদ্র, নদী, পাহাড় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো অনিবার্যভাবে কবিতার প্রয়োজনে জায়গা করে নিয়েছে। চট্টগ্রামকে যথার্থ অর্থেই তিনি খুব আপন করে নিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের সাথে তার এই আত্মীয়তার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও অক্ষুন্ন থাকে। বলা যায় চট্টগ্রাম ছিল কবি আল মাহমুদেও সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় ঘর।
কবি আল মাহমুদের সাথে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা এই আবৃত্তির মাধ্যমেই। আমি তাঁর কবিতার মুগ্ধ পাঠক। একজন ভক্তের মতোই এই সম্পর্কটা ছিল দূরান্বয়ী। কিন্তু ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য অর্জনের সূচনাটা করে দিয়েছিল আমার স্নাতক অধ্যয়নের চট্টগ্রাম কলেজ। ১৯৮৭ সাল, আমি স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের শেষ পর্যায়ে। কলেজের সাংস্কৃতিক উৎসবে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অনেক তারকা শিল্পীকে হারিয়ে আমি প্রথম হয়েছি। সেই উৎসবের প্রথম পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি কবি আল মাহমুদ। চট্টগ্রামের আবৃত্তি অঙ্গনে আমার বিশিষ্ট হয়ে ওঠা, কলেজের শিক্ষক এবং ছাত্র–ছাত্রীদের কাছে পৌঁছার এবং আবৃত্তিতে প্রথম স্থান অর্জন করার কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমাকে আবৃত্তি করতে বললেন। অপেক্ষায় রইলাম সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের, কখন আসবেন কবি, কখন আসবেন কবি…..। অতপর কবি আসলেন অনুষ্ঠান স্থলে। চেহারায় যেন কোন কিছু জয় করার দীপ্ত প্রভা। তখন কিন্তু সত্যিই কবি আল মাহমুদের খ্যাতির পতাকা পত্পত্ করে উড়ছে। সদ্য তিনি তাঁর ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ কাব্য গ্রন্থের জন্য ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। যা হোক, অনুষ্ঠানে ফিরে আসি। অনুষ্ঠান মঞ্চে প্রধান অতিথির আসনে কবি আল মাহমুদ। তাঁর বক্তৃতার ঠিক আগেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আমাকে মঞ্চে আহ্বান জানালেন আবৃত্তি পরিবেশনের জন্য। আয়োজকরা আমাকে কার কার কবিতা আবৃত্তি করতে হবে তা জানিয়ে দেননি। পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে শুরু করলাম, বাংলা কাব্য ভুবনের স্বরাটের সামনে তাঁরই কবিতার আবৃত্তি। আমার জন্যে এবং যে কোন আবৃত্তিশিল্পীর জন্যে এ এক দারুণ পুলকের বিষয়। শুরু করলাম তাঁর সদ্য ফিলিপ্স পুরস্কার পাওয়া কাব্যগ্রন্থ ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ থেকে ‘সিকান্দর আবু জাফর স্মরণে’ কবিতা দিয়ে। এরপর আবৃত্তি করলাম একই কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘সাহসের উপমা’। দু’টি কবিতা আবৃত্তি করার পর আমার কানে ধ্বনিত হলো দু’টি শব্দ বাহ্ বাহ্ কবিরই কণ্ঠ থেকে। এবার আমাকে সমাপ্তি টানতে হবে। কারণ শিক্ষক–ছাত্র–ছাত্রী এবং কলেজের বাইরের এক বিশাল মানবস্রোত অধীর আগ্রহে বসে আছে কবি আল মাহমুদের বক্তব্য শোনার জন্যে। কিন্তু আমাকে যে আল মাহমুদের লেখা আমার একটি ভীষণ প্রিয় কবিতার আবৃত্তি কবিকে শোনাতেই হবে। সঞ্চালককে কোন সুযোগ না দিয়ে মাইক্রোফোনে আমি নিজেই বললাম– “এটি আমার আজকের শেষ পরিবেশনা, আমি আমার প্রিয় কবি আল মাহমুদের আরো একটি কবিতা আবৃত্তি করছি।” শুরু করলাম – ‘‘একদা এমন ছিল যে, আমার চোখই ছিল সমস্ত দুঃখের আকর ….. ’’ এরপর আমি যখন আবৃত্তি করতে লাগলাম– “দুঃখ পেলে তারা একবারেই কাঁদতেন না, এমন নয় সন্তপ্ত অথবা সন্তানহারা হলে তারাও কাঁদতেন। তাদের চোখও ফেটে যেতো“- এইটুকু আবৃত্তি করতেই কানে ভেসে এল কারো ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। এই শব্দ মঞ্চ থেকেই আসছে। আড়চোখে একটু দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম কবি আল মাহমুদ কাঁদছেন আর রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন। এই দৃশ্যকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করে আমি আমার আবৃত্তি অব্যাহত রাখলাম– “একবার আমার কনিষ্ঠতমা বোন নিউমোনিয়ায় মারা গেলে আম্মা অনেকদিন কেঁদেছিলেন, সে কান্না, আমি ভুলিনি।” এবার কবি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তাঁর অশ্রুবান আমার বোধের জগতে এসেও আছড়ে পড়লো। আমার গলাও ধরে এল। আমার আবৃত্তি শৈলী যাতে বিঘ্নিত না হয় সে জন্যে নিজেকে সামলে নিয়ে পরিবেশনাকে এগিয়ে নিয়ে গেলাম। লাউড স্পীকারে আমার কণ্ঠে ধ্বনিত হতে লাগলো সেই কবিতা–
আমরা দু’দিক থেকে দু’জনকে দেখি।
আমার মা’র শুধু অভিযোগ আর অভিযোগ
একবার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। একবার বোন আর
বহমান কালের বিরুদ্ধে। তারপর
অবিরল কান্না।
……………………………..
আমি অবশ্য সান্ত্বনাচ্ছলে তাকে ধমক লাগাই।
তার কান্না থামে না। (আমার চোখের তলদেশে/আল মাহমুদ)
এদিকে কবিরও কান্না থামে না। আমি এক বিরল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আবৃত্তি শেষ করলাম। সঞ্চালক কবিকে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে আহ্বান জানালেন। কবি রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে পোডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়ালেন, চোখে চশমা দিয়েই কোন সম্বোধন ছাড়াই বললেন– “মোসতাক আমাকে খুব কাঁদালো। ভালই হলো, একটা বিষাদের মেঘ জমাট হয়ে বুকটা ভারি করে রেখেছিল, আজ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লো, এখন বেশ হালকা লাগছে।” বলা যায় এই আবৃত্তিই কবি আল মাহমুদের সাথে আমার নিবিড় সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে দিয়েছিল। তারপর? তারপর সেই বহুলশ্রুত উক্তির মতই বলতে হয়– “সেই থেকে শুরু, বাকিটা ইতিহাস।” এরপর থেকে এমন কোনদিন হয়নি আমি ঢাকা গেছি কিন্তু কবির সঙ্গে দেখা করিনি। কবি আল মাহমুদ চট্টগ্রাম এসেছেন কিন্তু আমাকে স্মরণ করেননি কিংবা তাঁর সঙ্গ মেলেনি। একে অপরের প্রতি এই ভালবাসার নিয়ামক শক্তি ছিল কবিতা এবং আবৃত্তি। আমার প্রতি তাঁর সস্নেহ উদারতা এবং আমাকে নিবেদিত তাঁর কিছু পঙ্ক্তিমালা আমাকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল। আমি লেখক নই, তবুও এই অযোগ্যের প্রতি এই প্রীতি কেন তা আমার বোধগম্য হতো না। তবে কবি যে কখনও এর কারণ একেবারেই বলেননি তা নয়। তাঁর সাথে আলাপচারিতায় অনেককে নিয়ে আড্ডায় তিনি সাহিত্যের রস দিয়ে ইঙ্গিতে অনেক কিছুই বলেছেন। আর তা হলো আমি তাঁর কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠক, আমার কাব্যবোধে পরিপক্কতা রয়েছে, আমি একজন সফল আবৃত্তিকার ইত্যাদি। তাছাড়া আমি কবি আল মাহমুদের সৃষ্টিকর্মের এবং তাঁকে নিয়ে কোথায় কী লেখা হয়েছে তার অনুপুঙ্খ তথ্য রাখতাম। এমনও হয়েছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাক্ষাৎকারে তাঁকে নিয়ে এক বাক্যে কী প্রশংসা করেছেন, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর কবিতা নিয়ে কী দুর্দান্ত লিখেছেন, শিবনারায়ণ রায় একজন খাঁটি কবি হিসেবে তাঁকে কতটা মর্যাদা দিয়েছেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায় কী বললেন, সুমিতা চক্রবর্তী কী লিখলেন ইত্যাদি নানারকম খবরাখবর তাঁর কাছে পৌঁছানোর প্রথম সংবাদবাহক ছিলাম আমি।
আশি–নব্বই দশকের শেষের দিকে কবি আল মাহমুদ খুব বেশি বেশি চট্টগ্রাম আসতেন। চট্টগ্রামে আসলে কেন জানি না আমাকেই ডেকে নিতেন। অনেকেই আমাকে কবির চট্টগ্রামস্থ প্রতিনিধি বলে মজা করতেন। চট্টগ্রাম ছিল তাঁর স্বপ্নের জায়গা। চট্টগ্রামে একটা বাড়ি করার কথা বারবার বলতেন তিনি। এই নগরীতে কবি আল মাহমুদ আমন্ত্রিত হয়ে নানা অনুষ্ঠানে আতিথ্য গ্রহণে ব্যস্ত থাকলেও তাঁর একান্ত সান্নিধ্যলাভের সুযোগ হতো এবং আড্ডা চলতো। কবি আল মাহমুদকে চট্টগ্রামের সাহিত্য–সাংস্কৃতিক সংগঠনের মানুষজন হোটেলে না রেখে কারও বাসায় রাখতেন। আল মাহমুদ ভাইও বাসায় থাকতে পছন্দ করতেন। তেমন একটি উল্লেখযোগ্য বাসা ছিল চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সংগীত অনুরাগী আকবর খানের পাঁচলাইশের বাসাটি। অনেক দেশবরেণ্য ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাময়িকভাবে বসবাসের কারণে আকবর খানের পাঁচলাইশের বাসাটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
এমনি একটি দিন ১৯৮৯ সালের ৯ জুন। আকবর খানের বাসায় কবি আল মাহমুদের সঙ্গে আমরা ৫/৬ জন সাহিত্য ও সংস্কৃতি–পাগল তরুণ/যুবক কবিতার আড্ডা দিচ্ছিলাম। কবি নিজের কবিতা পড়ছিলেন, আমরা ২/৩ জনও তাঁর কবিতা পাঠ বা আবৃত্তি করছিলাম। কবি আল মাহমুদ একে একে পড়ে যাচ্ছিলেন তাঁর কাব্যসমগ্র থেকে – ‘ফেরার পিপাসা’, ‘ফেরার সঙ্গী’, ‘আমার সমস্ত গন্তব্যে’, ‘আমি আর আসবোনা বলে’ ইত্যাদি কবিতা। তবে লক্ষ করলাম পড়ার জন্য তাঁর বেছে নেয়া কবিতাগুলো তাঁকে খুব স্মৃতিকাতর করে তুলেছিল। বিশেষ করে ‘আমি আর আসবোনা বলে’ কবিতাটি পড়ার সময় দেখলাম কবি ওনার হাতে থাকা টাওয়েল দিয়ে চোখ মুছছেন। এরপর একটা রহস্যময় নীরবতার বিরতি। কবি আল মাহমুদ তাঁর কক্ষে থাকা টেবিলের কাছে গিয়ে একটা লেটার প্যাড আর কলম নিলেন। তারপর লিখতে শুরু করলেন। খুব দ্রুত লেখা শেষ করেই লেটার প্যাড থেকে কাগজটা ছিঁড়ে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়। কাগজটা হাতে নিয়ে প্রথমে নজর কাড়লো তার হস্তাক্ষরে লিখা আমার নামের প্রতি। তারপর এগার লাইনের লেখাটি প্রায় এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। আমি অশ্রু টলমল চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ততক্ষণে তিনি ওই ঘরে উপস্থিত অন্যদের সাথে আলাপে মশগুল হয়ে গেছেন। এবার কাগজটা চোখের কাছে মেলে ধরে আবার পড়তে শুরু করলাম। আমার প্রিয় কবি আল মাহমুদ লিখেছেন –
মোসতাক,
কবিতার পথে কেন এসেছ ?
এ পথ, দীর্ঘ দুঃখপূর্ণ
ভালবাসার পথ। প্রতিদানহীন
রক্ত পিচ্ছিল রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে
পড়তে পড়তে মনে হবে, কেন
এলাম এ পথে। সান্ত্বনা শুধু
এটুকুই, অনেক অযাচিত হাত
তোমাকে তুলে ধরে প্রতিদান
পেতে চাইবে। যে ঋণ শোধ
করতে গিয়ে মনে হবে তুমি
নিঃস্ব। প্রতিশ্রুতিভঙ্গকারী।
আল মাহমুদ
৯/৬/৮৯
[ঠিক এক বছর পর চট্টগ্রামে একই ধরনের আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। দিনটি হলো ১৯৯০ সালের ২১ জুন। ওইদিন বিকেলে কবি আল মাহমুদ আন্দরকিল্লায় ‘গ্রন্থবিতান’ নামে আমাদের বইয়ের দোকানে এসেছিলেন। তখন গ্রন্থবিতান কবি–লেখকদের আকর্ষণের কেন্দ্র এবং আড্ডার জায়গা ছিল। ভাল মানের সাহিত্যের বইয়ের সহজপ্রাপ্যতা বিশেষ করে শিল্পতরু সহ অনেক দুষ্প্রাপ্য লিটল ম্যাগাজিন এবং শিল্পতরু প্রকাশনীর সব বই কেনার জন্য এখানে অনেকেই আসতেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবিদ আজাদ, হায়াৎ সাইফ, শাহাবুদ্দিন নাগরী প্রমুখ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসলে এই বই বিপণন কেন্দ্রে আসতেন। যাহোক, আল মাহমুদে ফিরে যাই। আল মাহমুদ গ্রন্থবিতানে এসেই আমার নাম ধরে ডাক দিলেন, বললেন – ‘চল, নিউমার্কেটে যাবো’। আমি রিক্সা নিতে চাইলাম, বললেন হেঁটে যাবেন এবং ঐতিহাসিক লালদিঘী মাঠ হয়ে যাবেন। লালদিঘীর মাঠ সংলগ্ন ফুটপাতে পা রাখতেই বললেন, তিনি মাঠের ভেতর দিয়েই হেঁটে যাবেন। একটু অবাক হলাম। হাঁটতে হাঁটতে সরকারি মুসলিম হাই স্কুল, কোতোয়ালি থানা অতিক্রম করে পাথরঘাটা আর ফিরিঙ্গবাজারের মুখে আসতেই কবি থমকে দাঁড়ালেন। আমি বুঝতে পারলাম, কবি আল মাহমুদ স্মৃতিকাতর হয়ে গেছেন। কারণ আমি কবির আত্মজৈবনিক স্মৃতি, অনেকের স্মৃতিচারণ এবং তাঁর সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি – এই এলাকাতেই আল মাহমুদ ভাইয়ের যৌবনকালের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দারিদ্র্য আর স্বল্প বেতনের পেশাগত ও যাপিত জীবন ছিল। হয়তোবা তাঁর স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে উঠেছে বইঘর, স্বত্বাধিকারী শফি আহমেদ, সিগনেট প্রেস, দৈনিক পূর্বকোণের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইউসুফ চৌধুরী, সাধুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, গল্পকার সুচরিত চৌধুরী, বিখ্যাত গায়ক শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব প্রমুখের কথা। আর বহুলপঠিত ও জনপ্রিয় ‘সোনালী কাবিন’ এবং ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ গ্রন্থের কবিতাগুলো রচনার কথা। ‘আহ্হা’ বলে একটা আবেগময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন। আমরা নিউমার্কেট পৌঁছে গেলাম। একটু ঘোরাঘুরি করে আমরা দোতলায় আইসক্রিম শপ লিবার্টিতে বসলাম এবং লিবার্টির স্পেশাল ফালুদা খেলাম। একটু পরেই আবার ফিরে আবার ফিরে আসলাম রহমতগঞ্জে কবি মুস্তাফা মুনীরুদ্দীনের বাসায়। চেইঞ্জ করে কাগজ নিয়ে বসলেন এবং কী যেন লিখে চললেন। লেখাটা শেষ করেই আমার হাতে দিলেন পড়তে। আমি পড়লাম। যদিও কথাগুলো আমার জন্য বিব্রতকর এবং সংকোচের তবুও এখানে উল্লেখ করছি। কারণ আজকের দিনে কথাগুলো তাঁর সাহচর্যের অনন্য ও মূল্যবান স্মারক। তিনি লিখেছন – ‘মোসতাক মানেই হল, চট্টগ্রাম। যখনই ভাবি চাটগাঁ বেড়াতে যাব। তখনই কয়েকটা আত্মীয়ের মুখ মনের আয়নায় ভেসে ওঠে। এর মধ্যে মোসতাকের বন্ধুসুলভ সুন্দর মুখটি সবার আগে। এবার মোসতাককে নিয়ে ঘুরলাম পরিচিত এমন একটা পায়ে চলা পথে যে পথের সাথে জড়ানো রয়েছে আমার জীবনের দিকনির্ণায়ক কত স্মৃতি। স্মৃতি, প্রেম ও পাপ। মোসতাক অবশ এসবের কিছুই জানেনা। লালদিঘির পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বললাম, কেমন আছো লালদিঘি? মনে নেই, তোমার জবাফুলের গাছগুলোর আড়ালে সে দাঁড়িয়ে আমাকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল? আস্তে বলো, মোসতাক শুনতে পাবে। আর সে শুনলে সে কি চাইবে আমি ফের চাটগাঁ আসি?’
আমার প্রতি তাঁর ভালবাসার এবং একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে আমাকে দারুণভাবে স্বীকৃতি দিয়ে অনুপ্রাণিত করার ঘটনা ঘটলো ৬ বছর পর। ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। হঠাৎ এক দুপুরে মোস্তফা তৌহিদ নামে আমার এক জুনিয়র বন্ধু (এখন আমেরিকা প্রবাসী) আমার বাসায় আসে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সেও পাগলের মত আল মাহমুদের কবিতার এবং আমার আবৃত্তির ভক্ত। দরজা খুলতেই অনেকটা নৃত্যের ভঙ্গিতেই তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ আমাকে একটু ভাবিয়ে তুললো। তার হাতে একটা বই। আমাকে বললো, “আপনি তো ছক্কা মেরে দিয়েছেন। আল মাহমুদ আপনাকে আরো অনেক উপরে তুলে দিয়েছেন।” তার এসব কথায় আমার কৌতূহলের আর অন্ত রইল না। আমার অবস্থা দেখে সে আর কালবিলম্ব না করে তার হাতের বইটার মলাট খুলে আমাকে দেখালো। দেখলাম কবি আল মাহমুদের সদ্য প্রকাশিত একটি কাব্যগ্রন্থ। নাম ‘আমি, দূরগামী’। সে বইটা খুলে একটা পৃষ্ঠা আমার চোখের সামনে মেলে ধরলো। পৃষ্ঠায় ছাপার অক্ষরে পড়তেই আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল, আমি বাকরুদ্ধ। তাতে লেখা– ‘উৎসর্গ, আবৃত্তিকার মোসতাক খন্দকার’। আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান কবি, বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ আল মাহমুদ আমাকে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন, একথা ৩০ বছর অতিবাহিত হবার পরও যখন মনে পড়ে আনন্দে মন ভরে যায়। এই আনন্দের পরিমাপ তারাই করতে পারবে যারা এই সম্মান প্রাপ্তির মূল্য বোঝে।
এখনও হৃদ্যতার সাথে গভীরতর বোধ নিয়ে তাঁর কাব্যের শৈল্পিক চর্চা করছি এবং তাঁর সান্নিধ্যধন্য হওয়ার স্মৃতিকথা লিখছি, এটা একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসাবে আমার জন্য গৌরবের। কবি আল মাহমুদ আমার শিল্পচর্চা ও স্মরণের ঐশ্বর্য।
লেখক : আবৃত্তিশিল্পী, প্রশিক্ষক












