ক্ষমতার স্বভাবই হলো নিয়ন্ত্রণ। ইতিহাস সাক্ষী, যেই সরকারই ক্ষমতার মসনদে বসেছে, তারা গণমাধ্যমকে নিজেদের আয়ত্তে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। একটি সরকার যখন নগ্ন ফ্যাসিস্টে পরিণত হয়, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে স্তাবক ও মেরুদণ্ডহীন গণমাধ্যম; যার নির্মম পরিণতি আমরা বিগত দিনগুলোতে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
ভিন্নমত দমনের এই সংস্কৃতি বা গণমাধ্যমের গলারোধ করার প্রবণতা আমাদের দেশে নতুন নয়; গত ৫০ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে এই তিক্ত সত্যটিই বারবার সামনে আসে। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭৪ সালের ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন’ প্রণয়ন এবং ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ৪টি পত্রিকা বাদে দেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে কণ্ঠরোধের সূচনা হয়েছিল, তা যুগে যুগে কেবল রূপ পালটেছে, কিন্তু চরিত্র বদলায়নি। আশির দশকের সামরিক শাসনামলে গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি ‘প্রেস অ্যাডভাইস’ বা টেলিফোন সেন্সরশিপ থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থায় ‘সিএসবি নিউজ’ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, রাষ্ট্রযন্ত্র কখনোই গণমাধ্যমকে স্বাধীন দেখতে চায়নি।
বিগত দেড় দশকে এই কণ্ঠরোধ চরম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)-এর ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে’ বাংলাদেশের ধারাবাহিক ও লজ্জাজনক অবনতিই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নিবর্তনমূলক আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, এরপর কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ সাইবার নিরাপত্তা আইনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে স্বাধীন সাংবাদিকতা। রোজিনা ইসলাম বা শফিকুল ইসলাম কাজলের মতো সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং শত শত সাংবাদিকের নামে গায়েবি ও মিথ্যা মামলা দিয়ে যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল, তা নজিরবিহীন। নিছক আক্রোশের বশবর্তী হয়ে ‘আমার দেশ’, ‘দিগন্ত টিভি’, ‘ইসলামিক টিভি’, ‘চ্যানেল ওয়ান’ ও ‘দৈনিক দিনকাল’–এর মতো অসংখ্য গণমাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে হাজারো সংবাদকর্মীকে পথে বসানো হয়েছে।
এমনকি সামপ্রতিক দিনগুলোতেও এই আগ্রাসন থেমে নেই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা গণঅভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে বিগত সরকারের সুবিধাভোগী আখ্যা দিয়ে বা ভিন্নমতের অভিযোগ তুলে সমপ্রতি একাত্তর টিভি, এটিএন নিউজ, গান বাংলাসহ একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে নজিরবিহীন হামলা, ভাঙচুর ও সমপ্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি। এছাড়া সময় টিভিসহ বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা জোরপূর্বক দখলের যে অপচেষ্টা বা সমপ্রচার স্থগিতের যে আইনি ও বেআইনি লড়াই সমপ্রতি দেশবাসী দেখেছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য এক অশনিসংকেত। ক্ষমতার পালাবদল হলেও গণমাধ্যমকে দখল ও নিয়ন্ত্রণের এই নগ্ন মানসিকতার যে কোনো পরিবর্তন হয়নি, সামপ্রতিক এই ঘটনাগুলো তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি ও কর্পোরেট আগ্রাসন। মানিক সাহা, শামসুর রহমান থেকে শুরু করে সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার এক যুগেও না হওয়া পুরো গণমাধ্যম খাতকে চরম ‘সেলফ–সেন্সরশিপ‘’ বা স্ব–আরোপিত নিষেধাজ্ঞার অন্ধকূপে ঠেলে দিয়েছে। ব্যাংক লুটেরা ও সরকারের সুবিধাভোগী পুঁজিপতিরা যখন গণমাধ্যমের মালিকানা কিনে নেয়, তখন তা আর জনগণের মুখপত্র থাকে না, পরিণত হয় সরকারের স্তাবক এবং নিজেদের অবৈধ ব্যবসার পাহারাদারে।
দীর্ঘ এই কলঙ্কজনক ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া রাষ্ট্রের কাঠামোগত মুক্তি একেবারেই অসম্ভব। যতদিন পর্যন্ত গণমাধ্যমের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না যাবে, ততদিন কোনো রক্তক্ষয়ী সংগ্রামই চূড়ান্ত সফলতা পাবে না। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে হয়তো সাময়িক বিদ্রোহ হবে, রাজপথে অধিকার আদায়ে আমাদের ভাইয়েরা অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দেবে, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার না হলে সেই রক্তের দাগ শুকানোর আগেই নতুন মোড়কে পুনরায় চেপে বসবে আরও এক নবরূপী ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা। আর সেই মেরুদণ্ডহীন গণমাধ্যম নতুন ফ্যাসিবাদকেও বৈধতা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। একটি রাষ্ট্রে যখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়, তখন শুধু সাংবাদিকদের অধিকারই ভূলুণ্ঠিত হয় না, সাধারণ মানুষের জানার অধিকার ও ন্যায়বিচারের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্র থেকে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন এবং একটি প্রকৃত দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে হলে, সবার আগে একটি নির্ভীক ও স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
লেখক: প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক,
জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর












