আশা-হতাশার দোলাচলে দক্ষিণ রাউজানবাসী

জাহাঙ্গীর টুটুল | সোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ

সময় পাল্টায়, সরকার আসেসরকার যায়, পাল্টায় স্থানীয় নেতৃত্ব। কেবল পাল্টায় না ‘দুর্ভাগা’ দক্ষিণ রাউজানবাসীর ভাগ্য। ‘এবার প্রত্যাশা পূরণ হবে’এসব প্রতিশ্রুতির মায়াজালে আর আশাহতাশার দোলাচলে দক্ষিণ রাউজানবাসী। উপজেলা থেকে দূরবর্তী এই দক্ষিণ রাউজানবাসীর বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এবার সময় এসেছে নিজেদের ভাগ্য বদলানোরবর্তমান নির্বাচিত সাংসদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। সাংসদের নির্বাচনোত্তর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দলীয় নেতাকর্মী, সর্বোপরি দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। না হয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতদূর কার্যকর হবে, আদো কার্যকর হবে কিনাতা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন রয়েছে। তবেযতদূর জানি, বর্তমান সংসদ গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী দক্ষিণ রাউজানবাসীর দাবি বাস্তবায়নে আন্তরিক, আন্তরিক এখানকার সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে।

দক্ষিণ রাউজানে পৃথক উপজেলা কিংবা থানা বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। একসময় দলমত, শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে এ দাবিতে মানুষের উচ্চারণ ছিল এক ও অভিন্ন। মাঠপর্যায়ে হয়েছে বহু কর্মসূচি, সভাসমাবেশ। মানুষ রাস্তায় নেমেছে, দাবি জানিয়েছে, আশ্বাসও পেয়েছে। কিন্তু কার্যত কোনো ফলোদয় হয়নি। প্রশ্ন হলোকেন?

এবার সময় এসেছে বিভাজনের রাজনীতি, পারস্পরিক দূরত্ব থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষিণ রাউজানের মানুষকে নিজেদের অধিকার, ভবিষ্যৎ ও উন্নয়নের প্রশ্নে এক কাতারে দাঁড়ানোর। একটি জনপদের ভাগ্য বদলায় শুধু ক্ষমতাবানদের দয়ায় নয়, বদলায় তখনইযখন সেই জনপদের মানুষ নিজেদের শক্তি, অধিকার ও ঐক্যের মূল্য বুঝে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সরকার, বদলেছে প্রশাসনিক কাঠামো, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। দেশের বিভিন্ন জনপদে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, বিস্তৃত হয়েছে নাগরিক সুবিধা। রাউজানও এর বাইরে নয়। সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোএই পরিবর্তনের সুফল দক্ষিণ রাউজানের মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে?

বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ রাউজানের মানুষ এখনো অনেক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে। উন্নয়নের সামগ্রিক ধারায় তারা নানাভাবে পিছিয়ে। তাদের বহুদিনের দাবি, প্রত্যাশা ও নাগরিক চাহিদা বারবার আলোচনায় এলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে দীর্ঘসূত্রতা। ফলে মানুষের মনে জমেছে ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি।

দক্ষিণ রাউজানের মানুষের দাবি শুধু পৃথক উপজেলা বা থানা বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের রয়েছে আরও অনেক মৌলিক চাহিদা। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক সংস্কার ও সমপ্রসারণ, যানজট নিরসন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, কৃষি ও কৃষকের ন্যায্য সুবিধা, তরুণদের কর্মসংস্থান, ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার, নিরাপদ পরিবেশ এবং সহজলভ্য সরকারি সেবাএসবই মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। একটি সাধারণ প্রশাসনিক কাজ, ভূমিসেবা, নাগরিক সনদ কিংবা প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা পেতে অনেক সময় দূরে ছুটতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। অথচ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়, তারা চায় সেবা হোক হাতের নাগালে, সন্তানদের জন্য ভালো শিক্ষার সুযোগ তৈরি হোক, অসুস্থ হলে সহজে চিকিৎসা পাওয়া যাক, বিপদে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ছুটে আসুক, কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাক, তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাক এবং ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য তৈরি হোক অনুকূল পরিবেশ। মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতির উন্নয়ন নয়চায় দৃশ্যমান, টেকসই ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ উন্নয়ন।

স্বাধীনতার প্রায় ছয় দশক পরও দক্ষিণ রাউজানের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব কেন গড়ে ওঠেনি, সেটিও ‘প্রশ্ন সাপেক্ষ’। বরং সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের ন্যায্য দাবিতে সোচ্চার হয়েছে, তখন অনেকেই সেই দাবির পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে বিরোধিতায় নেমেছেন। নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি, পরস্পরকে ছোট করার চেষ্টা, কে কার চেয়ে বড় তার প্রতিযোগিতা এবং নিজেরাই নিজেদের বাহবা নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। এ যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ নেতৃত্বের কাজ মানুষের দাবিকে বিভক্ত করা নয়, এক জায়গায় আনা। মানুষের কণ্ঠকে দুর্বল করা নয়, সেই কণ্ঠকে শক্তিশালী করা। একটি জনপদের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা নয়প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দূরদর্শিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

মূল সংকট এখানেইঅনৈক্য ও বিভাজন। আর এই বিভাজনের সুযোগেই দক্ষিণ রাউজানের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ বারবার ক্ষমতাবানদের কাছে হয়ে উঠেছে ‘দাবার গুটি’, কখনো বা ক্ষমতায় যাওয়ার ‘গোপন সিঁড়ি’।

বঞ্চিত দক্ষিণ রাউজানের মানুষের প্রয়োজন ছিল বিভাজন নয়ঐক্য, ব্যক্তিস্বার্থ নয়জনস্বার্থ, আত্মপ্রচার নয়যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব। প্রয়োজন ছিল এমন নেতৃত্ব, যারা নির্বাচনের সময় শুধু ভোট চাইবে না; বরং মানুষের প্রয়োজনের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। যারা ক্ষমতার দরজায় গিয়ে নিজেদের হিসাব মেলাবে না, বরং একটি জনপদের ন্যায্য হিসাব আদায় করে আনবে। এই সত্যটি যতদিন দক্ষিণ রাউজানবাসীর আত্মোপলব্ধিতে পরিণত হবে না, ততদিন দাবির কথা উঠবে, আশ্বাসের বাণী শোনা যাবে, প্রত্যাশা জাগবে, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে পরিবর্তন আসবে না।

লেখক: সাংবাদিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধগণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ ও প্রাসঙ্গিক কথা