
প্রকৃতিগত ভাবে মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। মানব জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। এই অধিকারের ভিত্তিতে জনগণ যথাযথ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ অর্জন করে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের মতামত, স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষার কার্যকর প্রতিফলন নিশ্চিত হয়। গণতন্ত্রের এই মৌলিক আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রতিনিধিত্বগত বৈষম্য একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২.৭ কোটি, যার মধ্যে প্রায় ৬.২৯ কোটি নারী ভোটার এবং ৬.৪৮ কোটি পুরুষ ভোটার। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। অ্যান ফিলিপসের “চড়ষরঃরপং ড়ভ চৎবংবহপব” তত্ত্ব মতে, ‘‘দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন, দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিফলিত করতে হলে তাদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব অপরিহার্য।’’ দেশের মোট ভোটার সংখ্যায় নারীদের এই বৃহৎ সংখ্যা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা একটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি। তবে ভোটার হিসেবে তাদের এই সংখাগত শক্তি প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি, যা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা। অধিকাংশ দলই তাদের ঘোষণা পত্র ও নীতিগত অবসথানে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও বাস্তবে সাধারণ আসনে মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে এখনো পুরুষ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার প্রদান করে। ফলে নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্প্রসারিত হচ্ছেনা। যদিও সংবিধান ও বিদ্যমান আইনগত কাঠামো নারী–পুরুষ সমতা ও সমান রাজনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করে, কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক চর্চায় সেই সাংবিধানিক আদর্শের পূর্ণ প্রতিফলণ পরিলক্ষিত হয় না। এই বৈপরীত্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বিদ্যমান কাঠামোগত লিঙ্গবৈষম্য এবং দলীয় মনোনয়র প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাকে সুস্পষ্ঠভাবে ফুটিয়ে তুলে। এই বাস্তবতা ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোট ১,৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৮১ জন, যা মোট প্রার্থীর ৪.০৮ শতাংশ। অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী নারী প্রার্থীদের সংখ্যা ও অনুপাত বিগত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। একইভাবে, দেশের ২৯৯টি নির্বাচনী আসনের বিপরীতে সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৭জন। অন্যদিকে সংবিধান ও বিদ্যমান আইনানুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জন্য নির্ধারিত ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে ৪৯টি আসনের নির্বাচিত সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। আইনি জটিলতায় একটি আসনের ফলাফল এখনো স্থগিত রয়েছে। বাংলাদেশের সংরক্ষিত নারী আসনের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে সবসময়ই রাজনৈতিক দক্ষতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার তুলনায় পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক প্রভাব এসব অধিক গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এই প্রবণতা বর্তমান সংসদে ও দৃশ্যমান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংেলাদেশ (টিআইবি) এর তথ্য অনুযায়ী, এবারেও সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জনের মধ্যে ৩২ জনই কোটিপতি, অবশিষ্ট সদস্যদেরও অধিকাংশের রয়েছে উচ্চ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান অথবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পারিবারিক পরিচয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়, ত্যাগী ও নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য তা প্রত্যাশিতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এর ফলে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করা অনেক দক্ষ নারী নেত্রী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানে সংরক্ষিত আসনের ব্যবসথা সুষ্পষ্ট ভাবে উল্লেখ থাকলেও এসব আসনের দায়িত্ব বা কার্যপরিধি আলাদা ভাবে উল্লেখ নেই। বাস্তবে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ এমন একটি ভৌগলিক এলাকায় প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সংরক্ষিত নারী সদস্যেদের কার্যকর ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে পড়ে এবং তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্র ও সীমিত থাকে।
নিঃসন্দেহে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীর দৃশ্যমান উপিস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি কার্যকর অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্তগ্রহণে প্রভাব এবং নীতিপ্রণয়ন ও সামাজিক ন্যায়ের প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ফলে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর সংখ্যাগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলেও তাদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রকৃত ক্ষমতায়ন কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে সে প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক। দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটরের প্রতিনিধিত্বকারী নারীরা যদি নীতি নিধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারেন, তবে সেই প্রতিনিধিত্ব প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক অর্ন্তভূক্তি নিশ্চিন্ত করতে পারে না। রাজনৈতিক তাত্বিক হান্না পিটকিনের ভাষায়, প্রতিনিধিত্ব কেবল উপস্থিতির বিষয় নয়; বরং জনগণের স্বার্থকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করার সক্ষমতার বিষয়। অর্থাৎ প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে ক্ষমতা, সিদ্দান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় ৩৩বছর ধরে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব্বে নারীদের ধারাবাহিক উপস্থিতি বিদ্যমান ছিলো। নারী প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারের মত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নারীদের দায়িত্ব পালনের ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে প্রায়ই নারী নেতৃত্বের সফল উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এই দৃশ্যমান সাফল্যের আড়ালে যে কঠিন বাস্তব সত্য চাপা পড়ে আছে তা হলো, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘ সময় নারী নেতৃত্ব থাকলেও জাতীয় সংসদে নারীর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। এ অবস্থার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ কাজ করছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো উল্লেখযোগ্য ভাবেই পিতৃতান্ত্রিক, যেখানে নেতৃত্বকে ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষের স্বাভাবিক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পরিচালনা এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো সহ সব ক্ষেত্রেই নারীরা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। নির্বাচন পরিচালনার উচ্চ ব্যয়, রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার, অর্থনৈতিক সম্পদের অভাব, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি এবং নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা নারীদের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরিসংখ্যান ও ফলাফল এই কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ইতিমধ্যে আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস হতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু করার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর সীমিত অংশগ্রহণের বাস্তবতা তাই কেবল সংসদীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেনা; বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর ভবিষ্যত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে ও নতুন করে ভাববার অবকাশ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র ও নাগরিক মধ্যে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠে। এ কারণে স্থানীয় সরকারকে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন কেবল স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো জাতীয় পর্যায়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির প্রধান ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাতীয় নির্বাচনে নারীর প্রতি যে বৈষম্যমূলক বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তার পুনরাবৃত্তি হবে কিনা এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীদের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও জটিল ও বহুমাত্রিক। সামাজিক রক্ষণশীলতা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সামাজিক কুসংস্কার নারীদের রাজনৈতিক পথচলাকে কঠিন করে তোলে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিদ্যমান কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করলেও বহু ক্ষেত্রে তা কার্যকর ক্ষমতায়নের পরিবর্তে সীমিত প্রতিনিধিত্বের কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। অনেক নারী সদস্য ও কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাজেট প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে কাঙিক্ষত ভূমিকা পালন করতে পারেন না। ফলে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও ক্ষমতার বাস্তব বণ্টনে বৈষম্য থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই নারী জনপ্রতিনিধিদের স্বাধীন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং সহযোগী বা প্রতীকী প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির পথে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক। তবে এই সমস্যার জন্য কেবল সামাজিক মনোভাব দায়ী নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন নীতি এ ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যদি নারীদের কেবল সংরক্ষিত আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক আসনে পর্যাপ্ত সংখ্যক মনোনয়ন দেওয়া না হয়, তবে স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব সংখ্যাগতভাবে বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অর্জিত হবে না। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও দুর্বল হয়ে পড়বে।
অতএব, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর সীমিত প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্বকে কেবল একটি নির্বাচনী পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি বাংলাদেশের নারী–পুরুরষ সমঅংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক প্রতিযোগীতা এবং প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। কারণ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল লিঙ্গসমতার প্রশ্ন নয়, এটি গণতন্ত্রের গুণগত মান, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশগ্রহণমূলক চরিত্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ যদি একটি অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের কেবল ভোটার বা সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক নেতা, নীতিনির্ধারক এবং ক্ষমতার সমান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ কাউন্সিলর আসনেও নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনী অর্থায়নে তাদের সহায়তা করা সহ রাজনৈতিক সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করাতে যথাযথ উদ্যেগ গ্রহণও এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীর সংখ্যাগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলেও কার্যকর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে না এবং একই ধরনের বৈষম্যমূলক বাস্তবতা জাতীয় ও স্থানীয়–উভয় পর্যায়ের নির্বাচনে পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। ফলস্বরূপ বাংলাদেশের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হবে এবং প্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও অপূর্ণ থেকে যাবে।
লেখক : কলেজ শিক্ষক ও গবেষক












