বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল ইলিশ রফতানিকারক দেশ হিসেবে। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে বাংলাদেশ ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি করছে। যশোর জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ ভারত থেকে আমদানি করেছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। আমদানি করা এসব ইলিশের মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভারত থেকে কেন আমদানি হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, এবারই প্রথম ইলিশ এভাবে আমদানি করতে দেখছেন তারা। এর সঠিক কারণ জানা নেই। হয়তো ওদের ওখানে বেশি ধরা পড়েছে, সেজন্য হতে পারে। আমাদের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমদানির অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা আমদানি করছেন। বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক একনাগাড়ে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির পর হুট করে গত তিন বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগত কমার পাশাপাশি মাছটির গড় ওজন কমতে শুরু করেছিল, যা নিয়ে গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। এর মধ্যে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির খবরে তোলপাড় চলছে। পাশাপাশি কৌতূহলও তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশে এখন ইলিশের মৌসুম থাকা সত্ত্বেও কেন এই সময়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করা হচ্ছে। এ কৌতূহল বা প্রশ্নের মূল কারণ হলো ২০১৮ সালে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা মাছটির পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচনের কৃতিত্ব অর্জনের পর আশা করা হয়েছিল, বাংলাদেশে ইলিশের সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মানের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জিত হবে।
ইলিশ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর হয়ে কাজ করা একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. কামরুজ্জামান বলেন, চাহিদার তুলনায় বাজারে যোগান কম, তাই ব্যবসায়ীরা ইলিশ আমদানি করছেন।
ভারত থেকে এবারই প্রথম ইলিশ আমদানি হয়েছে এমনটি নয়। গত বছর জুলাইয়ে মূলত এই আমদানি শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশ শুধু আমদানি করছে তা নয়। গত অর্থবছরে ইলিশ রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ১২শ টন রফতানির লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সেবার ১১০ টনের কম ইলিশ রফতানি করেছে।
ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্প ২০২০ সালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি কতটা কার্যকর হয়েছে এখন সেই প্রশ্ন তুলেছেন মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ৪শ কোটি টাকার প্রকল্প ছিল। গত সরকারের সময়ে সেটি কতটা কাজে লাগল কিংবা গাফিলতি ছিল কি না সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। ইলিশ উৎপাদন কমল কেন সেটি বের করতে হবে। ভারত থেকে ইলিশ আমদানি সরকার কীভাবে দেখছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ না এবং অল্প স্বল্প আগেও বিভিন্ন সময় এসেছে। এবার বাজারে ইলিশ কম দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আবেদনে সীমিত পরিসরে কিছু আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইলিশ সাগরের মাছ। প্রজননের জন্য নদীতে আসে। সমুদ্র থেকে হয়তো ওরা (ভারতীয়রা) ধরে ফেলছে। আমাদের মজুত কমছে। এসব কারণেই অল্প পরিমাণে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের কয়েকজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আসা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয় মূল্য পড়ে দুই ডলার (প্রায় ২৪৬ টাকা) কিংবা তারও কম। এরপর দেশে কাস্টমসসহ নানা শুল্কসহ বিভিন্ন ব্যয় শেষে যা দাম পড়ে তা বাংলাদেশের বাজারের একই ওজনের একটি ইলিশের চেয়ে অনেক কম।
গত কয়েক সপ্তাহে যারা ঢাকার বাজারে গিয়ে ইলিশ কিনেছেন তাদের কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তারা ৫শ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশ ১৬০০ টাকা, ১ কেজির ওপরে ২৮০০, আটশ/নয়শ গ্রামের মাছ ২২–২৪শ এবং ৭শ গ্রামের ইলিশ ১৮শ টাকা কিংবা এসব দামের কাছাকাছি দাম চাইতে দেখেছেন। অথচ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। এছাড়া পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এখন বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে হয় বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করে।
ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুর রহমান বলেন, ইলিশের এমন পরিস্থিতি হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তার ধারণা, সাগর থেকে নদীতে আসার পথ অর্থাৎ ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। নানা ধরনের ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা এবং কীটনাশক ব্যবহারও ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার স্থানকে হুমকির মুখে ফেলেছে।












